Friday, 31 December 2021

নববর্ষ

বিষে বিষময় দুহাজার বিশ
মারণ গরল আনিল  একুশ 
তবুও আশায় থাকি অহর্নিশ 
আসিবে মঙ্গলদায়ী দুহাজার বাইশ

নতুন বছরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল। 

এযুগের দধীচি

পুরাণে মহর্ষি  দধীচির সম্বন্ধে জানেনা এমন লোকের  সংখ্যা খুবই  কম। যারা একদম নিতান্তই কোন  খবর  রাখেন না তারা ব্যতীত প্রায় সমস্ত লোকই মহর্ষি  দধীচির আত্মত্যাগের কথা জানেন। তিনি তাঁর  প্রাণ ত্যাগ  করেছিলেন দেবতাদের অসুরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ  করার জন্য। 
দেবরাজ  ইন্দ্র তাঁর সহযোগী অন্য দেবতারা স্বর্গ থেকে প্রায় বিতাড়িত  অসুরদের দ্বারা। অসুরদের  দলপতি বৃত্রা শিবের আশীর্বাদে প্রায় অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাকে কোন  অস্ত্রের দ্বারা বধ করা যাবেনা। তাহলে তাকে হারাবে কে? আর সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজ  ইন্দ্রকেও  তাঁর  চ্যালা চামুন্ডা সমেত  স্বর্গ থেকে চাটি বাটি গোটাতে  হবে। স্বয়ং রাজা ইন্দ্র মুখ কালো করে ভগবান  বিষ্ণুর শরণাপন্ন  হলেন। রাজনীতি তখনও  ছিল  এখনকার  মতো। রাশিয়া বা আমেরিকা এখন যেমন একবার  ভারতের  গালে আর একবার  পাকিস্তানের গালে চুমু খায়, তখনও  ভগবান  বিষ্ণু এবং মহেশ্বর  আমেরিকা রাশিয়ার  রোল প্লে করতো। স্বয়ং ভোলানাথ অল্পেই  তুষ্ট হন এবং বেশি কূটকচালির মধ্যে না গিয়ে খুব বেশি না ভেবেই চাওয়া এমন একটা বরকে  তথাস্তু বলে বসতেন যে তাকে সামলাতে অন্যদের  দফারফা। রাশিয়া যদি প্যালেস্টাইনকে  সমর্থন  করে তবে আমেরিকাকে ইস্রায়েলের  সমর্থনে নামতেই  হয়। সুতরাং স্বয়ং বিষ্ণু যে দেবরাজ  ইন্দ্রকে বুদ্ধি দেবেন  এতে আর আশ্চর্য  কি আছে। তিনি দেবরাজ  ইন্দ্রকে বললেন যে যাও মহর্ষি দধীচির কাছে এবং তাঁর কাছে তাঁর  অস্থি র প্রার্থনা কর। স্বর্গের  এইসব ব্যাপার স্যাপার  বড্ড গোলমেলে। দেবরাজ  ইন্দ্র, তুমি রাজা। দেবতাদের  দেখভাল  করা  তো তোমার  কাজ। কেমন তোমার  কূটনীতি হে? তুমি তো ঠিকমতো  সামলাতেই  পারনি।  তুমি থাকতে কেমন করে অসুর বাবাজী স্বয়ং মহেশ্বরের কাছ থেকে বর নিয়ে চলে গেল আর তুমি কি তখন  আঙুল  চুষছিলে? আরও  একটা জিনিস  কিছুতেই  বোধগম্য  হয়না। রাজ্যপাট  তোমার,  সামলাবে তুমি। কথায় কথায় তোমাকে দাদা ধরতে হবে কেন শুনি? অনেক  ভাবনা চিন্তার  পর একটা মিল এখনকার  রাজনীতির  সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। সংবিধান  অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সর্বময়  ক্ষমতা কিন্তু কোথা থেকে তাঁর মাথার উপর উড়ে এসে জুড়ে বসল ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল যার মতামত ছাড়া পাতাও  হেলবে না। অতএব যা হবার  তাই  হলো। দেবরাজ  ইন্দ্রর ক্ষেত্রেও  তার কোন  ব্যতিক্রম  নয়। সুতরাং  আমেরিকান বিষ্ণুর কথামতন  মহর্ষি দধীচির  কাছে যাওয়া এবং আবদার  ধরা, ঋষিবর, " আপনি প্রাণ ত্যাগ  করুন  এবং আপনার  অস্থি দিয়ে আমি অস্ত্র বানাবো এবং সেই  অস্ত্রে  আমি বৃত্রাসুরকে বধ করে স্বর্গ  উদ্ধার  করব।" মহর্ষি জ্ঞানী পুরুষ , উনি দেবরাজ ইন্দ্রর আগমনের  কারণ জানেন এবং একটা শর্ত  আরোপ করলেন। তিনি বললেন যে সমস্ত নদীতে অবগাহন করার পর তিনি প্রাণ ত্যাগ  করবেন। কিন্তু ইন্দ্রর আর তর সইছে  না অথচ মহর্ষিকে হত্যাও  করতে পারছেন  না। আর ঐদিকে  ঊর্বশী,  মেনকাদের  নৃত্য গীত  কতদিন  শোনা হয়নি আর সেই জায়গায় অসুররা আহ্লাদিত  হচ্ছে তাদের  নৃত্য গীতে,  এটা ভেবেই  দেবরাজের মন খুব খারাপ  হয়ে গেল। তিনি তখন  সমস্ত নদীর  জল একত্রিত  করে সেইখানে নিয়ে এলেন  এবং মহর্ষিকে বললেন, " এইখানেই  সব নদীর  জল আছে যেটা  যোগবলে আপনি জেনে নিতে পারেন  যে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা।" এখনকার  যেমন অডিটরের  সামনে  সমস্ত বই খাতা ফেলে দিয়ে বলা হয় দেখে নিন স্যার একবার  চোখ বুলিয়ে আর চট করে সই করে স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিন। আমাকে আর বলতে হবেনা বাপধন,  আমি বুঝেছি তোমার  যথেষ্ট  তাড়া। মুনিবর তাঁর  
কথামতন সেই জলে অবগাহন  করে স্বেচ্ছায় প্রাণ ত্যাগ করে দেবরাজ  ইন্দ্রকে ব্রহ্মহত্যা থেকে নিষ্কৃতি দিলেন। আহ্লাদে আটখানা দেবরাজ  ইন্দ্র তাঁর  অস্থি নিয়ে সঁপে দিলেন  বিশ্বকর্মার  হাতে এবং তিনি মহর্ষির মেরুদন্ড  দিয়ে বানালেন বজ্র এবং সেই বজ্রাঘাতে  নিধন হলো বৃত্রাসুর এবং দেবতারাও  ফিরে পেলেন  তাঁদের মনসবদারি। আর বেশ  লোকদেখানি শান্তি স্থাপন হলো ভগবান  বিষ্ণুর মহেশ্বরের  সঙ্গে। ব্রিটেন আমেরিকা ও রাশিয়া যেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের  পুনর্মিলন  হলো।

এ তো গেল সেই পুরানের কচকচানি। এবার  আসা যাক আজকের  দধীচির  কথায়। স্বার্থ ত্যাগের  মহান আদর্শ  মহর্ষি দধীচির।  অনেকটা আমাদের  পরমবীর চক্রের  মতন।  আমেরিকা বা রাশিয়া কেউ প্যাটন ট্যাঙ্ক  বা স্যাবার জেট বা এফ সিক্সটিন  বা মিগ  বিক্রি করে যুদ্ধ করতে সাহায্য  করে কিন্তু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর  আর কেউ নিজে মাঠে ময়দানে নেমে যুদ্ধ  করতে এগিয়ে আসেনি। তোমরা আমাদের  অস্ত্র কেনো, যুদ্ধ  কর। ফেল কড়ি,  মাখ তেল। তোমরা যত যুদ্ধ  করবে কর, অস্ত্র চাই কেনো আর আমাদের  অর্থভাণ্ডার সমৃদ্ধ কর। ব্রহ্মা তো সৃষ্টি করেই খালাস,  গোল বাধে বিষ্ণু আর মহেশ্বরের।  তা,  যা চলছিল  সেটা এখনও  চলছে। আমাদের  স্লোগানের  মতো চলছে, চলবে। এখনও  ইতি উতি  খুঁজলে  কিছু দধীচির  সন্ধান  মেলে। সংখ্যায় অল্প হলেও  এরা আছে এবং এদের  এই স্বার্থহীন কাজের  জন্য  সমস্ত  পৃথিবীটা চলছে। সেবা নিবৃত্ত  হবার  পরেও  তাদের  এই অসামান্য  সেবা যে কত অসহায় লোককে অন্ধের  যষ্টির মতো সঠিক  পথে চালিত  করে তার ইয়ত্ত্বা নেই। কোনরকম  দ্বিধা না করে এরা যে কত লোকের  উপকার  করে সেটা ভাবলেই অবাক হতে হয়। কার স্বামী অসুস্থ  হয়েছেন  বা গত হয়েছেন  এই দধীচিরা কারও  ডাকের অপেক্ষা করেন না, কেমনভাবে বাতাস যেন  তাদের  কানে পৌঁছে দেয় ওখানে তোমার  প্রয়োজন আর সেও ছোটে নির্দ্বিধায়। গুরু রামদাস যখন  শিবাজীকে ভিক্ষার  সন্ধানে বেরোতে নির্দেশ  দেন তখন যথেষ্ট  অন্ধকার। শিবাজী বলেন, " প্রভু, ভিক্ষা, এখন!  এখনও  তো হয়নি প্রভাত।" গুরু রামদাস  বলেন,  " প্রভাত কি রাত্রির  অবসানে ? যখনই  চিত্ত জেগেছে, তখনই  হয়েছে প্রভাত।  চল যাই, ভিক্ষার  সন্ধানে।"  এই দধীচিদের অন্তরেই  গুরুদেবের  অধিষ্ঠান  এবং এরা স্বতঃপ্রণোদিত  হয়েই সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যান  অন্যের  সাহায্যে। এঁরা বয়োঃকনিষ্ঠ  হলেও  এঁদের  জানাই  শত সহস্র  প্রণাম। 

