Sunday, 22 December 2024

"লৌকিকতার পরিবর্তে আশীর্বাদ প্রার্থনীয়"

কোন কোন  লোক থাকেন যাঁরা দাদা ডাকেই খুব আনন্দ পান, তা সে ব্যক্তির বয়স যাই হোক না কেন। এইরকম ই একজন ব্যক্তি বিশুদা।আপামর জনতার বিশুদা, সে আমার বাবার ও বিশু দা, আমার ও বিশুদা, আমার ছেলের ও বিশুদা, আবার তার ছেলেও হয়তো বিশুদা ই বলবে যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন । এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশুদা তাঁর বিশাল দশাসই চেহারা নিয়ে নতুন বাজার যেতে যে উঁচু ধাপিওয়ালা বাড়িটা পড়ে সেখানে বসে থাকেন এবং বাজারগামী  বা বাজার করে ফিরে আসা সমস্ত লোকজন একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টা সামান্য প্রসারিত করে কোন শব্দ উচ্চারন না করেও ভাল আছেন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রত্যুত্তরে বিশুদা ও মাথা নাড়িয়ে কোন কথা না বলেও ভাল থাকার কথা বলেন । কোন কোন সময় হাত তুলেও ভাল থাকার কথা‌ জানান । বিশুদা কে বেশিরভাগ সময়ই আদুর‌ গায়ে দেখা যায়, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, ‌বড়জোর একটা হাতকাটা সোয়েটার বা একটা চাদর । তাঁর  ঠাণ্ডা না লাগার কারণ জিজ্ঞেস করলেই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা একটা তামার পয়সা  বের করে দেখাতেন আর বলতেন বুঝলি পয়সার গরম কাকে বলে? প্রকাণ্ড শরীরের মালিক এই বিশুদা কোথায়  থাকেন,  কে ই বা তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন কিছুই  জানা ছিলনা । কাজকর্মহীন বিশুদা কে দেখা যেত ফুটবলের মাঠে। কোন  বিশেষ দলের সমর্থক ছিলেন বলে মনে হয়না কারণ যে দল ভাল খেলত  তাকেই উৎসাহ  যোগাতেন।হয়তো যে  দলের সমর্থক আমি তার বিরুদ্ধে একটা গোল হয়ে গেল আমার মন খারাপ  হয়ে গেল কিন্তু পাশে বসে থাকা বিশুদা দুহাত তুলে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমার মন দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেলেও বিশুদার প্রতি রাগ করতে পারতামনা।শুধু আমি কেন,  কেউই রাগ  করতে পারতনা। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। 
খেতে খুব  ভালবাসতেন বিশুদা আর চেনা অচেনা সব লোকই তাঁকে  নিমন্ত্রণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিশুদা কে নেমন্তন্ন করা মানে দশটা লোককে নেমন্তন্ন করা কিন্তু  তা সত্ত্বেও বিশুদা কে লোকে নিমন্ত্রণ করত।উপহার‌ বিশুদার একগাল হাসি সমেত আশীর্বাদ । এ ছাড়া বিশুদার কাছ থকে কেউ কোন উপহার আশা করতনা। তারাশঙ্কর দা ছিলেন একটা স্কুলের  মাস্টারমশাই । তখন স্কুলের  মাস্টারমশাইদের  মাইনে তিন চার মাস  অন্তর হতো। মাইনে পেতেই প্রায় সবটাই চলে যেত ধার শোধকরতে। তবু ও মাইনে পাবার মাসে কোন নিমন্ত্রণ হলে খুব  একটা অসুবিধা হতোনা উপহার দিতে কিন্তু সেই নেমন্তন্ন যদি মাইনে পাওয়ার প্রায় শেষ অবস্থায় পাওয়া যায় তা হলে ধার করা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকেনা। এইরকম একসময়  তারাশঙ্কর দার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তারাদার নেমন্তন্ন হলো, সঙ্গে বিশুদার ও। আর ঐ বন্ধুই হচ্ছে তারাদার মুশকিল আসান । নানা সময় তারা দা তারই শরণাপন্ন হন টাকার দরকারে কিন্তু তাঁর ই মেয়ের বিয়েতে উপহার  দেওয়ার জন্য তাঁর ই কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা  হচ্ছিল তারাদার। না, কিছুতেই ওর কাছে নেওয়া যাবেনা। অনেক  চিন্তা ভাবনা করে বিডিও অফিসের হেডক্লার্ক মুকুদার শরণাপন্ন হলো। মুকুদা বলল আসতে তারাদাকে তার অফিসে, যদি কোন ব্যবস্থা করাযায়  ধারের। সেদিন ছিল শনিবার শেষ দুটো পিরিয়ড ছিল কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল । আমার ও ছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস । হেডমাস্টার মশাইকে বলে ম্যানেজ করে আমার ওপর দুটো ক্লাসের  ভার দিয়ে উনি তো মুকুদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন । মুকুদার সমস্ত চেষ্টা বিফল, কারও কাছে  বাড়তি টাকা নেই  ধার দেওয়ার মতো । তারাদাও খুবই বিমর্ষ । না,বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে  কোন  উপহার  না নিয়ে কিছুতেই  যাবেনা সে। হঠাৎই  মনে পড়ে গেল  বিশুদার ও নিমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বিডিও অফিসে অনেক লিফলেট পড়ে ছিল। উই প্ল্যান ফর প্রসপারিটি, রুরাল ডেভেলপমেন্ট,  ফাইভ ইয়ার প্ল্যান এই জাতীয় যত লিফলেট ছিল সবকটা থলি ভর্তি করে নিয়ে এল। স্টেশনারি দোকান থেকে মলাট দেবার লাল, কমলা রঙের অনেক গুলো কাগজ কিনে নিয়ে  এল।  সেলোফেন পেপার দিয়ে  ভাল করে মুড়িয়ে ঐ পুস্তিকাগুলো একটা দেখনদার গিফট প্যাক করে বিশুদার পাশাপাশি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল। বন্ধু তারাদার হাতে সুদৃশ্য প্যাকেট  দেখে একটু আশ্চর্য ই হলো, ভাবল তারা ধারদেনা করে কেন এইরকম একটা দামী উপহার  কিনতে গেল। যাই হোক,  মুখ্য আকর্ষণ বিশুদার আশীর্বাদের পাশে অন্য যে কোন  লোকের উপহার কেমন ম্যাড়মেড়ে। তারা দা তো একেবারে লেপটে রয়েছে বিশুদার সঙ্গে । বিশালদেহী বিশুদার আশীর্বাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারাদার গিফট প্যাকেট দিয়েই তারাদার খাওয়ার জায়গায় প্রস্থান বিশুদা কে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পরেই যত তাড়াতাড়ি  সম্ভব বাড়ি ফিরে  আসা।
বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়রা থাকে যারা কে কি উপহার  দিল তা একটা লম্বা কাগজে লিখে রাখে। মোটামুটি সব গিফটের উপহারদাতার নাম পাওয়া গেলেও  ঐ বিশেষ  প্যাকেট কে দিয়েছেন তা জানা গেল না। আর প্যাকেটটা এত মজবুত ভাবে মোড়ানো  হয়েছে  তাকে ঐ মূহুর্তে  খোলা গেলনা। পরদিন কন্যা বিদায়ের সময় অনেক  উপহারের সঙ্গে সেই মজবুত প্যাকেট ও চলে গেল । শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের ঘনঘটা থিতিয়ে যেতেই ছুরি, কাঁচি দিয়ে সেই প্যাকেট খুলতেই পঞ্চবার্ষিকী প্ল্যান,গ্রামীন উন্নয়নের সরকারী ইস্তেহার সব ছড়িয়ে  ছিটিয়ে  পড়ল। সবাই ছিছি করতে লাগল আর মধুমিতার লজ্জ্বায়, দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মা কে বলল এই উপহারের কথা। মা তো হাঁ করে চেয়ে রইল কিছুই আঁচ করতেই পারলনা কিন্ত ওর বাবা অর্থাৎ  তারাদার বন্ধু কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে এটা তারার কাজ। বিয়ের  পর বেশ কিছুদিন  কেটে গেছে । তারাদার মাইনে হয়েছে এবং  ধার শোধের পালা। বন্ধুর  কাছে  এসেছে টাকা ফেরত দিতে  কিন্তু  বন্ধু বলল, " তারা, পঞ্চাশ টাকা  বাড়তি দিবি এবার।" হকচকিয়ে গেল তারা দা। " কেন রে পঞ্চাশ টাকা বাড়তি কেন, তুই কি আজকাল  সুদের  ব্যবসা করছিস না কি?"
"না, সুদের  ব্যবসা নয়, তিরিশ টাকা  মেয়ের  বিয়ের  উপহার  আর কুড়িটাকা মেয়ের  শ্বশুরবাড়িতে  আমার সম্মান  নষ্ট করার জন্য।"
তারা দা যত ই অনুনয় বিনয় করে কিন্তু বন্ধু অনড় এই পেনাল্টিতে । "তোর কাছে টাকা ছিলনা তো তুই  এইসব ছাইপাঁশ এখানে আনলি কেন?"
তারা দা বলল, " দেখ , সবসময়ই টাকা তোর কাছেই নিই কিন্তু  তোর  মেয়ের  বিয়েতে  উপহারের জন্য তোর কাছে  টাকা নেওয়া  কি উচিত? "
" তোকে উপহার দিতেই হবে, এমন কোন  বাধ্যবাধকতা তো নেই ঐ তো বিশুদার মতন তুই ও আশীর্বাদ করতে পারতিস।"
 যাই হোক তারাদাকে বড্ড লজ্জায় ফেলে দিল তার বন্ধু। 
পরে আর কোনদিন  তারা দা ঐ বন্ধুর কাছে টাকা  ধার নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি।