Saturday, 18 December 2021

বিয়েবাড়ির চাটনি খবর

বিয়েবাড়িতে নানা ঘটনা ঘটে যেগুলো খুবই মজাদার  রসাল হয় এবং বিয়ে মিটে গেলেও তার রেশ  বহুদিন বজায় থাকে। অনেক মজাদার  ঘটনা ঘটলেও সব ঘটনার  সাক্ষী হওয়া কোন লোকের  পক্ষেই সম্ভব  নয়। সেইকারণে এই প্রবন্ধের  সংযোজন হতেই  থাকবে এবং এই প্রবন্ধ  কবে শেষ হবে তা একমাত্র ভগবানই বলতে পারেন। সবার কাছেই  অনুরোধ  থাকল  যে মুখরোচক কিছু খবরের  সন্ধান থাকলে যদি জানান তাহলে একটা  সার্থক গল্প দাঁড়ায়।

তখন মফস্বলে টেবিল  চেয়ারে বসে খাওয়া চালু হয়নি, ক্যাটারার  তো কোন দূরস্থান। বাড়ির শক্ত সামর্থ্য লোকেরাই পরিবেশন করত এবং লোকজন যদি সেরকম না থাকত তবে পাড়ার  লোকজন এসে কার্যোদ্ধার করে দিত। বিয়েবাড়িতে  তখন  মাটিতে বসেই  খাওয়া দাওয়ার রেওয়াজ  ছিল। পরিবেশনকারীরা পাজামা বা প্যান্টের উপর গামছা বা তোয়ালে জড়িয়ে শুরু করে দিত। টিমের  একজন ক্যাপ্টেন  থাকতেন  যিনি বাড়ির  মালিকের  সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন  যে কত গেস্ট আছে এবং সেই সঙ্গে দেখে নিতেন যে কত পরিমাণ  খাবার  আছে। সেই বুঝে ঢালাও  পরিবেশন  বা হাত টেনে পরিবেশন করার  নির্দেশ তাঁর  টিমের  লোকজনদের  দিতেন। তবে প্রথম  দুটো ব্যাচ একটু টেনেই  পরিবেশন করা হতো।তারপর মালের স্টক এবং গেস্ট সংখ্যা বুঝে পরিবেশন করা হতো। তখন  আইসক্রিমের  চল আসেনি। দইয়ের হাঁড়ি বা মালসা  এক হাতে নিয়ে আর এক হাতে একটু বড় ধরণের  চামচ দিয়ে খুবই  মোলায়েমভাবে দইএর  উপর চালিয়ে দিতে হতো। সুতরাং, বুঝতে অসুবিধে  হয়না যে সবচেয়ে  অভিজ্ঞ পরিবেশকের হাতে এটা ন্যস্ত  হতো। পাঁচসেরি  একটা দইয়ের মালসা  এক হাতে নিয়ে ঝুঁকে পড়ে দই পরিবেশন করা কত কঠিন  কাজ  ছিল  সেটা অনুমেয়। এরপর  সবাই  চায় দইয়ের মাথা, আর নিজের  মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিবেশন করা এক দুরূহ  ব্যাপার ছিল। আর কিছু লোক  খেতেই  আসত যেন  মনে হয় সাতজন্মের খাওয়া ঐদিন ই খাবে। কিছু লোক  শুধু মাছ, মাংস  আর মিষ্টিই  খাবে যেন  বাড়িতে ঐরকম ই খায়। লাল শাকে বাদাম ভাজা আর তার উপর ছেটানো নারকেল কোঁড়া  দিয়ে শুরু করে নৌকার  মতন  বেগুন ভাজা কলাপাতায় পটাপট  পড়ত। এরপর গরম গরম  লুচিএবং আলুর দম বা এঁচোড়ের  ডালনা বা আলু পটলের তরকারি বা মটরশুঁটির কচুরী এবং আলু ফুলকপির  তরকারি( শীতের সময়) এবং এরপর আসত পোলাও এবং মাছের  কালিয়া এবং তারপর আসত পাঁঠার  মাংস। কম্পিটিশন করে খাবার  লোকজন এইবার  জামার হাতা ভাল করে গুটিয়ে নিয়ে বলতে থাকল বালতিটা  এখানেই  রেখে অন্য  বালতিতে  বাকিদের  সব দিন। আহা রে , চাঁদু,  বাড়িতে কটা পিস মাংস  খাও।  তখন  জিনিস পত্রের দাম  শস্তা হলেও  মাইনেও ছিল কম। সুতরাং, বাড়িতেও দুই তিন টুকরোর  মধ্যেই  সীমিত থাকত। এটাই  স্বাভাবিক। কেউ  অন্য কিছু না খেয়ে শুধু মাছ বা মাংস বা মিষ্টি খাবে এটা ঠিক  নয়। তবে অনেক  লোকেই তখন  খেতে পারত এবং সেই খাওয়াতে  যদি সামঞ্জস্য  থাকে তাহলে ঠিক  আছে। যেমন কেউ  লুচি, পোলাও এবং তার আনুষঙ্গিক  তরকারিপাতি খেয়ে মাছ বা মাংস খায় এবং তারপর আনুপাতিক হারে দই বা মিষ্টি খায় তাহলে আলাদা কথা। অনেকে রস চেপে রসগোল্লা খাওয়ার  সংখ্যা বাড়ায়। পরিবেশনকারিদের মধ্যেও  বেশ রসিক মানুষ থাকত  আর বলত ছানাচ্যাপ্টা দেব? এরকমই  সহকর্মীর  এক বিয়েতে বরযাত্রীদের  একজন আর একজনকে উস্কে দিল।   একজন সহকর্মী রসগোল্লা যতই  দেয় ততই  আলাদা একটা মাটির  ভাঁড়ে রস চিপে ফেলে দেয় এবং ছানাটা মুখের  মধ্যে দেয়।  পরিবেশন যিনি করছেন তিনি মনে মনে খুব  ক্ষুব্ধ  হলেও  কিছু বলতে পারছেন না। হাজার  হলেও  বরযাত্রী বলে কথা। যে সহকর্মীকে উস্কে দিয়েছিল সে একটু দূরে বসেছিল। সে একজন  পরিবেশনকারিকে ডেকে বলল," দাদা, একটা কথা বলব ? কিছু মনে করবেন  না তো?" না, না, না বলুন।  ঐ যে ভদ্রলোক  রসগোল্লা খাচ্ছেন,  উনি বেগুন ভাজা খেতে খুবই  ভালবাসেন  কিন্তু এখন যখন  মিষ্টি দেওয়া হচ্ছে,ও লজ্জ্বার খাতিরে চাইতে  পারছে না। ওকে গোটা কয়েক  বেগুন ভাজা এনে দেবেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা একটা কথা হলো? উনি সঙ্গে সঙ্গে একটা ট্রেতে গোটা আটেক  বড় বেগুন ভাজা এনে দিল  তার পাতে। আরে এ কি করছেন,  এ কি করছেন? না, না, একদম লজ্জ্বা পাবেন না। আমি মিষ্টির  বালতি নিয়ে আসছি। তার রস চেপে রসগোল্লা
খাওয়া মাথায় উঠল। ও তো বুঝতেই পেরেছে  যে এটা কার কম্মো। কিন্তু  এভাবে ওকে নিরস্ত করা ছাড়া আর কোন  রাস্তা ছিলনা।

এবার  আসা যাক  আরও  একটা মজাদার ঘটনায়। এটা ছিল  একটা মোটামুটি ঘ্যামা বিয়ে। বিরাট ব্যবসা ওদের। জুট মিল, কাপড়ের  দোকান ( হোলসেল ও রিটেল),সোনার  দোকান ও পেট্রোল পাম্প।  এছাড়াও  পুকুর,  জমি জমা, এককথায় বিশাল  ব্যাপার।  ওরা অনেক ভাই। সুতরাং বিশাল  ব্যবসা সামলানো কোন বড় ব্যাপার ই নয়। ওদের যিনি বড় ভাই মানে তিনি শুধু বয়সেই বড় নন ওদের  ব্যবসা সাম্রাজ্যের ও মুখ্য মাথা। বিশাল  বাড়ি ওদের, একটা নয়, দু দুটো তিনতলা বাড়ি। মাঝখানে  বিশাল  উঠোন । দুটো বাড়ির ছাদে ম্যারাপ বাঁধা । একটা বাড়ির  ছাদে যখন  খাওয়া দাওয়া হয় তখন  অন্য  বাড়ির  ছাদ পরিষ্কার  করা হয়। এখন আমরা দু কামরা বা তিন কামরার ফ্ল্যাটে থাকা লোক। সুতরাং, বিয়ে বা অন্য  কোন অনুষ্ঠান  করতে গেলে হল বা রিসর্ট ভাড়া করতে হয়। কিন্তু তখন তো ফ্ল্যাট  কালচার  আসেনি, স্টেশনে নেমে রায় ভিলা বা চৌধুরী  ম্যানসন যাব বললে রিক্সাওয়ালারা বসিয়ে নিয়ে মহাসমাদরে নিয়ে এসে বাড়ি পৌঁছে দিত। অনেক সময়ই তারা ভাড়া চাইতেও  লজ্জা পেত। ভাড়া জিজ্ঞেস  করলে তারা বলত যা হয় দেবেন কারণ ভাড়া চাইলে যদি বাবুদের সম্মান  নষ্ট হয়ে যায়। বাবুদের বাড়ির  অতিথি মানে তাদের ও যেন অতিথি। আর্থিক  ও সামাজিক  বৈষম্য  থাকলেও কেমন যেন  একটা সৌহার্দ্য  ও প্রীতির সম্পর্ক  ছিল যা কালক্রমে আজ নিশ্চিহ্ন। যাই হোক,  ফিরে আসা যাক  সেই বিয়েবাড়ির কথায়। এখানে সব কিছুই  ঢালাও। এই বিয়ে বাড়িতে খাওয়ার  প্রতিযোগিতা হতো ।শহরের  বিভিন্ন  ক্লাবকে তাঁরা নিমন্ত্রণ  করতেন এবং সেরা পেটুক মশাইকে তাঁরা পুরস্কার  দিতেন। বিভিন্ন  ক্লাবের  বিশাল দেহী  পালোয়ান তো আসতেনই,  সঙ্গে কিছু কুকুর পেটওয়ালা ডিগডিগে মার্কা লোক ও আসত এবং প্রায়শই  দেখা যেত এই লোকগুলোই  সিংহভাগ  পুরস্কার  নিয়ে যেত। আরও  একটা জিনিস  ছিল যেটা  হচ্ছে অতিথিপরায়ণাতা। খাওয়ার  সময় তদারকি ছাড়াও  খাবার  শেষে বেরোনোর  সময় জিজ্ঞেস করতেন  পেট ভরে ঠিকঠাক  করে খেয়েছে তো? কোন  ত্রুটি হয়নি তো? ট্যাডপোল দা বড় সাইজের  চল্লিশটা লুচির  সঙ্গে প্রয়োজনীয় তরকারি বা মাছ, মাংসের সঙ্গে বালতিখানেক পোলাও  ও বড় এক হাঁড়ি দইয়ের সঙ্গে পরিমাণ  মতো রসস্থ বোঁদে ও বড় সাইজের  রসগোল্লা ও সন্দেশ  মিলিয়ে খান পঞ্চাশেক  মিষ্টি খেয়ে বড় একটা ঢেকুর  তুলে ট্যাডপোল দা খাওয়া সমাপ্ত করতেন।  এ হেন  বৃকোদরের প্রথম পুরস্কার  বাঁধা। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা সান্ত্বনা পুরস্কারগুলো কুকুরপেটওয়ালা হরি বা ভজাদের  কপালে জুটতো। 
এবার  আসা যাক, আরও  একটা আধুনিক বনেদী বাড়ির  বিয়েতে যেখানে বনেদীয়ানা এবং অতিথিপরায়ণতার সংমিশ্রণ সুন্দর ভাবে প্রতীয়মান।  কলকাতা থেকে জনা তিরিশেক এবং বম্বে থেকেও সম সংখ্যক বরযাত্রীদের দিল্লী যাবার  ব্যবস্থা হয়েছে প্লেনে এবং সেখান থেকে একটু দূরে ফরিদাবাদের  সূরযকুণ্ডে  তাজ হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। কলকাতা থেকে দিল্লির যাত্রায় সাতজনের  জন্য  হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে।এরমধ্যে চারজনের  অপারেশন  বা অসুস্থতা এবং বাকি তিনজন অশীতিপর  বৃদ্ধা। কিন্তু এমনই ব্যাপার  যে এই বিয়েতে যেতেই  হবে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের  কথা এঁদের  মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশী বয়স্কা তিনিই সবচেয়ে বেশী ফিট। তাঁর সম্বন্ধে পরে কিছু বলতেই  হবে কারণ তিনি অনন্যা এবং  তাঁর  বয়স তিরানব্বই। তিনি পাত্রের  ঠাকুমা। যাই  হোক শীতের  শুরুতেও  দিল্লী যথেষ্টই  ঠাণ্ডা এবং শীতকাতুরে  বাঙালির তার জন্য  প্রস্তুতি সহজেই অনুমেয়। যাই হোক, সন্ধ্যে নাগাদ  দিল্লী বিমানবন্দরে পৌঁছে, মালপত্র  নিয়ে অনেকগুলো গাড়ি এবং একখানা বাসে সবাই  তাজ হোটেলে এসে পৌঁছাল। গোলাপ দিয়ে সম্বর্ধনার  পর মাটির  ভাঁড়ে গরম চায়ের  অভ্যর্থনা এক অসাধারণ অনুভূতি। খানিকটা গলা গরম করে যাওয়া হ'ল নিজের নিজের ঘরে এবং কিছুটা আনপ্যাক করতে না করতেই  সমন এসে গেছে ডিনারের। আক্রমণ  শুরু হ'ল থরে থরে সাজানো বিভিন্ন  সামগ্রীর।  ব্যূফে সিস্টেমে যার যা প্রাণে চায়  বাধানিষেধহীন হয়ে তাই দিয়ে পেট ভরাও।  কেউ  দেখতেও যাচ্ছেনা, বাধাও দিচ্ছেনা। হঠাৎই  মনে হ'ল ট্যাডপোল দা বেঁচে থাকলে কি যৎপরোনাস্তি আনন্দিতই  না হতেন। টানা ঘুমের  পরে সকালে উঠে নিজেই নিজের  চা বানিয়ে খেয়ে নেওয়া, সঙ্গে থাকা বিভিন্ন  ধরণের  স্ন্যাকসের সহযোগে।  সকাল বেলায় ব্রেকফাস্ট  ঐ হোটেলের ই একটা রেস্তোরাঁয়।  এরই মধ্যে একজনের জুতোর  সোল গেছে খুলে। সে বেচারা খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসেছে রিসেপশনে  জিজ্ঞেস  করতে কাছাকাছি কোন জুতোর দোকান  বা রিপেয়ার করার কোন জায়গা আছে কিনা । এদিকে পাত্রীর দাদার  নজরে সেটা পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে দিল এক অডি গাড়ির  ড্রাইভারকে। কি আর করে বেচারা। আরও  একজনকে সঙ্গে  নিয়ে চলল মুচির খোঁজে অডি গাড়িতে চড়ে।  মুচি যেখানে বসে তার থেকে অনেক  দূরে গাড়ি রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পকেট  থেকে খুলে যাওয়া সোলটা বের করে বলল ইসকো বানানা পড়েগা। ঠিক হায় সাব অভি পেস্টিং কর দেতে । নহী নহী ভাই আপ পেস্টিং করকে সিলাই ভি কর দিজিয়ে। তো সাব, উসমে তো বহুত  টাইম লগেগা। কুছ পরোয়া নেহী।   এর পর সঙ্গীতের  জন্য রিহার্সাল  শুরু। নাচগানের মাধ্যমে দুই পরিবারের  আরও  কাছাকাছি  আসা এই সঙ্গীতের উদ্দেশ্য। ঐদিন  সকাল  বেলায় বম্বে থেকে একটা টিম এবং কলকাতা থেকে আরও একটা টিম চলে এল সঙ্গীত সন্ধ্যাকে  আরও  মধুময় করতে। শুরু হ'ল অমিতাভ  বচ্চনের  গলায় গণেশ বন্দনা দিয়ে আর তারপরেই শুরু হ'ল নৃত্য গীতের সুষমামণ্ডিত পরিবেশন। ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই  কি দারুণ  রিহার্সাল, দেখার মতন। যাই  হোক, রাতের  ডিনারের  পর গল্প, গল্প আর গল্প।
পরদিন  ঘুম ভাঙতে একটু দেরী হ'ল। সকাল  বেলায় নান্দীমুখ  ও গায়ে হলুদ। দুটো পাশাপাশি স্যুইটে পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষের  অবস্থান।  সুতরাং গায়ে হলুদের  তত্ত্ব নিয়ে যাওয়া আসাতে  কোনসময় ব্যয় হ'লনা। সন্ধ্যে বেলায় বিয়ে, পাত্র এল করতে বিয়ে রোলস রয়েস  নিয়ে।  বিয়ের  মণ্ডপ খোলা জায়গায়। ঠাণ্ডা হাওয়ার  কামড়ে বসে থাকা যায়না কিন্তু চারদিকে হিটার  জ্বালিয়ে দেওয়ায় খুবই  মনোরম পরিবেশ তৈরী হয়েছিল আর কবিগুরুর  গান আগুনের  পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে মনে পড়ে যাচ্ছিল। এদিকে প্রশস্ত  হলে খাওয়া দাওয়া চলছে। বিভিন্ন  অতিথিরা আসছেন,  যাচ্ছেন  ও তাঁদের পছন্দ মতন খাওয়া দাওয়া করছেন  আর ঐদিকে অনুরাগ রাস্তোগীর ব্যাণ্ডের অপূর্ব  সুর একের পর এক মূর্ছনা সৃষ্টি করে চলেছে। এক অপূর্ব  মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। লাঠি হাতে এক স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক রাস্তোগীর গানের ভিডিও  করছিলেন এবং আলাপ করলেন।  বাঁশি, স্যাক্সোফোন, বেহালা ও কীবোর্ডের সন্তুলন মিশ্রণে  একের পর এক পুরনো  দিনের গান বেজে উঠছে আর ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, বুড়িদের শরীর  হিন্দোলিত হচ্ছে। উপস্থিত  জনগণের  মধ্যে সবচেয়ে বর্ষীয়ান  ভদ্রমহিলার  শরীরের আন্দোলন  দেখে লাঠি হাতে হাঁটা ভদ্রলোক ঐ ভদ্রমহিলার  হাত ধরে নাচার  জন্য  অনুরোধ  করলেন।  ঐ বর্ষীয়সী  ভদ্রমহিলা তাঁর অনুরোধ  উপেক্ষা  করতে পারলেন  না। তিনিও পুরোদস্তুর নাচে অংশগ্রহণ করলেন  এবং রাস্তোগীরাও  অত্যন্ত  উদ্বুদ্ধ  হয়ে উঠলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আরও  অনেক  বর্ষীয়ান  ভদ্রলোক ও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলালেন। কি অসাধারণ  প্রাপ্তি বর্ণনা করা যায়না। যাই হোক,  পরদিন  সকালে ব্রেকফাস্ট  করে ফিরে আসার  পালা। চারদিনের লোকজনের  ব্যবহার এতটাই  মধুর  ছিল  যে এটাকে একটা তেল খাওয়া  মেশিনের  সঙ্গে তুলনা করা যায়। পার্থক্য  এইটাই  যে মেশিনের  চলন প্রাণহীন  কিন্তু এখানে প্রত্যেকটি লোকের ব্যবহার  হৃদয়মিশ্রিত।