Saturday, 7 December 2024

মধুর যাত্রা

হঠাৎই ছেলের ফোন বেশ রাতে, ব্যাগ গুছিয়ে রাখ, যেতে হবে আমাদের মাউন্ট আবু। সবেমাত্র নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠা আমি চমকে উঠলাম প্রস্তাব শুনে। এখনও  নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে ওঠেনি, আমি তো ভয়েই শুকিয়ে গেলাম। তবু একবার ভাবলাম যে প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর বেছে নেওয়া জায়গা মাউন্ট আবুর অপরিসীম শিল্প কীর্তি দিলওয়ারা টেম্পলের পাশে যদি বিলীন হয়ে যেতে পারি তাতে মন্দ কি? সোমবার  ২রা ডিসেম্বর আকাশ এয়ারলাইন্সে দুপুরের টিকিট আমাদের কিন্তু কপালের ফের, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দুঘন্টা লেট। কিন্তু সবদিক দিয়েই লোকসান হলো না, প্রত্যেক যাত্রার ই একটা আলাদা মাত্রা থাকে এবং এখানেও তার ব্যাতিক্রম হলো না।
দুপুর বেলায় খাওয়া দাওয়া সেরে এয়ারপোর্ট  পৌঁছলাম । এসে গেল  হুইল চেয়ার । একটু বেচারা বেচারা মুখ করে চেয়ারে বসতেই একটা লজ্জ্বা চারদিক থেকে  ঘিরে এল। দিব্যি হেঁটে চলে হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছি অথচ এয়ারপোর্টে এসেই যেন ঠুঁটো জগন্নাথ । তবু চেষ্টা করি এই হুইল চেয়ার বাহকদের কষ্টটা একটু প্রশমিত করার তাদের পকেটে কিছু গুঁজে দিয়ে একটু লোকচোখের নজর এড়িয়ে  কারণ এদের কর্মকর্তাদের নজরে এলে এদের চাকরি চলে যেতে পারে। আমরা অনেক সময়েই অনেক ভুল কাজ জেনে শুনেই করি। এর বদলে যদি এয়ারলাইন্স আমাদের কাছ থেকে   এই সেবার জন্য কিছু  মূল্য ধার্য করে তাহলে এই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়না। যাই হোক,  সিকিউরিটি চেক হয়ে যাওয়ার পর বোর্ডিং ও হয়ে গেছে,  এয়ারোব্রিজ দিয়ে তারা এদিক ওদিক করে প্লেনে ঢোকার আগে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছি  কিন্তু  প্রতীক্ষার অবসান আর হয়না। প্রায় ঘন্টাখানেক ঐ অবস্থায় থাকার পর জানা গেল  যে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য প্লেন ছাড়তে দেরী হবে । বেচারা হুইল চেয়ার বাহকদের আরও  দুর্ভোগ বাড়ল, ফের আশি কেজির এই শরীরটাকে টেনে নিয়ে  আবার এক তলায় নিয়ে এল, ফের নতুন করে আবার সিকিউরিটি চেক আর এর ই মাঝে যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে নেওয়া। দুটো ঘন্টা  কেমন করে যে কেটে গেল  বুঝতেই পারলাম না।কিন্তু যাদের  যাওয়ার  তাড়া আছে তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কারণ তাদের  তো অনেক কিছু  সামলাতে হবে, সবাই তো আমাদের  মতো বেকার নয়। যাই হোক,  এয়ারোব্রিজ থেকে মুক্তি পেয়ে রানওয়েতে এসেও আবার অপেক্ষা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের ক্লিয়ারেন্সের জন্য। এরপর আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু কথায় বুঝতে পারলাম যে নির্দেশ  এসে গেছে।
এতক্ষণ যারা হৈচৈ করছিল প্লেন ঠিক সময়ে না ছাড়ার জন্য তারাই বেশ কলরবে মেতে উঠল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় । কোন কোন  সময়ে ডেসিবেল একটু বেশি ই হয়ে যাচ্ছিল ।  আমাদের দুজনের টিকিট এক জায়গায় হয়নি, পাশে একজন অল্প বয়সী মেয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখেই চলেছে আর মাঝে মাঝেই নিজের মনে খিলখিলিয়ে হাসছে‌। পিছনে একটা যুগল(বন্ধু ও  হতে পরে  বা সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েও হতে পারে) যেখানে ছেলেটি হিন্দি, ইংরেজিতে মিশিয়ে প্রচণ্ডভাবে ইম্প্রেস করে চলেছে। খারাপ  লাগছিল না বিশেষ করে স্ত্রী পাশে না থাকায় ধমক খাওয়ার ভয় ই ছিলনা। সুতরাং লোকজনের কথাবার্তাতেই নিজেকে খুশী রাখার চেষ্টা করছিলাম । সামনের সারিতে এক মুসলিম পরিবার কিন্তু তাদের তিনজনের সিট ও একসাথে হয়নি। কি বেআক্কেলে এয়ারলাইন্সের লোকজন । বাচ্চাটা জানলার ধারে ছাড়া বসবেই না।অল্প বয়সী স্ত্রীর পাশে অন্যান্য লোক বসে থাকবে এটা কিছুতেই  মেনে নিতে  পারছে না বেচারা। 'আইল' সিটে বসে থাকা ভদ্রলোক  বেশ জুত করে বসে সীটবেল্ট বেঁধে ফেলেছেন আর অল্প বয়সী স্বামী তাকে কাতর অনুনয় বিনয় করে চলেছে সীট বদলানোর জন্য । কিন্তু লোকটার মন ভিজল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই জানলার ধারে বসে থাকা সীটে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উদাসী দৃষ্টিতে পেঁজা তুলোর মতন ভেসে থাকা মেঘের দিকে মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকল। সে আবার আমার ই সারির জানলাতে থাকায় তাকে দেখে একটু কষ্ট ই লাগছিল। পাষাণ হৃদয় লোকটার মন কিন্তু বিন্দুমাত্র টলল না । আমার ও অবস্থা  বিশেষ  সুবিধার নয়। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে এবং এইরকম পরিস্থিতির মোকাবিলা মাঝে মাঝেই আমাকে করতে হয়েছে । কিন্তু খিদেটা বেশ  চাগিয়ে উঠেছে আর খাবারগুলো সব তার কাছে থাকা ব্যাগে, সুতরাং,  আমার অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। মাথাটা তার বেশ বড়সড় এবং  দাড়ি নিয়ে সমস্ত জানলাটা প্রায় বন্ধ ই হয়ে গেছে। সেই কারণে আমার দিকের ডান দিকের জানলা দিয়ে যতটা দেখা সম্ভব তাই দেখেই মনের স্বাদ  মেটাচ্ছি। প্লেন  চলেছে  পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অন্ধকার তাড়া করে চলেছে আলোকে কখন ধরবে বলে। মনে হচ্ছে অ্যানিম্যাল কিংডমে চিতা তাড়া করছে হরিণের পিছনে আর হরিণ প্রাণভয়ে ছুটে চলেছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। দৃশ্য অপূর্ব কিন্ত দেখার বিষয়ে কখন চিতা হরিণকে ধরে। অবশেষে দৌড়ের সমাপ্তি, লাফিয়ে পড়ে অন্ধকার ধরে ফেলল ক্লান্ত আলোর শিখাকে। আমাদের চারপাশে এত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে আছে আমরা তার দিকে  না তাকিয়ে সামান্য বিষয়ে নিয়েই তুলকালাম করি। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ প্লেনের চাকা মাটিতে আলতোভাবে চুমু খাওয়ার জায়গায় সিনেমার ভিলেনের মতো নায়িকার সঙ্গে জবরদস্তি করার মতো ল্যাণ্ড করল এবং  প্রমাণ করল ক্যাপ্টেনের অনভিজ্ঞতা। উবের বুক করে গেস্ট হাউস পৌঁছতে প্রায় নটা বেজে গেল। খাওয়া দাওয়া সারতে বেজে গেল দশটা।কাল গাড়িতে আসবে ছেলে বৌমারা।পাঁচ শ কিলোমিটারের কিছু বেশী রাস্তা আসতে দশ ঘন্টা তো লাগবেই, এ ছাড়া রয়েছে ট্র্যাফিক জ্যাম, কতক্ষণে এসে পৌঁছাতে পারে নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে পারে তার উপর। 
আমেদাবাদ শহরটা খুব অপরিচিত নয়। তবে যে ভাবে শহরটা দৈর্ঘে প্রস্থে বেড়েছে এবং দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতার বাসস্থান হবার কারণে সৌন্দর্য্য আরও ত্বরান্বিত হয়েছে । ওদের না আসা পর্যন্ত আমাদের আর কোন কাজ নেই, এদিক ওদিক  ঘোরা ছাড়া। চারদিকে ফ্লাইওভারের ছড়াছড়ি, চেনা শহরটাও যেন বিদ্রূপ করে বলছে আমি কে বল তো? সত্যিই তো ,চিনতে পারছিনা । তবে ভাগ্য ভাল উবেরের কল্যাণে গাঁঠগচ্ছা বেশী গেলনা। আগে শহর কে দুইভাগে ভাগ করা সাবরমতী নদী ছিল শীর্ণকায়,  এখানে সেখানে ইতস্ততঃ জলরাশি নদীর বুকে জমে থাকা পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছোট ছোট তরঙ্গ সৃষ্টি করছে এটা চোখে পড়ত। কিন্তু দুই পাড়েই বেশ খানিকটা জায়গা  ভরাট করে সেখানে হয়েছে রিভার ফ্রন্ট এবং নানারকম আলোয় সজ্জিত হয়ে এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন বয়সী লোকজন এসে পার্কে বসে আছে এবং আলোকমালার সৌন্দর্য্য উপভোগ করছে। দেখে ভাল লাগল যে এতকর্মব্যস্ততার মধ্যেও  লোকজন একটু সময় বের করে নিতে পেরেছে । হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা মনে পড়ল যে শেষ কবে সবাই একসঙ্গে এসে এইভাবে আনন্দ উপভোগ করেছি। কাজ, কাজ আর কাজ। কাজের মধ্যেই  হারিয়ে গেছে যৌবন, চোখের জ্যোতি কমেছে, দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে,  পাক ধরা চুলে কলপ লাগিয়ে নিজের বয়স কমানোর চেষ্টা  হয়তো হয়েছে কিন্তু চটপটে ভাবটা তো বয়সের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতি, তা যেন ভয়ানক ভাবে কমে গেছে। মনটাই কেমন যেন  বুড়িয়ে গেছে। কর্মজীবন এবং  পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটা ব্যালেন্স যারা রাখতে পারেনা তাদের ই এই দশা হয়। যাই হোক ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে ব্যথা আনন্দের  এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। এক সময় মন যখন ছিল চাঙ্গা তখন কর্মব্যস্ততায় জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারিনি আর আজ যখন অখণ্ড অবসর তখন শরীর ও মন বিদ্রোহ করে।
প্রায়  এগারটা বেজে গেল  গাড়ী এসে থামল গেস্ট হাউসের সামনে । ওদের ঘর ঠিক করাই ছিল । রাস্তায় খেয়ে নেওয়ায় ঐ হাঙ্গামা হলো না। অল্পবিস্তর কথার মাঝে জানতে পারলাম যে নাতনির পা মচকে গেছে এবং  নাতির ও গায়ে বেশ  জ্বর। সঙ্গে থাকা ওষুধ দেওয়া হলো কিন্তু  মানসিকভাবে একটু ধাক্কা খেলাম, আদৌ যাওয়া হবে  তো? ছেলে বৌমার জন্য খারাপ লাগছিল,  ওদের ও সেই আমাদের মতন দুর্ভাগ্য দেখে। দেখা যাক, কি হয় আগামী কাল । পরদিন ভোর বেলায় উঠে স্নান করে তৈরী হয়ে আছি। সামনের জৈন মন্দিরে এক বিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে। মন্দির দর্শন এবং বিবাহ দর্শন, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হলো। ফিরে এসে দেখি তখনও ঘুম ভাঙেনি ওদের। দরজায় টোকা দিয়ে জানতে পারলাম যে নাতির জ্বর বা নাতনির পায়ের ব্যথার উপশম হয়নি। সুতরাং,  মাউন্ট আবু যাওয়া আপাতত হচ্ছেনা। আমাদের কষ্ট এতটা হলোনা যতটা আমার বৌমার বা বাচ্চাদের হলো ।আমি নিজের শরীর  সম্বন্ধেও যথেষ্ট সন্দিহান  ছিলাম । কিন্তু দুঃখ যে একেবারেই  হয়নি  তা নয়, কারণ প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর  ওই মেডিটেশন হলটা আমাকে বারবার কেমন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কোনরকম রিস্ক না নিয়ে আমার পুরনো শহরটাকেই নতুন ভাবে দেখলাম এবং  বাচ্চারাও যথাসম্ভব গাড়ি থেকে না নেমে শহরটাকে দেখল। দুপুরের  খাওয়া স্যাটিলাইটে অবস্থিত নৈবেদ্যম রেস্তোরাঁয় সেরে গেস্ট হাউসে ফিরে আসা এবং  পরদিন সকাল বেলায় বম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা ।
ঠিক কথাই যে মাউন্ট আবু যাওয়া হলো না কিন্তু ছেলে, বৌমা, নাতি,নাতনিদের সঙ্গে একসাথে সময় কাটানো তো আজকাল এক দুর্লভ ব্যাপার।

Friday, 15 November 2024

গুরু নানক জন্ম জয়ন্তী --স্মৃতি রোমন্থন

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী গুরুনানকজীর আজ জন্মদিন। তাঁর  জন্মদিন নিয়ে একটু দ্বিমত রয়েছে । কেউ কেউ  বলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল  পাকিস্তানের  নানকানা সাহেবের  তালওয়ান্দি  গ্রামে। কিন্তু ভাইবালা জন্মসখী এবং  অন্যান্য বিশিষ্ট শিখ ধর্মগ্রন্থের লেখকদের পরিভাষায় কার্তিকমাসের পূর্ণিমার দিন  নানকজীর জন্ম হয়েছিল  এবং  সেটাই সরকারের মান্যতা পেয়েছে এবং  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ  মহা সমারোহে এই দিনটি পালন করেন এবং  তাঁর বাণী প্রচার করেন সঙ্গীত ও লঙ্গরখানায় বহু লোককে খাওয়ানোর মাধ্যমে ।
আজ ১৫ইনভেম্বর ২০২৪ শ্রী নানকজীর জন্মদিন । কিন্তু ৫২ বছর আগে ১৯৭২ সালে কার্তিকপূর্ণিমা ছিল ২০ই নভেম্বর, সোমবার সারা ভারতবর্ষে স্বীকৃত ছুটির দিন  এবং   আমার  বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করল যে শনিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে  বহরমপুর  যাবে এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে যাবে রবিবার ও ফিরে আসা সোমবার অর্থাৎ গুরু নানকজীর জন্মদিনে । কোথায়  থাকা হবে? ঠিক হলো তারা সবাই উঠবে আমাদের বাড়ি। শ্যামল দা যেতে পারলেন না, অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  হরিশচন্দ্র, শিবু, সুজিত, জয়ন্ত, চৌধুরি, শিবুর এক বন্ধু দীপু ও মেয়েদের মধ্যে ছায়াদি,  মাধবিকা ও কনিকা। তখন বহরমপুরে বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে,অন্তত কলকাতার  তুলনায়  তো যথেষ্ট  ঠাণ্ডা । আমার ঘরে দাদুর দুটো জম্পেশ খাটে ছায়াদিদের শোয়ার ব্যবস্থা হলো, মুস্তাফি সাহেবের ব্যবস্থা হল ঐ বাইরের বিশাল ঘরে আর সুজিত, শিবু , জয়ন্ত, চৌধুরী,  হরিশচন্দ্র ও দীপুদের সদ্য কেনা লালুদার বাড়িতে। সবার জন্য  লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা করতে হয়েছে নাহলে যত ই নাক মুখ চাপা দিয়ে  লেপ মুড়ি দিয়ে  শোওয়া যাক না কেন মশা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওরা সবাই এসেছে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে। আমি একদিন আগে ছুটি নিয়ে  এসে গেছি। দাদাও এসে গেছে বিরাট মাছ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা কুতুবপুর  থেকে। হৈ হৈ ব্যাপার আর কি। বাবা ও আমি সাইকেল  নিয়ে  বাস স্ট্যাণ্ডে ওদের  নিয়ে  আসতে গিয়েছি। লালু দা, সেজদি এবং  আজিমগঞ্জ থেকে  বড়পিসিমাও এসে গেছে ওদের  আদর আপ্যায়নে যাতে কোন ত্রুটি  না হয়। রিক্সা সব বলাই ছিল। ওরা  আলো ঝলমলে জজসাহেবের বাড়িতে এসে পৌঁছানো মাত্র ই  গরমজলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল বাইরের ঘরে। গরম চা ও  হালকা জলখাবার খেয়ে  বেশ খানিকক্ষণ  আলাপ পরিচয়ে কেটে গেল।   আমাদের  বাড়ির ভেতরের বারান্দায় আসন পেতে রাতের খাওয়া দাওয়া  হলো। মুস্তাফি সাহেব জমিদার বাড়ির ছেলে এবং যথেষ্ট  ভোজন রসিক, বড়সড় মাছের মাথাকে কি করে খেতে হয়, তা দেখিয়ে দিলেন । মুস্তাফি সাহেব বললেন উনি একা বাইরের ঘরে থাকবেন না, তিনিও লালুদার বাড়িতেই থাকবেন । ওখানে তিনটে বেশ বড় ঘর ছিল , ভালভাবেই  সেখানে সবাই ঠিকঠাক ভাবেই ম্যানেজ হয়ে গেল। লালুদার  বাড়িটা ছিল  আমাদের  বাড়ির  তিনটে বাড়ি পরে। সকাল বেলায় গরম চা নিয়ে দাদা, আমি ও লালুদা যখন এলাম তখন দেখি অনেকে ফ্রেশ হয়ে গেলেও হরিশচন্দ্র এবং  মুস্তাফি সাহেব  তখনও  বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। শিবু সুজিতের পিছনে লাগছে এবং  হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে  এবাড়ির আনন্দের  রেশ  ও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে।  যাই হোক, এক প্রস্থ চায়ের পর  সবাই স্নান সেরে আমাদের  বাড়িতে এসে গেছে এবং  লুচি, তরকারি, বেগুনভাজা এবং  মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে চা খেয়ে একটা মিনিবাসে সবাই রওনা দিলাম  লালবাগের  পথে। একটু বেলাই হয়ে গেল হাজারদুয়ারি  দেখে ফিরে আসায় কিন্তু খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে । জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর দরকার  একটু গা গড়িয়ে নেওয়ার তবে কেউ আর লালুদার বাড়িতে  গেলনা, বাইরের  ঘরেই সবাই মিলে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিল। সন্ধের সময়ে মোহন হাউসে সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া এবং রাতে মাংস ভাত ও বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।  অনেক রাত অবধি গল্প গুজব করে রাতে গভীর ঘুম। এদিন আর মুস্তাফি সাহেব লালুদার বাড়িতে গেলেননা, বাইরের ঘরেই শুয়ে পড়লেন। সকাল  হতেই সব চা জলখাবারের ব্যাপার  কিন্তু মুস্তাফি সাহেব বললেন বাসি মাংস  দিয়ে মুড়ি খাবেন। তাই হলো, অন্যরা লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেল। দুপুর  বেলায় খাওয়া  মাছের ঝোল,  ভাত, চাটনি দই ও মিষ্টিতে সারা হলো তারপর রিক্সায় চড়ে স্টেশনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে শিয়ালদহে ফিরে আসা । দুদিনের ঠাসা প্রোগ্রাম,  এক ঝাঁক পায়রা ঘুটুর ঘুঁ, ঘুটুর ঘুঁ করতে করতে সবাই  ফিরে এল।
ইতিমধ্যে এদের মধ্যে অনেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে । শ্যামল দা, মুস্তাফি সাহেব,  সুজিত,  চৌধুরী , দীপু আগেই চলে গেছেন । সেই লিস্টে  নবতম সংযোজন ছায়াদি । হরিশচন্দ্র কোথায় আছেন জানিনা। 
আজ এতদিন  বাদে এই লেখার উদ্দেশ্য স্মৃতিটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং যারা অবশিষ্ট রয়েছে তাদের হৃদয়ে পুরনো দিনের  একটু বিদ্যুতের ঝলক আনা।

Saturday, 9 November 2024

"বাসুদেব"

বাসুদেব থাকতো সুবীরবাবুর  বাড়িতে। তাকে সেন্ট্রাল স্টেট  ওয়েলফেয়ার  হোম থেকে সুবীরবাবু এনেছিলেন তাঁর বন্ধু ঐ হোমের সুপারিনটেনডেন্ট অসীমবাবুর অনুরোধে। অসীমবাবু ছিলেন অকৃতদার  এবং  খুবই  আমুদে। মানুষটি ছোটখাটো হলেও ছিলেন একজন খুব ভাল বন্দুকবাজ শিকারী। ছুটির দিনে  বেড়িয়ে পড়তেন শিকারের খোঁজে এই জঙ্গলে বা ঐদিকের বিলে  এবং সঙ্গী থাকতেন আদি অকৃত্রিম বন্ধু সুবীরবাবু। কোন সময় রাতে দুই বন্ধু ফিরে এলেন কোন  বনমুরগী বা হাঁস শিকার করে এবং সুবীরবাবুর স্ত্রীকে বললেন, " বৌঠান, বেশ ঝাল ঝাল করে মাংস রাঁধতে হবে, ভাল করে মশলা বাঁটুন; আর ইতিমধ্যে আমরা এটার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে পরিষ্কার  করছি। তখনকার দিনে  না ছিল মিক্সি, না ছিল ফ্রিজ বা প্রেশার কুকার । শিল নোড়ায় বাঁটা মশলা ও কড়াইয়ে ঘুচ ঘুচ করে সিদ্ধ  হওয়া মাংসের স্বাদ ই হতো আলাদা। বাসুদেব ছিল  অসীমবাবুর হোম থেকে সদ্য বেড়িয়ে আসা ছেলে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী হোমে একটা বয়সের পরে আর থাকা যায়না । সুতরাং নিয়ম লঙ্ঘন করে অসীমবাবুর পক্ষে বাসুদেবকে ওখানে  রাখা সম্ভব ছিলনা। হোমে থাকাকালীন  ছেলেদের  বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং  দেওয়া হয়। যাতে পরবর্তী জীবনে সে নিজেই জীবিকা অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু চাকরি করব বললেই তো আর চাকরি পাওয়া যায়না। সবসময়ই চাকরির আকাল ছিল, এখনও  আছে এবং  ভবিষ্যতেও থাকবে। যতদিন ও একটা ঠিকমতন চাকরি না‌ পায় ততদিন সুবীরবাবুর  বাড়িতে বাসুদেব  থাকবে এবং  ফাইফরমাশ খাটবে ও খাওয়া দাওয়ার অভাব ওর হবে না। ইতিমধ্যে সুবীরবাবুর ছোট ছেলেটা বছর দুয়েক হয়েছে এবং  তার দেখাশোনা করার  জন্য একটা লোকের  দরকার  ছিল  যেটা বাসুদেব মিটিয়ে দিত। দুজনের  দুজনকেই দরকার  ছিল, অতএব বাসুদেবের  ঠাঁই  হলো সুবীরবাবুর বাড়িতে ।