Thursday, 16 December 2021

সময়

সে এক বড্ড দামাল ছেলে, নামটা ছিল  সময়
ধরতে তাকে চেষ্টা সবাই  করে কিন্তু কেবলই হাত ফসকে সে পালায়
পৃথিবীর আলো যখন  চোখে পড়ে খেলতে থাকে আপনমনে নিজ মাতৃক্রোড়ে 
কেমনভাবে যায় যে কেটে বেলা,এবার  স্কুলে ভর্তি হবার  পালা
বন্ধু অনেক হ'ল যে ইস্কুলে ,কেউ বা তারা থাকল আমার  সাথে
কেউ বা গেল মেডিক্যালে কেউ বা অন্য পথে
আগের দিনে ছিল  পেশা ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারি
কেউ  বা হতো উকিল নয়তো কেউ বা প্রফেসারি
এখন তো ভাই  হরেক পেশা কেউ হয় এম বি এ
কম্পিউটারের অনেক  শাখা কেউ বা এম সি এ
ভিন্ন  পেশায় বন্ধু জোটে ভিন্ন তাদের মত
কথায় কথায় মান অভিমান পাল্টায় তাদের পথ
মেলেনা সেই  স্কুলের দিনের  বন্ধু নির্ভেজাল 
মান অভিমান ভুলে না যাওয়ায় কেটে যায় সেই তাল
চুলে ধরে পাক নড়ে যায় দাঁত শেষের আমন্ত্রণ 
বুঝতেই পারি দিনের শেষে সন্ধ্যার  আগমন
নিয়মের ফেরে সন্ধ্যার পরে রাত্রি প্রতীক্ষায়
ছেড়ে যেতে হবে এই ধরাধাম নূতন যাত্রায়
তবুও  চেষ্টা করে যাই শুধু সময়কে  ধরিবার
সময় শুধুই  হাসিয়া বলে আমি দুর্নিবার।


Wednesday, 15 December 2021

স্বপ্নের খোঁজে লেখক নিখোঁজ

মোহনবাবুর আজ খুব আনন্দ ।দীর্ঘদিন  কাজ করার  ফাঁকে আজ একটু লম্বা ছুটি পেয়েছেন। গিন্নীর অনেক অনুযোগ আজ একটু প্রশমিত করার  সুযোগ  এসেছে। যখনই  ছুটির  দরখাস্ত  করেছেন তখনই কর্তৃপক্ষের অনুরোধ  এসেছে একটু পিছানো  যায়না? মোহনবাবুর স্বভাবই  এরকম যে উনি কখনোই কর্তৃপক্ষের  আদেশ অমান্য  করেন নি। কিন্তু এবার  তাঁর ঊর্ধ্বতন  কর্তৃপক্ষ আর না করতে পারেন নি মুখরক্ষার খাতিরে। যাই হোক মহানন্দে গুনগুন করতে করতে বাড়ি ফিরছেন। অফিসের  শেষে সাধারণত  মোহনবাবু এতটাই  ক্লান্ত হয়ে  ফেরেন যে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে একটা বড় গামলার  মতন  কাপ চা না খেলে কথাই  বলতে ইচ্ছা করেনা। খাওয়া দাওয়া করার  পরে এই মোহনবাবুর একটা ব্যাপার আছে। কিছু না কিছু উনি লিখবেন। আজ সেই মানুষটার অন্য রকম চেহারা দেখে গিন্নী রীতা রীতিমত  চিন্তিত হয়ে পড়ল। কি গো, আজ কি লটারির  টিকিটে কিছু ভালোমন্দ  পেয়েছ নাকি?  মোহন বা রীতা কেউই  কারো নাম ধরে ডাকেনা। হ্যাঁগো, শুনছো  এরই মধ্যে ঘোরাফেরা করে। নাম ধরে ডাকতে  স্বামী বা স্ত্রীর  দুজনেরই  কেমন  লজ্জ্বা লজ্জ্বা ভাব। আজ মোহন বিনয়ের কাছ থেকে গরম গরম আলুর  চপ ও পেঁয়াজি  কিনে এনেছে। আজ শুধু চা নয় সঙ্গে তেল মাখিয়ে  মুড়ির  সঙ্গে বেশ জম্পেশ  করে আলুর চপ ও পেঁয়াজি খাচ্ছে। হঠাৎই  রীতাকে টেনে নিয়ে মুখে এক গাল মুড়ি ও আলুর  চপ ঠুঁসে  দিয়েছে, রীতা হকচকিয়ে গেল। এই বুড়ো বয়সে কি মাথার  গন্ডগোল  হল কিনা ভেবে খুবই  দুশ্চিন্তাগ্রস্ত  হলো। কি ব্যাপার,  আজ কি ভীমরতি হলো নাকি? মোহন আর হেঁয়ালির  মধ্যে রাখল না, বলল যে  অবশেষে  ছুটি পাওয়া গেছে,  আমরা যাব বেড়াতে সবাইকে নিয়ে।  তার মানে? এর মানে খুবই  সহজ। আমরা সবাই  বেড়াতে যাব । সবাই  মানে? সবাই  মানে আমরা সবাই, বাবা, মা, তোমার  বাবা, মা আমরা সবাই।  এতজন বুড়ো মানুষকে নিয়ে যেতে তোমার  বুক একটুও  কাঁপছে না? 
না। আমি  সবাইকেই  নিয়ে যাব। 
ট্র্যাভেল এজেন্টকে বলে একটু  বেশিই  টাকা দিয়ে হায়দরাবাদ  যাবার  টিকিট  কাটা হলো। টিকিট কাটা হলে উনি যাত্রাটা কি রকম  হবে সেটা নিয়ে মোটামুটি একটা নিবন্ধ খাড়া করলেন।  মোহনবাবু ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনি, মেয়ে, জামাই, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি এবং নিজেদের  টিকিট নিয়ে বারটা টিকিট  কেটে  রওনা দিলেন তাঁরা সবাই।  খুব  ভাল  চলছে গাড়ি। চার বুড়োবুড়ি সেই পুরনো  দিনের কথাই  রোমন্থন  করে চলেছে। এদিকে ছেলে, বৌমা ও মেয়ে, জামাই তারাও  গল্পে মত্ত। মোহন ও রীতা তাদের  নাতি ও নাতনিদের  নিয়ে ব্যস্ত।  হঠাৎই  ট্রেন টা একটা বড় স্টেশনে এসে থামল। অনেকক্ষণ  ধরেই ট্রেন টা থেমে আছে। গল্প করতে করতে সবার  চোখই  বেশ  লেগে এসেছে আর এই ফাঁকে ক্ষুদে দুটো কখন সবার  অলক্ষ্যে  ট্রেন  থেকে নেমে স্টেশন  চত্বরে খেলতে শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎই  একটা হ্যাঁচকা টান, ট্রেন টা চলতে শুরু করেছে। তখনও কারো খেয়াল  হয়নি যে বাচ্চা দুটো গেল  কোথায়? এরপর ট্রেন টা আস্তে আস্তে স্পীড  নিতে শুরু করেছে। হঠাৎই  মোহনের  খেয়াল  হলো যে বাচ্চা দুটো নেই। দরজার  কাছে ছুটে এসে দেখে তারা ট্রেনের  পিছনে ছুটছে কাঁদতে কাঁদতে। কালবিলম্ব না করে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে নামল এবং নাতিকে কোনরকমে কামরায় প্রায় ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে নাতনির নাম ধরে ডাকতে থাকল কিন্তু কেমন  যেন  হাওয়ায়  উবে গেল।  ইতিমধ্যে ট্রেনটি অনেক দূর চলে গেছে  শুধু ট্রেনের  পিছনে লাল আলোটা দেখা যাচ্ছে। বোঝাই  যাচ্ছেনা যে ট্রেনটি থেমেছে না চলে যাচ্ছে। আর মোহন  পাগলের  মতন নাতনির নাম ধরে ডেকে এদিক ওদিক  ছোটাছুটি করছে।  স্বাভাবিক ভাবে জিআরপি কে খবর দেওয়ার  কথা তার  মনেও আসেনি। হঠাৎই  কেমন  ভাবে যে মোহনের  মাথা বিগড়ে  গেল এবং কি করে যে সে উধাও  হয়ে গেল  কেউ জানতেও পারল না। লাইনে লাইনে সে খোঁজে তার  নাতনিকে। 
তার  ছেলে, বৌমা, মেয়ে জামাই রা সকালে উঠে দেখে যে তাদের  বাবা বা শ্বশুর মশাই তাঁর বার্থে  নেই । প্রথমে তারা ভাবল যে হয়তো টয়লেটে  গেছেন কিন্তু অনেকক্ষণ  পরেও তাঁকে  দেখতে না পেয়ে বিজিয়ানগরম স্টেশনে জিআরপিতে  জানাল। মোহনের  বাবা, মা এবং রীতার  বাবা মা ও  খুবই  অস্থির  হয়ে পড়েছেন কিন্তু তাঁরা এতই বৃদ্ধ যে কি করা উচিত  তা তাঁরা  বুঝে  উঠতে পারছেন না। নাতি ও নাতনি তারাও এতটাই  ছোট  যে তারাও কেমন  ভীষণ  চুপচাপ  হয়ে গেছে।  রীতা তার ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে আলোচনা করে বিজয়বাড়ায়  নেমে যাওয়ার স্থির করলেন  এবং স্টেশন  মাস্টারের সঙ্গে দেখা  করে আদ্যোপান্ত  বললেন এবং তিনিই  তাদের  ফেরার  বন্দোবস্ত  করলেন কিন্তু মোহনের  কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা। আসলে মোহন  স্বপ্ন  দেখে তার  নাতি নাতনিদের  খেলতে দেখে মাঝরাতে কোথায় যে নেমে গেলেন  কেউ জানতেই পারল না। মোহনের  খোঁজ  এখনও  পর্যন্ত  পাওয়া যায়নি। সাধারণত  একই সঙ্গে চার জেনারেশন দেখাই যায়না কারণ  আজকাল  ছেলে বা মেয়েরা অল্প বয়সে বিয়ে করেনা, বড় জোর  তিন  জেনারেশন দেখা যায়। কিন্তু চার জেনারেশনের  একসঙ্গে যাত্রা  এক বিরল ব্যাপার। তার যে এরকম নিদারুণ পরিণতি হবে এটা সকলের বুদ্ধির অগোচরে। 

Thursday, 11 November 2021

গানের আসর

গানের আসর বিভিন্ন ধরনের হয়। কোথাও  ক্ল্যাসিকাল, কোথাও  রবীন্দ্র সঙ্গীত,  কোথাও আধুনিক  আবার কোথাও  বা পাঁচমিশেলি। আসরের  শ্রোতাও সেখানে ভিন্ন, ভিন্ন  তাদের  স্বাদ যার প্রতিফলন  হয় তাদের  পোশাক আশাকে। উচ্চমার্গের  ক্ল্যাসিকাল গানের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোকের, চোখে তাদের  চশমা যেটা প্রায় নাকে নেমে এসেছে কিন্তু অত্যন্ত  দক্ষতার সঙ্গে সেটা ম্যানেজ করছেন যাতে না পড়ে যায়। শীতের  সময়েই  সাধারণত এই অনুষ্ঠানগুলো হয় এবং শালটা  কাঁধের  উপর ফেলে একটু শিল্পী বা সাহিত্যিক টাইপের আঁতেল মার্কা ভাব করে অনুষ্ঠানে আসেন এবং কথা যেখানে না বললেই  নয় সেখানে বলেন এবং  বেশিরভাগ  সময়েই  মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক  ঘাড় নাড়েন এবং মাঝে মধ্যেই  হুম  বলে একটা আওয়াজ  বেরোয়। আর ঠিক  পছন্দ  না হলে ঠোঁটটা একটু সামান্য বিস্তার করেই আবার  যথাস্থানে  ফিরে যায়। অনুষ্ঠান  শুরু হতেই এঁদের  মাথা নাড়ার জন্য এবং বাহ বাহ আওয়াজে শিল্পীর মনঃসংযোগে কখনও  বাধা সৃষ্টি হয় এবং শিল্পীর বিরক্তিকর  দৃষ্টি তাঁদের  উপর প্রতিফলিত  হয়।
মহিলাদের শাড়ি ও গয়নার প্রতিযোগিতা এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায়। আর দেখা যায় মেক আপের প্রতিযোগিতা। ভাল  অনুষ্ঠান  দেখব না এদের  দেখব এই নিয়ে রীতিমত  ধন্দে পড়ে যেতে হয়। দামী শাল কিন্তু শীত নিবারণ করার  বদলে গয়নাগাঁটির  প্রদর্শনে সহায়তা করে। যাই হোক,  এটা এলিট সমাজের অনুষ্ঠান  এবং এঁরা যতটা সম্ভব  সামনের  সারির  টিকিট  সংগ্রহ  করেন  এবং যতটা গান বোঝেন তার থেকে বেশী  বোঝার  ভান  করেন। দেখা যায় যাঁরা ছোটখাট  শিল্পী বা সত্যিই  শিল্পানুরাগী  তাঁরা আপাদমস্তক  চাদর বা শালে মুড়ে সবচেয়ে কম দামের  টিকিটে একদম পিছনের  সারিতে বসে সুরজালের মায়ায়  বুঁদ  হয়ে রয়েছেন। এতো গেল ক্ল্যাসিকাল গানের আসর।  এবার  আসা যাক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের  অনুষ্ঠান। বিশ্বভারতীর কপিরাইট  শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন শিল্পীদের রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশন যেন অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। যে যেমন ইচ্ছা গেয়ে চলেছে, কারও  কিছু বলার  নেই।  এঁদের  মধ্যে অনেকেই  হয়তো বেশ  নাম করে ফেলেছেন  এবং স্বঘোষিত  অথরিটির  তকমা লাগিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু অতীতের প্রথিতযশা শিল্পীদের  গাওয়া গানের  সঙ্গে এদের আকাশ পাতাল তফাত। হয়তো আমাদের  সকলের  মনে আছে যে দেবব্রত বিশ্বাসের  মতন শিল্পীর  গাওয়া গানও বিশ্বভারতী মিউজিক  বোর্ডের  অনুমোদন  না পাওয়ায় রেকর্ড  হিসেবে বেরোয়নি। এই নিয়ে শিল্পীর  মনঃকষ্টের  কোন শেষ  ছিলনা। তাহলে আজ যাঁরা পয়সা দিয়ে রেকর্ড  করছেন তাঁদের  কি অবস্থা হতো ভাবতেই  ভয় লাগে। সুতরাং, যাঁরা সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র  বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের  গান শুনেছেন  তাঁরা চট করে এমুখো হবেন  না। কিন্তু এখনও  কিছু শিল্পী আছেন যাঁরা ঐ প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বিশুদ্ধ ভাবেই  গাইছেন এবং যোগ্য  সম্মান পাচ্ছেন। 
এবার  আসা যাক, পাঁচমিশেলি ঝকমক রামা হো টাইপের  গানের  আসরে। যেমন শিল্পী তেমনই  শ্রোতা। টাইট জিনস,  অন্ধকারেও সান গ্লাস পরা, সাধারণ  লোক পরলে যখন তখন  হোঁচট খেয়ে মরবে। বড় বড় ড্রাম, হাতে লাঠি সোঁটা( ড্রাম বাজানোর  কাঠি) , হাতে নানান ধরণের গিটার,  শিল্পীদের  মাথায়  বাঁধা চকরা বকরা রুমাল, দেখলেই গা টা কেমন ঘুলিয়ে ওঠে। শ্রোতাদের চেহারা এবং বেশবাস ও প্রায় একই রকম। প্রায় ষোল সতের  বছর আগে বান্দ্রায়  অনেক রাতে একগুচ্ছ আধুনিকা কে ছেঁড়া, ফাটা জিনসের প্যান্ট পরতে দেখে নিজের  চোখকেই  বিশ্বাস  করতে পারিনি। কিন্তু এখন  তো দেখছি এগুলো আকছার। শিল্পীর  গলায় নেই কোন সুর যা ঢাকা পড়ে যায় বাজনার  গগনভেদী  আওয়াজে। সুতরাং, মান বাঁচিয়ে পাশ কাটানোই  ভাল। 

এবার  আসা যাক, এক বিচিত্র  গানের  আসরে। যাঁরা খুব ভোরে ওঠেন তাঁরা নিশ্চয়ই  এই গানের  সঙ্গে পরিচিত  হয়েছেন। ভোরের  আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়ে যায়  এই কলতান। টিয়া , বুলবুল, পায়রা, কাক,শালিক, চড়াই,  ঘুঘু ,কোকিল, কাঠঠোকরার  তির তির তির তির তির তির ডাক এবং মাঝে মাঝেই  বসন্ত বাউরির টুই টুই রব মনকে ভীষণ  পবিত্র  করে তোলে। শ্রোতা  কে আছে না আছে তার  বিন্দুমাত্র  তোয়াক্কা না করে নিজেদের  মনে আপন খেয়ালে গেয়ে চলে নতুন দিনের  আগমনবার্তা। এই আসরের  কিন্তু কোন  তুলনা নেই । সবাই  নিজেদের  সাধ্য মতো  গেয়ে চলেছে, কোথাও কোন সমালোচক  নেই, আছে শুধু সঙ্গীত  এবং এ এক অপূর্ব  বিচিত্রানুষ্ঠান।