অসীমবাবুর ব্যবহারের জন্য  উনি সকলের খুব প্রিয় ছিলেন কিন্তু  বন্ধু বলতে সেই সুবীরবাবু এবং  ঐ একটি বাড়ি ছাড়া উনি আর কোথাও যেতেন না। তাঁর হোমটা ছিল স্টেশনের কাছে যা সুবীরবাবুর বাড়ি থেকে  প্রায় আড়াই মাইলদূরে। বেশীরভাগ দিন ই অসীমবাবুর রাতের খাওয়া হতো সুবীরবাবুর বাড়িতে এবং  তারপর সাইকেল চালিয়ে হোমে ফিরে যাওয়া।  একদিন কথায় কথায় বাসুদেবের প্রসঙ্গ উঠল। উনি জানালেন যে একদিন  উনি সকাল বেলায়  উঠে দেখেন দরজার বাইরে  কাঁথায় মোড়ানো একটা  ছোট্ট শিশু । মাঝে মাঝেই  কেঁদে  উঠছে । একে অকৃতদার মানুষ,তার উপর ঐ শহরে কোন  আত্মীয় স্বজন নেই । বাচ্চাটাকে নিয়ে কি করবেন  ভেবেই পাচ্ছিলেন না। অগতির গতি সুবীরবাবু । একটা রিক্সা করে বাচ্চাটাকে নিয়ে সোজা তাঁর বাড়ি। বললেন বৌঠান একটা ব্যবস্থা করতে হবে এই বাচ্চাটার। অনেক ভেবেচিন্তে সুবীরবাবুর  স্ত্রী একটা উপায় বের করলেন । ওঁদের  বাড়িতে কাজ করা শিবানীর কোন সন্তানাদি ছিলনা এবং  এখানে সেখানে  কোন পীঢ় বাবা বা সন্ন্যাসীর  পায়ে মাথা ঠুঁকতো এবং  মানত করতো একটা সন্তানের আশায়। অভাবের সংসার,  একটা বাচ্চাকে মানুষ করা খুব  সহজ কথা নয়,তবুও শিবানীর  মনে হলো এটা ভগবানের দান এবং বাচ্চাটিকে নিতে রাজি হলো। সুবীরবাবুর স্ত্রী শিবানীর  মাইনে একটু বাড়িয়ে দেবেন বলে একটু আশ্বস্ত করলেন। শিবানীর  আদরে মানুষ  হওয়া বাসুদেব একটু বড়সড় হতেই ঠাঁই  হলো সরকারী  হোমে এবং  তারপর আবার  সেই  সুবীরবাবুর বাড়ি।
বাসুদেবের মা কিংবা বাবার মধ্যে কেউ একজন নেপালি ছিল কারণ বাসুদেবের চেহারায় ছিল নেপালিদের মতন হাবভাব। যাই হোক হোমের খাতায় তার পদবী হলো মণ্ডল। বাসুদেব কয়েকবছর হোমে থাকার সুবাদে কাঠের কাজে  হাত পোক্ত করেছে এবং কাজের অপেক্ষা করছে । বাসুদেব  সুবীরবাবুর ছোট  ছেলেটার যাবতীয় বায়না মেটায় যেখানে  কোন পয়সা খরচ হয়না। খুবই ভাল বাসে  ছোট বাচ্চা  সুমনকে। তাকে নিয়ে  কোলে করে ঘোরা, তার সঙ্গে খেলা করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা সবকিছুই আব্দার বাসুদেবের কাছে। সুবীরবাবুর  ব্যবসায় ইদানিং একটু মন্দা চলায় টাকা পয়সা  নিয়ে একটু টানাটানি চলছে।বাসুদেব এটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোথায়  যাবে সে এবং একটা চাকরি যোগাড় না করতে পারা পর্যন্ত্য, তাকে সুবীরবাবুর বাড়িতে ই থাকতে হবে। তার পালিত মা শিবানীও বাচ্চা হতে গিয়ে দেহ রক্ষা করেছে আর শিবানীর  স্বামীও মদ খেয়ে লিভারের বারটা বাজিয়ে মারা গেছে। সুতরাং  বাসুদেবের এই বাড়ি ছাড়া আর কোনও  জায়গা নেই। দিন দিন সুবীরবাবুর আর্থিক অবস্থা শোচনীয়  হয়ে পড়ছে কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত ভদ্রলোক,  হাজার কষ্টের মধ্যেও  বাসুদেবকে  চলে যেতে  বলছেন না। ব্যবসায় যারা ধার বাকিতে জিনিস পত্র নিয়েছিল তারাও ঠিকমতো পেমেন্ট না করায় তাঁকে ও ধার করতে হয়েছে  এবং সেই ধারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাঝে মাঝেই  ঋণদাতারা এসে অপমান করছে যেটা বাসুদেবের একদম সহ্য হচ্ছে না। অসীমবাবু ঐ শহর  থেকে  বদলি হয়ে গেছেন। তিনি থাকলেও হয়তো খানিকটা সুরাহা হতো । যাই হোক বাসুদেব  একদিন  ঘরের  সব কাজ সেরে  পল্টনবাবুর কাঠের  গোলায়  দেখা করল এবং  একটা কাজ চাইল। কোথায়  থাকো জিজ্ঞেস করায় জানালো যে সুবীরবাবুর বাড়িতে  থাকে এবং  একটা চাকরির খুব  দরকার । সুবীরবাবুদের একটা সুনাম ছিল  ভদ্রলোক হিসেবে এবং  কানাঘুষোয়  জানতে পেরেছিলেন তাঁর  দুর্দশার কথা। সুতরাং  তিনি মনে মনে স্থির করেছিলেন  যে বাসুদেবকে একটা কাজ দেবেন ।  কি কি কাজ করতে পার জিজ্ঞেশ করায় বাসুদেব জানালো যে সে হোমে কাঠের  কাজ করতে শিখেছিল এবং  সুযোগ পেলে সে ঐ কাজ ভালভাবেই করতে পারবে। পল্টন বাবু বিশ্বাস  করতেন যে নেপালিরা খুব  বিশ্বস্ত হয়। তিনি ভাবছিলেন  যে কাঠের  গোলায়  তাকে দারোয়ানের কাজে লাগাবেন । দুদিন বাদে তাকে দেখা করতে বললেন। বাসুদেব তো ভগবানের কাছে  প্রার্থনা করতে  লাগল যাতে চাকরিটা সে পায়। বাড়ি ফিরে আসতে বেশ  দেরী  হয়েছে  আর মা( সুবীরবাবুর  স্ত্রীকে সে মা বলে ডাকতো) ভাতের থালা  নিয়ে  বসে আছে, অপেক্ষা করছে তার জন্য। বাসুদেবের  চোখে জল এসে গেল মাকে না খেয়ে বসে থাকতে দেখে। 
 "কোথায়  ছিলি এতক্ষণ? "
কিছু না বলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল রান্নাঘরে আসন পেতে।
মা জিজ্ঞেস করল আবার কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারল না সে , কেবল চোখ  দিয়ে জল বেরোতে থাকল।
মা বলল যে খেয়ে নে বাবা, খাওয়ার সময় চোখের জল ফেলতে নেই।
মায়ের মুখের দিকে  তাকাতে পারছে না সে , কেমন একটা অপরাধ বোধে তার মনটা ভার হয়ে আছে। ভাবছে এত কষ্টের মধ্যেও  মা বা বাবা কেউ কিছু বলছেনা তাকে। যাই হোক,  তাকে এই বাড়ির জন্য কিছু করতেই হবে কিন্তু যতক্ষণ কিছু না হয় ততক্ষণ সে কিছুই  বলবে না। নিজের  বাবা মাকে সে দেখেনি। শিবানী মায়ের  কাছে ছোট অবস্থায়  ছিল, পেয়েছে তাদের  ভালবাসা, তারপর দেবতা তুল্য মানুষ অসীমবাবুর ভালবাসা ও শাসন এবং  সবশেষে এই বাবা মা আর ছোট ভাই যাকে সে বড়দাদার মতো মানুষ  করেছে আর সুবীরবাবুর মেয়েদের  দিদির মতন দেখেছে। আর কি চাই ভগবানের কাছে?  সব  তো তিনি দিয়েছেন। 