Sunday, 7 November 2021

আত্মীয়

আত্মীয় শব্দটা শুনলেই মনে হয় যেন কোন রক্তের সম্পর্ক  আছে কিন্তু ঘটনাচক্রে শব্দটা একটু গোলমেলে। প্রায়শই  দেখা যায় যেখানে কোন  রক্তের  সম্পর্ক ই নেই সেখানেই  প্রগাঢ় বন্ধুত্ব এবং রক্তের  সম্পর্কে একদম লাঠালাঠি ব্যাপার। কিন্তু এরকম  উলট পুরান কেন? আসলে আত্মীয় মানে যেখানে আত্মার  সম্পর্ক  আছে বা যোগ আছে এবং সেখানে রক্তের সম্পর্ক  থাকতেও পারে নাও পারে। অনেক ঘটনা মনে আসে এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে কিন্তু কিছু কিছু ঘটনার  কথা বললেই এই শব্দের  তাৎপর্য বোঝা যাবে।

আমেদাবাদে ওসমানপুরায় গুজরাট বিদ্যাপীঠের পাশের  গলির ডালবড়া অত্যন্ত বিখ্যাত। ভাল করে ফাঁটানো ডালের  বড়া লেবুর রসে জারিত পেঁয়াজ কুচি এবং গরম তেলের  কড়াইয়ে  একবার  ছেড়ে দিয়েই উঠিয়ে নেওয়া আধভাজা কাঁচালঙ্কার  যে কি অপূর্ব  স্বাদ সেটা যে না খেয়েছে সে কিছুতেই  বুঝতে পারবে না। অনুজের  এটা ছিল  খুবই  পছন্দের  খাবার  এবং বহুদিন  অফিসের  পরে রান্না করে খেতে ইচ্ছে না হলে বেশ খানিকটা  ডালবড়া  খেয়েই উদরপূর্তি করতো। পাশেই ছিল  তুকারামজীর সাইকেল ভ্যানে লাগানো দোকান যেখানে ভাত, ডাল, তরকারি পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে অনুজ তুকারামজীর  দোকানের খদ্দেরও   হয়ে যেত। ডালবড়ার দোকান এবং তুকারামজীর দোকানের  সামনে সারি সারি বেঞ্চ পাতা থাকত যেখানে বসে খরিদ্দাররা  বসে খেতে পারতো। বেঞ্চগুলোর সামনে পাতা থাকতো টুল যেখানে  লোকে খাবার রাখত। অফিসের  খুব কাছেই তার বাড়ি এবং দোকান গুলো থাকার জন্য খুব  বেশি সময় যেতনা খাবার  সংগ্রহের জন্য। ডালবড়াই হোক আর তুকারামজীর  দোকানের রুটি তরকারিই হোক একটা দৃশ্য  অনুজের  নজর এড়ায় না। একটা অন্ধ লোককে রোজ তুকারামজীর  দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখত। কৌতূহলবশত একদিন জিজ্ঞেস  করে ফেলল তুকারামজী এই লোকটিকে রোজ দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখি, কি ব্যাপার? জবাবে সে জানালো যে ওর নাম জিতুভাই এবং ও সারাদিন  ভিক্ষা করে রাত্রিবেলায় ও এখানে আসে খাবার  খেতে। অনুজ একটু আগ্রহ  দেখিয়ে আরও  জিজ্ঞেস  করল ওর খেতে  কত টাকা লাগে এবং তার উত্তরে সে জানালো যে দশ টাকা কিন্তু ও জিতুভাইয়ের  কাছে কোন  পয়সা নেয়না। আশ্চর্য ব্যাপার,  রাস্তার  ফুটপাথের ধারে চালানো এক দোকানের  মালিক  এই গরীব  অন্ধ মানুষটিকে অন্তত  একবেলা পেটভরে খাবার  জোগায় অথচ এত পয়সাওয়ালা লোক চারিদিকে এত বাজে পয়সা খরচ করে কিন্তু কাউকে কিছু দিতে গেলেই এদের  প্রাণ বেরিয়ে যায়। 

অনুজের  বদলির  অর্ডার  এসে গেছে কারণ তার এখানে থাকার  মেয়াদ  শেষ। রিলিভারকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে আরও  তিন চার দিন  লাগবে। তুকারামজী, একটা কথা বলব আপনাকে? বলুন স্যার।  তুকারামজী, আপনি তো জিতুভাইকে রোজই খাওয়ান,  আমাকে একটু ওর সেবা করতে দেবেন? তুকারাম তো একটু অবাক হয়ে গেল, বলল আপনি কেন দেবেন? অনুজ  জানালো যে ওর বদলি  হয়ে গেছে এবং সে একহাজার  টাকা দিতে চায় জিতুভাইয়ের  খাবারের  জন্য। তুকারামজী একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল কিন্তু অনুজ তার হাতে জোর করে টাকাটা গুঁজে দিল। জিতুভাইয়ের  সঙ্গে না তুকারাম না অনুজ কারো কোন  রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও  যেন  একটা যোগ  রয়েছে যার নাম আত্মীয়তা। 
 

Saturday, 6 November 2021

ভাই ফোঁটা

আজ ভাই ফোঁটা, কালী পূজোর  পর দ্বিতীয় দিন।  কেউ  কেউ  বলেন  ভাই  দ্বিতীয়া। কোন কোন  রাজ্যে একে বলে ভাই  দুজ। যে নামেই  বলা হোক না কেন এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভাইদের  একেবারে পোয়াবারো। দূর দূরান্ত থেকে ভাইরা আসতেন বোন  বা দিদির কাছে ফোঁটা নিতে। যে সমস্ত  ভাইরা ছিল ভোজন রসিক এবং উদরের অন্তস্থলের পরিধি ছিল বিশাল,  এই বিশেষ  দিনে বোনেরা সাধ্য মতন যোগাড়যন্ত্র করত ভাইদের  উদরের  পরিতৃপ্তির জন্য। বিশাল চেহারার মালিক হলেই যে সে খুব  খেতে পারবে, এমন নয়। কিন্তু অনেক রোগা পাতলা লোক যাদের কুকুরের পেট বলত তাদের  খাওয়া দেখলে লোকে তাজ্জব  হয়ে যেত। বোনদের ভাগ্যেও  যে কিছু জুটত না তা নয় । যদি ভাইয়েরা একটু সুপ্রতিষ্ঠিত  হতো তাহলে তো কথাই নেই। সৈনিক  ভাইরা এই অনুষ্ঠানকে  অত্যন্ত  মর্যাদা দেয় এবং বহু সিনেমায় দেখা গেলেও  এটা সত্যি যে ওরা অনেক কষ্ট করেও বোনের  কাছে ফোঁটা নিতে আসে। বোনেরা, ভাইয়ের কপালে দিলাম  ফোঁটা , যমের দুয়ারে  পড়ল কাঁটা এই কথাগুলো বলে সত্যিই  যমের  দরজা আটকাতে পারে কি না জানিনা কিন্তু প্রার্থনার  তো একটা জোর আছে আর এই প্রার্থনা শুনতেই  তো এত দূর থেকে ছুটে আসা। যে কোন মূহুর্তে শত্রুর  বা আতঙ্কবাদীর ছুটে আসা বুলেটে সচল দেহটা  নিশ্চল হয়ে যেতে পারে যেটা আমাদের মতন সাধারণ নাগরিকদের  সম্ভাবনা খুবই  কম। সুতরাং আমাদের মতন স্বার্থপর আত্মসুখী  লোকেরা এক ভালোমন্দ  খাওয়া ছাড়া আর কিছুই  ভাবতে পারিনা। বোনদের ভাগ্যে জোটে হয় কিছু টাকা না হয় একটা শাড়ি, হালফিলে একটা মোবাইল  কিংবা ট্যাবলেট অবশ্য  বোন যদি আধুনিকা  হয়। সাহিত্যের  প্রতি আকর্ষণ  থাকলে ভাল লেখকের  বই ও জোটে।একটা কথা  কিন্তু আমাকে বেশ বিব্রত করে। ভাইয়ের  কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের  দুয়ারে পড়ল  কাঁটার পরের দুটো লাইন  সম্বন্ধে আমার  সংশয় কিছুতেই যায়না।যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার  ভাইকে ফোঁটা । যমুনা যমকে বাঁচাতে কার দুয়ারে কাঁটা দেয়? তার মানে যমকে চমকানোর জন্য  আরও  বড় কেউ  আছে? প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজেই  চলেছি, উত্তর  এখনও  অধরা।

এবার  যাওয়া যাক আগের  দিনের  ভাই ফোঁটায়  তারপর আসা যাবে এখনকার  ভাইফোঁটায়। আগে তো প্রত্যেক সংসারেই পাঁচ সাতজন  ছেলেমেয়ে ছিল এবং আশেপাশে মাসিমা বা পিসিমারা থাকতেন এবং তাঁদের  সংসারেও ভাইবোনের সংখ্যাও  ঐ একই রকম ছিল। সুতরাং ভাই ফোঁটা মানেই একবিরাট উৎসবমুখর দিন। লম্বা বারান্দায় আসন পেতে নিজের ভাইয়েরা, পিসতুতো মাসতুতো ভাইয়েরা একসঙ্গে বসে ফোঁটার  অপেক্ষায় বসে থাকা এবং দিদিদের সিনিয়রিটি হিসেবে ফোঁটা দেওয়া এবং সবার  ফোঁটা শেষ হলে সমস্ত দিদি বোনেরা হাত লাগিয়ে এক একজনের  প্লেট ধরে ভাইদের  হাতে তুলে দেওয়া। দিদি, বোনদের  সংখ্যা বেশি হলে সবার  হাত একটা প্লেটে লাগানো সম্ভব  না হলে বলা হতো অন্তত গায়ে হাত লাগিয়ে রাখ। বসে বসে কিন্তু আড়চোখে  কোন প্লেটে বেশি পড়েছে বা কোন  প্লেটে কম এটা দেখা চলতো এবং মনে মনে যিনি দিয়েছেন তার মুন্ডপাত করা। কিন্তু এ সত্ত্বেও একটা বিপুল  আনন্দ উপভোগ  করা যেত।  যে ভাইরা দূরে থাকার জন্য  ফোঁটা নিতে আসতে পারেনি তার মঙ্গল  কামনা করতে দরজার  চৌকাঠে ফোঁটা দিত। ফোঁটা শেষ হতে হতে মেয়েদের  জলখাবারের পালা এবং সেটাও  মিটতে মিটতে বেলা গড়িয়ে যেত। এরপর দুপুরের খাওয়া এবং সেই  পর্ব শেষ  হতে প্রায়  চা খাওয়ার  সময়। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও  সব দিদিদের  বা মা বোনদের  মুখের  হাসিটা মিলাতো না। তবে কতটা জোর করে হাসি বা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত  সেটা তখনই বোঝা যেত না। বোঝা যেত যখন  মা বলতো একটু পা টা টিপে দেওয়ার  জন্য।  গৃহকর্তা কতটা চাপের  মধ্যে থাকতেন সেটা তাঁর গম্ভীর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে হতো। তবুও  তিনি এই উৎসবের আনন্দের  অন্তরায়  হতেন না। আজ আমরা যখন  ঐ জায়গায় এসেছি তখন সেদিনের  গৃহকর্তার গম্ভীর মুখের  কারণ  বুঝতে পারি।

এখন প্রত্যেক  পরিবারেই ছেলেমেয়েদের  সংখ্যা হয় এক বা বড় জোর দুই। যদি দুজনই ছেলে বা দুজনই মেয়ে হয় তাহলে এই উৎসবের  আনন্দ উপভোগ  করার জন্য  মাসতুতো বা পিসতুতো  ভাই বোনদের  সাহায্য  নিতে হয়। আর কাছাকাছি কেউ না থাকলে কমপ্লেক্সের  ভাই  বোনদের সাহায্য  নিয়ে উৎসবের  আনন্দ  উপভোগ করতে হয়। আগে পায়েস  যেমন ভাইফোঁটার  বা জন্মদিনের  এক বিশেষ  অঙ্গ  ছিল এখন সেই জায়গায় এসে গেছে কেক। আনন্দ  এখন কতটা  ফিকে হয়ে গেছে সেটা যারা দুটো অবস্থারই সাক্ষী তারা বুঝতে পারে, অন্যরা নয়। 

আজ জীবন  সায়াহ্নে পৌঁছে যখন মূল্যায়ন  করতে যাই তখন  ভাবতে চেষ্টা করি যে কোন  অবস্থাটা ভাল  ছিল।  দুই অবস্থারই  কিছু  সদর্থক এবং নঞর্থক  দিক আছে কিন্তু একটা কথা স্বীকার  করতেই  হবে যে কিছু পেতে গেলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই  হয়। গতবছর  যা ছিল  এবছরে তা  নেই। গতবছর  এইদিনে  আমার  বড়দি করোনার জন্য  ফোঁটা দিতে না পারলেও দরজার চৌকাঠে ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ  জানালো আর তার  কিছুদিন  পরেই তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে আমাদের  ছেড়ে চলে গেল। তার আগের বছর  চলে গেলেন  আমার অত্যন্ত  শ্রদ্ধেয় রামাইয়া  সাহেব।  জানিনা পরের বছর  আবার সবাইকে পাব কিনা।


Thursday, 4 November 2021

কবি

ছন্দোময় জীবনে  প্রবেশ  করিনি আমি
ডানা নাই মোর আকাশে উড়িনা আমি
কবি পরিচিতির যোগ্য  নই যে আমি
অতি সাধারণ মানুষের মতো আমি।


Wednesday, 27 October 2021

গল্প নয় আর লেখকও নই।

গল্প নয় আর লেখক নই। কিছু পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা।।
বয়স তখন খুবই কম। লোকে গান করতে বললে লাজ লজ্জাহীন হয়েই গান শুরু করে দিতাম। সুতরাং, বয়সটা সহজেই অনুমেয়।

পাড়ার দুর্গাপুজো আমাদের বাড়ীর মাঠেই হতো অন্তত জন্ম ইশতক দেখছি। বাইরের বারান্দায় আমাদের ঠাকুর বানাতো ধীরেন পাল। পাড়ার লোকের চাঁদা দিয়েই হতো পূজো ছিলনা কোনো স্পন্সরশিপ বা বিজ্ঞাপন। ধীরেন কাকার প্রায় হাতে খড়ি আমাদের পাড়ার দুর্গা প্রতিমা দিয়ে। সুতরাং যত কম পয়সা দিয়ে করিয়ে নেয়া যায় আর কি। সব যুগেই একটা শোষণের পন্থা চলে এসেছে। মাত্র চল্লিশ টাকা দিয়ে তাকে দিয়ে দুর্গা ঠাকুর বানানো হতো। ছিল অনেক বড় বড় শিল্পী কিন্তু তারা আমাদের ধরা ছোয়াঁর বাইরে। সব চেয়ে দামী ছিলেন যামিনী পাল, তার পরে বিমল পাল, শীতল দাস এবং বাঙাল রা। লোকে বলতো বাঙাল নাকি যামিনী পালের ছাঁচ চুরি করেছে। কি করে? যামিনী পালের ঠাকুর বিসর্জনের পরে বাঙাল নাকি তার লোকজন দিয়ে মায়ের মূর্তির মাথাটা ভেঙে নিয়ে এসেছিল এবং যামিনী পালের মতনই মায়ের মুখ বানাতো ওই ছাঁচ দিয়ে। সত্যি বাঙাল সেটা করেছিল কিনা কারো জানা নেই কিন্তু লোকমুখে প্রচার হয়ে গিয়েছিল চোর বাঙাল। বাঙাল কে এভাবে বলাটা এখন মনে হয় তার শিল্পকীর্তিকে নিচে দেখানো। যাই হোক বাকিদের নিজস্বতা ছিল কিন্তু যামিনী পালের নাম উঠলেই বাঙাল এর নামটা উঠে আসতো।

এবার আসি ধীরেন কাকার কথায়। আমাকে খুব ভাল বাসতো কারণ সবাইকে ধীরেন কাকাকে বকতে শুনতাম। যে লোকটার শিল্প সম্বন্ধে জ্ঞান শূন্য সেও এসে জ্ঞান দিত। মাঝে মাঝে ধীরেন কাকাকে নীরবে চোখ মুছতে দেখতাম। আমি ছোট হলেও ধীরেন কাকার সমব্যথী ছিলাম।  ঠাকুর তৈরীর কয়েকটা ধাপ আছে। শুকনো খড় দিয়ে প্রথমে শরীরটা মোটামুটি ভালো ভাবে বেঁধে তারপর একমাটির প্রলেপ পড়তো। তারপর দুমাটির প্রলেপ। তারপর রোদে শুকানো এবং সাদা রং হতো এবং তারপর যে রঙে প্রতিমাকে রাঙানো হবে সেটা হতো। এরপর চোখ আঁকা এবং সবশেষে চালি বসানো হতো। ধীরেন কাকা বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে আমাদের   বাড়ীর বাইরের বারান্দায় সব কাজটাই করতো এবং নিজের বাড়ী ফিরে যাবার আগে সব জায়গাটা পরিষ্কার করে যেত। ধীরেন কাকার চ্যালা হিসেবে আমিও খুব গর্ব অনুভব করতাম মনে মনে। কাকা মাঝে জল খেতে চাইলে আমি চুরি করে দু চারটে নারকেলের নাড়ু নিয়ে দিতাম। কাকা জিজ্ঞেস করতো মাকে বলেছ তো? আমি থাকতাম চুপ করে। একদিন মা কি কারণে বাইরে আসলে ধীরেন কাকা বলে উঠলো " বৌদি নারকেলের নারুটা খুব ভালো হয়েছে। মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কোনোরকমে সামলে নিলো । পরে আমাকে বললো তুমি আমাকে না বলে কেন এই কাজ করেছ? আমি কেঁদে ফেললাম বললাম মা কাকার খুব খিদে পেয়েছিল কিন্তু কিছু বলছিল না।রোজ যে মুড়ির একটা ছোট্ট পুঁটলি আনে আজ তাও ছিলোনা। মা বললো আছছা ঠিক আছে কিন্তু এবার থেকে আমায় জিজ্ঞেস করে দেবে। আমি কেবল মাথাটা নাড়ালাম। অসুরের চেহারাটা কি রকম হবে কাকা আমায়  জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম মদন দার মতন করতে হবে। মদনদা জুনিয়র ভারতশ্রী হয়েছে আর চেহারাটাও ছিল গ্রীক দের মতন। মদনদাকে নকল করার মতো আমার চেহারা কোনোদিন ছিলোনা কিন্তু মদন দা যেভাবে দেখাত সেইভাবে দেখাতে পাটকাঠির মতন চেহারায় যখন দেখালাম তখন সবাই হাসতে থাকলো কেবল ধীরেন কাকা ছাড়া। কাকা সেইমতন খড় বেঁধে ,যেখানে যেমন মাসল হবে প্রয়োজনীয় খড় বাঁধল। আমার না আছে পড়াশুনো না আছে অন্য কিছু । বুঁদ হয়ে দেখতাম ধীরেন কাকার কাজ আর অন্যান্য শিল্পীদের কাজ দেখে এসে কাকাকে বলতাম। জানিনা ধীরেন কাকা তার থেকে কোন কিছু নিয়েছিলেন কিনা। প্রায় বছর পাঁচেক কাকা আমাদের দুর্গা, কালী ,লক্ষ্মী এবং সরস্বতী ঠাকুর করেছিলেন। তারপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে কাকার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। এখন ধীরেন কাকা নিশ্চয়ই বেঁচে নেই কিন্তু হঠাৎ এক ঝলক দমকা হাওয়ায় স্মৃতির পুরোনো পাতাটা উল্টে গেল আর এদিক ওদিক থেকে উড়ে যাওয়া পাতাগুলো যথাসম্ভব  একত্রিত  করে লিপিবদ্ধ করে ফেললাম। 

Tuesday, 19 October 2021

ঝুলনযাত্রা

আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কি এনেছিস, বল্?