দুদিন  পরে বাসুদেব দেখা করেছে পল্টন বাবুর সঙ্গে। কাঠের  গোলায়  তাকে থাকতে হবে রাতে। বাসুদেব  তাঁকে অনুরোধ  করল যে শহরে তাকে কারখানায় রাখার  জন্য কারণ রাতে সেই কাঠগোলায় থাকতে হলে সুবীরবাবুর বাড়িতে  সে কখন  কাজ করবে?  মন তার ভীষণ খারাপ । যারা তাকে এতদিন  আশ্রয় দিয়েছে , দুর্দিনের মধ্যে ও তার খাওয়া পড়া নিয়ে  কিছু বলেন নি,  তাদের  এই বিপদের দিনে সে ছেড়ে চলে যাবে এটা সে কিছুতেই মন থেকে  মেনে নিতে  পারছে না। বাড়ি ফিরে  এল সে। মা তো বুঝতে পারছেন যে কিছু একটা হয়েছে বাসুদেবের কিন্তু কি হয়েছে সেটা বুঝতে  পারছেন না। শেষে মায়ের  কাছে  কাঁদতে কাঁদতে সত্যি কি হয়েছে সেটা বলল। সুবীরবাবু পাশ থেকে  সব শুনতে পেয়েছেন এবং  দুঃখ  পাওয়া সত্ত্বেও তাকে উৎসাহিত করলেন কাজটা নেওয়ার জন্য। পরদিনই বাসুদেব নিজের  কিছু জামা টা পড় ও খানিকটা চাল ডাল ও কিছু দরকারি জিনিস  নিয়ে চলে গেল  কাজে যোগ দিতে, বেশীরভাগ জিনিস ই রইল পড়ে। যাবার আগে বাবা মাকে প্রণাম করে ভাইকে কাঁধে তুলে নাচানাচি করে জলভরা চোখে চলে গেল পল্টনবাবুর  কাঠগোলায় । টালির ছাউনি কাঠগোলায় । বাঁশের বেড়া দিয়ে দরজা, ঐদিকে মেসিনগুলো আর একদিকের কোণে একটা চাটাই,  সতরঞ্চি, মশারি ও চাদর। দিনের  বেলায়  মেশিন চলত, অনেক লোক কাজ করছে, গমগম করছে জায়গাটা কিন্তু সন্ধে নামতেই অন্য সব লোক জন চলে গেল কর থাকল ও একা। জঙ্গলের মধ্যেই মেশিন ঘরের দিকে ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে আর নিজে যেখানে  থাকবে সেখানেও একটা টিমটিমে বালব জ্বলছে আর আছে এক কেরোসিনের লন্ঠন যেটা কারেন্ট চলে গেলে কাজে লাগে। বেশীরভাগ সময়েই রাতে নাকি কারেন্ট থাকেনা আর সেই কারণেই নাকি লণ্ঠনের উপযোগিতা অনিবার্য। এই জঙ্গলের মাঝে একা থাকা বেশ কঠিন  ব্যাপার । জন্তু জানোয়ার ছাড়াও  বিষাক্ত সাপ খোপ তো থাকতেই পারে। কিন্তু বাসুদেবের  কোন ভয়ডর বলে কোন জিনিস  নেই । নিজের শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত এবং  সাহস ও ছিল অদম্য। একটা বেশ শক্ত বাঁশের  লাঠি আর আছে একটা ছোরা আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন ই প্রথম রাত,কিছুতেই ঘুম আসছেনা , কেবল ই মায়ের, বাবার ও ছোট ভাইয়ের  কথা ভাবছে। কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে লেগে এসেছে খেয়াল  নেই। রোদ বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখের ওপর পড়তে ঘুম ভাঙল। একটু দূরেই একটা ছোট ঘর চোখে পড়ল, সম্ভবত সেটাই বাথরুম । একটা ছোট টিউব ওয়েল রয়েছে  তার ই পাশে। প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান সেরে উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে সকালের খাবার  তৈরী করে ফেলল সে। একবার  মেশিন চালু হলে আর অন্য দিকে  তাকাবার সময় পাবে না সে। আগে যে লোকটা ছিল সে বাড়ি গেছিল কয়েকদিনের জন্য কিন্তু  তার পরে সে আর আসে নি । আদৌ আসবে কিনা তাও  জানা নেই । সুতরাং, পল্টনবাবুকে একটা লোক রাখতেই হতো। উনি ভাবছিলেন ও সেইরকম ই আর তারই মাঝে বাসুদেবের আগমন এবং  তার চাকরি । কাঠগোলায়  একটা পুরনো ঝরঝরে সাইকেল আছে।বাসুদেব দেখে নিল যে ওটাকে কি ভাবে কাজে লাগানো  যায় । সাইকেল টাকে ঝেড়ে মুছে রাখল কিন্তু চাকায় হাওয়া নেই।  বেশ খানিকটা দূরে  একটা সাইকেল রিক্সা সারানোর দোকান  আছে, যেখান থেকে ও সাইকেল টা সারিয়ে নিল। সারাদিন কাজ করে পরেরদিন সাইকেল  নিয়ে  সাতসকালে বাবা মা ভাইয়ের  সঙ্গে দেখা করতে আসা। অত সকালে মা বাসুদেবকে দেখেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর দুশ্চিন্তায় মন ভরে গেল । হ্যাঁ রে কেমন আছিস বাবা? একটা দিন তোকে দেখিনি  কিন্তু মনে হচ্ছে  কতদিন তোকে দেখিনি ।সুবীরবাবু ও ইতিমধ্যে হাজির,  ভাই ও এসেছে দাদাকে দেখতে। মা চট করে একটু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে কয়েকটা রুটি করে দিয়েছে। চা ,জলখাবার  খেয়ে তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে  কাঠগোলায়  ফিরে আসা । দৈবাত কেউ এসে যদি পড়ে এবং  কাঠগোলায় ঢুকতে না পারে তাহলে তো ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে এবং চাকরিটাও চলে যাবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। যাই হোক,  কোন বিপত্তি ঘটেনি। কোন লোক আসার আগেই  সে ফিরে এসেছে এবং  কাজ ও সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে । প্রায় রোজই বাসুদেব  সাইকেল নিয়ে চলে আসে এবং  চা ও জলখাবার খেয়ে কাজে চলে যায়। মাস শেষ হলো। আজ মাইনে দেবেন পল্টনবাবু। সবাই খুব  খুশী র মেজাজে। টাকা পেয়ে সবাই খুব খুশী  কিন্তু বাসুদেবের আনন্দের  কোন সীমা নেই কারণ এটাই তার প্রথম রোজগার । সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে। মা অত সকালে  বাসুদেবকে দেখে চমকে উঠেছেন। হ্যাঁ রে শরীর ঠিক আছে তো রে? 
হ্যাঁ মা, ঠিক আছি, ভাল ই আছি। বলে মাকে প্রণাম  করে প্যান্টের পকেট থেকে  মাইনের সব টাকা মায়ের  পায়ের কাছে  রেখে দিল। মায়ের  চোখে জল, উনি কিছুতেই নেবেন না।সুবীরবাবু ও এসে পড়েছেন। তাকেও প্রণাম করল বাসুদেব । ভাই অকাতরে ঘুমোচ্ছে।  বাসুদেব কাঁদছে আর বলছে মা তুমি যদি টাকা না নাও তাহলে আমি বুঝব যে তোমরা আমাকে ছেলের মতো ভালবাসনি। আজকে আমি যেখানেই  থাকি না কেন  তা তোমার   বাবার এবং কাকাবাবুর জন্য। আমাকে তোমরা দূরে সরিয়ে  দিওনা।  যথারীতি চা ও জলখাবার  খেয়ে কাঠগোলার দিকে রওনা দিল। দেখতে দেখতে তিনটে মাস কেটে গেছে বাসুদেবের  ঐ কাঠগোলায় । আর এদিকে ফিরে  এসেছে  সেই আগের  লোক যে বাড়ি গিয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়েছিল। পল্টন বাবু একটু ধন্দের মধ্যে পড়ে গেছেন । পুরনো লোকটাকে রাখতে গেলে বাসুদেবকে  ছাড়িয়ে দিতে হয়। আর বাসুদেব এই তিন মাস যেভাবে কাজ করেছে তাকেও হাত ছাড়া করতে চাইছেন না। সমাধান  বেরোল সবচেয়ে  পুরনো  মিস্ত্রীর পরামর্শে। বহাল হলো পুরনো লোক কাঠগোলায় আর বাসুদেবের স্থান হলো ফার্নিচার দোকান  সংলগ্ন কারখানায় আর সঙ্গে বাড়ল মাইনেও। 
বাসুদেব  এখন সুবীরবাবুর বাড়িতে মা ও ভাইয়ের  সঙ্গে। সুবীরবাবুর কাছে যারা ধারে মাল নিয়েছিল  তারাও অনেকে টাকা ফেরত দেওয়ায়  অবস্থার অনেক  উন্নতি হয়েছে । সৎ পথে থাকলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভগবান তাদের  শান্তি দেন ।

Wednesday, 6 November 2024

বন্ধন

বন্ধন কি, কেন আসে, কোথা থেকে আসে এইসব নানাধরণের  চিন্তা য় মাথাটা কেমন ভার হয়ে গেল । বন্ধন তো ভালবাসার ই আর একটা রূপ। রক্তের সম্পর্ক থাকতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । অনেক সময়ই দেখা যায়  যে সম্পূর্ণ একজন অজানা ব্যক্তির প্রতি তীব্র আকর্ষণ আবার  কোন রক্তের সম্পর্কের প্রতি  একেবারেই ভ্রূক্ষেপহীন। সব সময় যে কোন ব্যক্তি ই হতে হবে এমন কোন  কথা নেই, কোন প্রাণীর প্রতিও হতে পারে। সুতরাং,  সংক্ষেপে বলা যায় যে ভালবাসা না থাকলে বন্ধন আসতে পারেনা। ডাক্তারি শাস্ত্রে বলে অক্সিটোসিন ভালবাসার উৎস। এটা না থাকলে ভালবাসা ভুলেও আসবে না। সুতরাং যে সংসারে একটু খুটোখুটি চলছে সেখানে ডাক্তার বাবুরা একবার ভেবে দেখতে পারেন  যে বিবদমান  ব্যক্তিদের মধ্যে কোনভাবে এটা সঞ্চার করা যায়না কিনা।
অনেকদিন ধরেই নাতি নাতনিরা আবদার করছে ওদের সঙ্গে  কিছুদিন  কাটিয়ে যাওয়ার কিন্তু নানা কারণে  তা আর হয়ে উঠছে না। এবার  কিন্তু আর ছাড় পাওয়া গেলনা। ছেলে টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে,  আর বারবার তাদের অনুরোধ  ফেলাও যাচ্ছে না। ভাইফোঁটার দিন  সন্ধের ফ্লাইটে রওনা  দেওয়া হলো। দুজনের ই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে সুবিধা ও আছে আবার  অসুবিধা ও রয়েছে । মালপত্রের সঙ্গে নিজেদেরকেও একটা লাগেজের( মাল বলতে একটু লজ্জ্বা লাগল) মতন মনে হতে লাগল। দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায় তবে অনেকটা  রাস্তা  চলতে হবে।এ ছাড়াও রয়েছে  চেক ইন করা, সিকিওরিটি চেক করার সময় মোবাইল,  মানি ব্যাগ মায় কোমরের বেল্টটা পর্যন্ত খুলে এক্সরে মেশিনে চেক করানো এক ভীষণ ঝামেলার ব্যাপার  যেটা সামলে দেয় ঐ হুইল চেয়ার  বাহকেরা। নিজেরা বোকার মতো হুইল চেয়ারে বসে সবকিছুই লক্ষ্য  করা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সিকিওরিটির লোকজন একটু করুণার সঙ্গে ব্যবহার করে এটা ভাবলেই কেমন ভেতরে ভেতরে  কুঁকড়ে যেতে হয়। যাই হোক,  হুইল চেয়ারে বসলে লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের টাটা বাই বাই করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে  যাওয়া। হাতে যে ব্যাগটা যাবে তাকে কোলের ওপর বসিয়ে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে অসহায়ভাবে বসে থাকা । একা থাকলে খুবই বিশ্রী লাগত কিন্তু দুজনে থাকায় একটু কম হয়েছিল অস্বস্তি। কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় একেবারে শেষে হুইল চেয়ারের যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া মানে প্রায় দুঘন্টার বেশী সময়  ধরে ঐ বাঁধা ছাঁদা  অবস্থায় বসে থাকা কোন সুখকর পরিস্থিতি  নয়। এয়ারোব্রিজ হলে গড়গড়িয়ে প্লেনের দরজা অবধি পৌঁছে যাওয়া যায় কিন্তু বাসে করে গিয়ে তারপর সিঁড়ি দিয়ে একটা প্রায় আশি কেজির জ্যান্ত লাগেজকে ওঠানো সেটা খুব সহজ সাধ্য নয়। কিন্তু ঐ অবস্থায় চেয়ার থেকে নেমে আমি চলে যেতে  পারব বলাটাও নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এয়ারলাইন্সের  নিয়ম অনুযায়ী ঐ হুইল চেয়ার বাহকদের কিছু টাকা পয়সা দেওয়া বারণ। ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের কাছে কিছু টাকা নেওয়া  উচিত আর সেক্ষেত্রে  নিজেদের  অপরাধ বোধে ভুগতে হয়না। যাই হোক দুঘন্টা ধরে  বোর্ডিং গেটের সামনে বসে নানা ধরণের যাত্রীদের নানারকম ব্যবহার লক্ষ্য করা সেটাও একটা বিরাট ব্যাপার । ভিনদেশী একটা ছোট্ট শিশু নিজের  মনে গান করে চলেছে, ভাষাটা বুঝতে না পারলেও সুরেলা মিষ্টি সুর সব বাধা অতিক্রম করে মনে যথেষ্ট আনন্দের  সঞ্চার করছে। একে একে সবাই চলে গেল নিজেদের গন্তব্যস্হলের প্লেনের  দিকে, চলে গেল সেই মিষ্টি বাচ্চাটাও।  বোর্ডিংয়ের সময়ে একটা জিনিস নজরে এল। প্রায়োরিটি বোর্ডিং বলে একটা কথা কানে এল। যারা বিজনেস ক্লাস বা এক্সিকিউটিভ ক্লাস বা  প্রিমিয়ার ইকনমি  ক্লাসের যাত্রী তারা একটু আগে যাবেন । একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের টিকিটধারী তাদের সঙ্গে একসাথে  যেতে পারবেন না। কথাটা কানে গেল যখন একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের যাত্রী হয়তো ঠিকমতন না শুনেই ঐ প্রায়োরিটি বোর্ডিং এর যাত্রীদের সঙ্গে যেতে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে যেতে দেওয়া হলোনা এবং বলেও দেওয়া হলো। ব্যাপার টা হচ্ছে  ফেল কড়ি মাখো তেল।    
এরপর ই শুরু হলো আমাদের  বোর্ডিং। সবশেষে আমরা চারজন হুইল চেয়ারের যাত্রী। 

নাতি নাতনিদের কাছে বলা হয়নি যে আমরা তাদের  সঙ্গে কদিন কাটাতে আসছি। হঠাৎই এসে তাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য । কিন্তু বাচ্চারা  ভীষণ বুদ্ধিমান । তারা ঠিক জেগে বসে আছে। আট বছরের মিশু আর সাড়ে চার বছরের লিও, ওরাই আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটা বানচাল করে দিল যারা নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে তারাই সাড়ে এগারটা অবধি জেগে আমাদের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল। বুড়ো বয়সের সমস্যা হলো যে একজায়গায় যেখানে  ওঁরা থাকেন সেইখানে ই তাঁরা খুব স্বচ্ছন্দে  থাকেন এবং বাইরে বেড়াতে গেলেও দুচারদিনের বেশী থাকতে চাননা । যদিও মিশু এবং লিওর খুব ব্যস্ত শিডিউল কিন্তু তাদের ওর ই মধ্যে অন্ধকার রাতে বিদ্যুত ঝলকের মতো উপস্থিতি আমাদের মতো বুড়োবুড়িদের শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ভালবাসা আরও কিছুদিন বাঁচার তাগিদ বাড়িয়ে দেয়।

Monday, 28 October 2024

বুদ্ধিজীবি

বুদ্ধিজীবির সংজ্ঞা বেশ কঠিন বলেই মনে  হয় আমার কাছে । খুব বেশি বুদ্ধি মগজে নেই বলে কোনরকমে একটা কাজ জুটিয়ে সারা জীবন ঐখানেই কেটে গেছে । আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব বুদ্ধিদীপ্ত ও ঝকঝকে । তারা বেশ মাথা খাটিয়ে কোন এক  সংস্থায় বছর দুয়েক কাটিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায় আরেক সংস্থায়, মাইনেও বেড়ে যায় তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ -- যার যেমন বারগেন করার ক্ষমতা তার উপর । কয়েক বছরের মধ্যেই  একটা কোম্পানির কেউকেটা। তারা কাজটাকে ভালবাসে কোম্পানিকে নয়। তারা কি বুদ্ধিজীবি নয়?  কিছু লোক সংস্থায় ঢোকা ইস্তক রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত  সব কাজ ঠিকঠাক করে পরবর্তী যে লোক এসেছে তার জায়গায় তাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়েও তার শান্তি নেই । একটু কিছু অসুবিধা হলেই তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন বা অনেক  সময়েই তাঁকে অফিসে আসতে বলেন। ইনি তো কখনোই  বুদ্ধিজীবি নন, তবে কি ইনি  বোকা ? না, ইনি বোকা নন, ইনি একজন  ভাল মানুষ যিনি তাঁর জীবনের সেরা সময় তাঁর সংস্থাকে দিয়েছেন এবং অনেক  সময়ই  পরিবারকে বঞ্চিত করে কোম্পানির জন্য প্রাণপাত করেছেন । বিনিময়ে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কাজটা গুছিয়ে নিয়েছেন এবং বাহবা কুড়িয়েছেন। তবে এই কর্তাব্যক্তিরা কি বুদ্ধিজীবি? অবশ্যই । যারাই নিজের  মাথা খাটিয়ে অন্যদের  মাথায়  কাঁঠাল ভেঙ্গে নিজের  কার্যসিদ্ধি করেছেন  তিনি  তো বুদ্ধিজীবি বটেই। কিন্তু ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত  ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে এদের একাসনে ফেলাটা ঠিক হবেনা । 

আজকের দিনে  বুদ্ধিজীবি বললে কেমন একটা তির্যক  শব্দ বলেই মনে হয়। কেউ হয়তো লেখক বা  কোন শিল্পী( চিত্রকর বা সঙ্গীত বা নাট্যকলায় পারদর্শী) যখন প্রয়োজন মতো নিজের অবস্থান বদল করতে পারেন তখন তিনিই বুদ্ধিজীবি বলেই গণ্য হন। অবশ্যই এই শিল্পীরা নিজেদের চোখ কান খোলা রেখে কোনদিকে বাতাস বইছে সেটা বুঝতে পারেন এবং সেই মতন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এঁদের নানা রঙের জামা আছে এবং সময় মতন এঁরা জামা বদল করেন এবং বলেন আমি তোমাদের ই লোক যদিও নিজের  সুবিধা ছাড়া আর  কিছুই  বোঝেন না এঁরা। 
সুমিত আজকাল একটু লেখালেখি করছে এবং  পাঠকমহলে ওর লেখা বেশ নজর কেড়েছে । বাচ্চাদের জন্য লেখা ছড়া গ্রাম ও মফস্বলে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। শহরে বাচ্চারা একটু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্যই  হোক বা একটু বেশি চালাক চতুর হবার জন্যই হোক ছড়ার দিকে নজর দেয়না। নানারকম লেখা যেমন ছোটগল্প, উপন্যাসেও বেশ ভালরকম প্রশংসা পেয়েছে। অনেক জায়গা থেকে প্রধান অতিথি হবার আমন্ত্রণ পাচ্ছে। সেদিন বই মেলায়  তো ওকে দেখে  বেশ ভীড় জমে গেল অনেকেই ওর অটোগ্রাফ  নিতে চাইছিল। দেখে বেশ ভাল লাগছিল কারণ প্রথম দিকে ও আমাকে পড়তে দিত ওর লেখাগুলো। উৎসাহ  ওকে দিয়েছি এবং  ধীরে ধীরে ওর লেখা  আরও  পরিণত হয়েছে। সেই জন্য ওর সাফল্যে নিজেকে রামচন্দ্রের  সেতু বন্ধনে কাঠবিড়ালির মতন মনে হচ্ছিল । কিন্তু ওকে কেউ বুদ্ধিজীবি বললে ও খুবই রেগে যেত। একদিন ওকে বললাম, " তুমি এত রেগে যাও কেন?"
ও রাগ না কমিয়ে বলল যে ও একটা নীতি মেনে চলে যা সরকারী নীতির পরিপন্থী। অতএব ও বুদ্ধিজীবি বলে ছাপ নিতে রাজি নয়।"
সত্যিই তো এঁদের  অনেকেই  একসময় তাঁদের লেখা ও গানে বা অন্যশিল্পকলায়  তাঁদের  ছাপ রেখেছেন এবং অনেক লোককে উদ্বুদ্ধ করেছেন, হঠাৎই  কিছু স্বীকৃতির বিনিময়ে বা কিছু  সুবিধার বিনিময়ে কেন তাঁরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছেন এটা বোধগম্য হয়না। তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে আপনারা স্বকীয়তায়  ভাস্বর, আপনারা সেই মহিমায় বিরাজ করুন,  কেউ যেন আপনাদের  এইভাবে কলঙ্কিত করতে না পারে ।

Monday, 14 October 2024

সাবেকি দু্র্গাপূজো বনাম থিম পূজো

এখন শহর ও শহরতলীতে থিম পূজোর ঘনঘটা যা ধীরে ধীরে  গ্রাস করছে গ্রামের মানুষকেও। সাবেকি পূজো শহরাঞ্চলে খুব  কম জায়গায়ই  হচ্ছে আজকাল । বাঙালি আগে প্রতিদিন মানে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে অঞ্জলি দিত। পূজো মানেই হৈ হৈ, যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর সময় নিজের  কোটরে এসে হাজির। হাতে হাত লাগিয়ে রাত জেগে পূজো মণ্ডপ করা, নিজেদের  মধ্যেই  যাদের  শৈল্পিক ধারণা আছে তারাই প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরী করা এবং মৃৎশিল্পীদের কারখানা বাড়ি থেকে প্রতিমা আনা সব ই নিজেরাই করত যার ফলে পূজোর প্রতি পদক্ষেপে পাড়ার ছেলেদের ঘাম লেগে থাকতো এবং আনন্দটাও ছিল অবর্ণনীয় । আস্তে আস্তে পাড়ার ছবিটা  বদলে গেছে। একটা জমির উপর একটা বাড়ির জায়গা দখল করেছে বহুতল বাড়ি যেখানে  অনেক পরিবার  একসঙ্গে থাকলেও সম্পর্কের আঠা তেমনভাবে লাগেনি যার নীট ফল বাড়ির কেউ অসুস্থ  হলে  বা মারা গেলে কোন সংস্থাকে খবর দিতে  হয় যেটা আগে ভাবাই যেত না। তখন কি তাহলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার অনেক  লোক ছিল ? হয়তো খানিকটা  তাই। প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলে মেয়ে  ছিল। দু একটা ছেলেপিলে যারা লেখা পড়ার ধার সেরকম ভাবে মাড়াতো না তারাই এই পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যারা খুবই ভাল  পড়াশোনায়  তারা এগিয়ে  না এলেও মধ্য মেধার ছেলেমেয়েরাও যোগ দিত। এক কথায় পাড়া থেকেই সবাই এগিয়ে আসত এবং যে কোন  সমস্যার সমাধান পাড়ার  লোকজন সামলে দিত। ধীরে ধীরে  চারদিন অঞ্জলির বদলে অষ্টমী ও দশমীতে অঞ্জলি দেওয়া ঠিক হলো। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার  সময়ই ভীড় সামাল দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার ছিল। প্রথমে বুড়োবুড়িদের অঞ্জলি দেওয়া,  তারপর মাঝ বয়সী এবং  সবশেষে চেটো চ্যাংড়াদের । এই সময়টাতে অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে একটু চোখাচোখি বা একঝলক মিষ্টি হাসির মধ্যে মন্ত্র পড়া এবং  ফুল ছোঁড়ার সময় কোন  নির্দিষ্টের গায়ে বা মাথায় ফুলের আঘাত। দশমীতে অঞ্জলি দেওয়ার পর অপরাজিতার ডাল হাতে বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মা, মাসি বা কাকি, পিসিরাও এটাতে একটু উৎসাহ  যোগাতেন, হয়তো বা নিজেদের  পুরনো দিনের  কথা ভেবে । অবশ্যই এটা খুব  একটা দোষের নয় কারণ সব বাবা মা ই চায় যে তার মেয়ের  একটা ভাল  ছেলের  সঙ্গে  বিয়ে হোক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ই এটা ঠিক  না হলেও দু চারটে যে পরিণতি পেতনা  তা নয়। যাই হোক,  পূজো নিয়ে একটা বিরাট  হৈচৈ হতো এবং  সেটা সাবেকি পূজোয়।
 এখন এসেছে থিমের পূজো । কোন শিল্পী কোন বিশেষ  জায়গার আদলে মণ্ডপ বানিয়ে তাঁর শৈল্পিক  ধারণা  বাস্তবায়িত করেন এবং অনেক সময়ে ও অর্থ ব্যয়ে  এবং  যথেষ্ট উঁচু মানের হয় কিন্তু প্রতিমা দর্শন করে ভক্তি রসে উদ্বেলিত হয়ে মনে মনে  মা মাগো বলে ডাকটা আসেনা। আবছা আলো আঁধারিতে মা সেখানে গৌণ এবং  মণ্ডপ সজ্জা মুখ্য। সেখানে প্রবেশের জন্য কাউকে ধরা ধরি করে পাস যোগাড় করতে হয়ে। এই পাসের ও আছে রকমফের। সাদাসিধে পাস, ভি আই পি পাস আবার ভি ভি আই পি পাস। যার যেমন  ওজন তিনি তেমন পাসের অধিকারী। সুতরাং এখানে মণ্ডপসজ্জাই হচ্ছে মুখ্য। তা, এত কৃতিত্বের অধিকারী যাঁরা তাঁদের  শিল্পকীর্তি এক বিশাল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা সরকারী বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  করা যায়না এবং  তাঁদের  যথাযথভাবে সম্মানিত করা যায়না? এতে প্রচুর  লোকের  কর্মসংস্থান হবে এবং  শিল্পীরাও তাঁদের যথাযথ সম্মান পেতে পারেন কিন্তু যে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে সেই ভক্তিরস না আসে সেইরকম ঠাকুর  করার কি দরকার?  এটা না হাঁস না সজারু হয়ে গেল  হাঁসজারু । একটু ভেবে দেখার অনুরোধ  কি রাখতে পারি?