কি চাই বল্? তোদের জন্য ঝুলনযাত্রা এনেছি এখন, খুশী কি না বল্। সত্যিই তো, ঝুলনযাত্রা এমনই  এক অনুষ্ঠান  যা সমগ্র উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্ব ভারতে মহা সমারোহে পালিত হয়। হোলি এবং জন্মাষ্টমীর পরেই এই গুরুত্বপূর্ণ  উৎসব যা হিন্দুরা অত্যন্ত ধূমধাম  করে পালন করেন। রাধা এবং কৃষ্ণকে  নিয়ে বহু চর্চিত প্রেমগাথা  এই উৎসবের  মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। ঝুলনযাত্রা মানে কোনসময় রাধা দোলনায় বসে আছেন এবং শ্যামসুন্দর  তাঁকে দোলা দিচ্ছেন এবং মাঝে এত জোরে তিনি দোলা দিতে থাকলেন যে শ্রীরাধা ভীত সন্ত্রস্ত  হয়ে পড়লেন এবং হে মাধব আমায় রক্ষা করো এবং সেই  সুযোগে শ্যামসুন্দর তাঁর পাশে দোলনায় বসে পড়লেন  এবং শ্রীরাধার  সখীরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন।  আবার  কোন  কোন  ক্ষেত্রে শ্রীরাধা এবং শ্রীমাধব  পরস্পর উল্টোদিকে দোলায় দুলছেন  এবং সখীরা তাঁদের  সেবা করছেন। প্রায় ষাট বছর আগে ইসকন ( ইন্টারন্যাশনাল  সোসাইটি  ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস)  মানে উনিশশো বাহাত্তর সালে তাঁদের  মন্দির  বা অফিস  রাসবিহারী মোড়ে প্রতাপাদিত্য  রোডের  সন্নিকটে খোলে এবং পরবর্তীকালে স্থান সঙ্কুলান  না হওয়ায় থিয়েটার রোডে তাদের  মন্দির  স্থাপন  করে। ধীরে ধীরে এর কলেবর  বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন  জায়গায় এঁদের  সম্প্রসারণ  হয় এবং বর্তমানে কলকাতা থেকে একশ  চল্লিশ  কিলোমিটার  দূরে মায়াপুরে সর্ববৃহৎ মন্দির  স্থাপন  করেন  এবং এটাই এঁদের  হেড অফিস। যাই হোক, এবার  ফিরে আসা  যাক ঝুলনযাত্রায়।

প্রচন্ড  গরমের পরে বৃষ্টি আসায় সবাই  খানিকটা হাঁফ  ছেড়ে বাঁচে।শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা স্বস্তির  নিঃশ্বাস ফেলে আবার  সবুজ  পাতায় সেজে ওঠে আর এর মধ্যেই শ্রাবণ  পূর্ণিমার স্নিগ্ধ  আলোকে শুরু হয় ঝুলনোৎসব।  শৈশবের  সেই ঝলমলে দিনগুলো চোখের  সামনে জ্বলজ্বল  করে ওঠে। শেখর, মলয়, প্রকাশ  এবং আমার কাজ ছিল  পাড়ার যত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের  নিয়ে শহরের  অলিতে গলিতে দু পা অন্তর বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন  রকমের  পুতুল দিয়ে সাজানো ঝুলন দেখানো। ঘাসের চাপড়া  দিয়ে তৈরী হতো পাহাড়, তার  মধ্যেই  করা হতো কুলু কুলু বয়ে যাওয়া ঝর্ণা।  অদূরে শহরের  রাস্তা এবং চলছে রিক্সা , চলছে গাড়ি এবং রাস্তার  মোড়ে  ট্রাফিক পুলিশ। একটু দূরে করা হতো বাজার,  নানারকম  তরি তরকারি  নিয়ে বসতো বুড়ি মা এবং ক্রেতা হিসেবে  থাকতো কিছু  লোকজন।  আমরা যদি আজে বাজে দাম বলতাম  তাহলে সূত্রে বাঁধা বুড়ির মাথা  নাড়িয়ে দেওয়া হতো যার অর্থ  না ঐদামে সে বিক্রি করবেনা। পাহাড়ের  মাঝখানে থাকতো  একটা দোলনা যেখানে শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ  বসে থাকতেন  এবং দোল খেতেন।  কোন একটা বাড়িতে সবরকমের  পুতুল  না থাকায় বিভিন্ন  বাড়ি থেকে এইসমস্ত  পুতুল  সংগ্রহ করা হতো এবং ঝুলন  শেষে ঐ পুতুলগুলো আবার  ফিরিয়ে দেওয়া হতো। তুতু,  জলু,  টিঙ্কু, রিঙ্কু,  ইতি, গজু,ঝকান এবং আরও  অনেক ছোট ছোট  ছেলেমেয়েদের  ঝুলনোৎসব দেখিয়ে আনা আমাদের  কাজ ছিল। তখন বাড়িতে বাড়িতে টিভির  আক্রমণ  ছিলনা আর সেই কারণেই  খেলাধূলো  ছেড়ে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চোখ সাঁটিয়ে  বসে থাকা ছিলনা, ছিল ক্লাবে যাওয়া, ড্রিল করা,মেয়েদের  খো খো খেলা বা যোগাসন  করা এবং রাস্তার  আলো জ্বলে ওঠার  আগেই  বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা এবং রাত নটার  আগে খেয়েদেয়ে ঘুম। আবার  সকালে উঠে পড়তে বসা এবং স্কুলে যাওয়া এবং স্কুল  থেকে ফিরেই  কিছু খেয়ে ক্লাবে যাওয়া। এই ছিল  দৈনন্দিন  রুটিন এবং মাঝে মাঝেই  এইধরণের  পূজো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এক বিশেষ  আনন্দ  পাওয়া।

সময়ের  পরিবর্তনে সবকিছুই  পরিবর্তন  হয়েছে। পড়াশোনার  ধাঁচ পাল্টেছে, জীবন যাত্রায় এসেছে বহুল পরিবর্তন কিন্তু এরই মধ্যে সেই অনাবিল  আনন্দ  যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। চাকা তো আর উল্টোদিকে ঘুরবে না, সুতরাং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে  এবং যারা পারবে না তারা পিছনে পড়ে থাকবে। জানিনা এখন  কটা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা  ঝুলনোৎসব  পালন করে এবং আনন্দ  উপভোগ  করে।

Friday, 15 October 2021

কুমড়ো কাটা ভাসুর

আগে যখন  যৌথ পরিবার  ছিল তখন প্রত্যেক  সংসারেই পাঁচ সাতটা ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের ও তাদের  বাবা মায়েদের এবং অনেক ক্ষেত্রে বোন ভগ্নীপতিও তাদের  সংসার এর মধ্যেই  থেকে যেত। পুরোনো কলকাতায় বিশেষ করে উত্তর কলকাতায় এইরকম  বড় বাড়িতে এক ছাদের তলায় বহু মানুষের বাস ছিল। মফস্বলেও  এইরকম  বাড়ির  সংখ্যা নিতান্ত  কম ছিলনা। এইসব যৌথ পরিবারকে ধরে রাখতো  তাদের  জমিদারি কিংবা পারিবারিক  ব্যবসা। ব্যাঙ্কে যৌথ হিন্দু পরিবারের  অ্যাকাউন্টে সংখ্যাও  নিতান্ত  কম ছিলনা। এখনও  অবশ্য  এইরকম  অ্যাকাউন্ট  আছে কিন্তু সেটা কি করে কম ট্যাক্স দেওয়া যায় সেই চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘোরার  জন্য। পারিবারিক  ব্যবসার তো অ্যাকাউন্ট  রাখতেই  হবে ,সেখানে দোষের  কিছু নেই  কিন্তু ট্যাক্স  ফাঁকি দেবার  উদ্দেশ্যে যখন  সেটা ব্যবহৃত  হয় তখন  সেটা নিশ্চয়ই  গর্হিত  অপরাধ।  অবশ্য  এখানে ছোট  বড় সবার  মানসিকতাই  এক। আইনের  প্রাবধানে যেটা করা সম্ভব  সেটা করেও  রিটার্নে কিছু আয় না দেখানো এটা একটা স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। গতবছর অর্থাৎ দুহাজার কুড়ি সালে সেপ্টেম্বর  মাসে লোকসভায় জানানো এক তথ্য  অনুযায়ী মাত্র এক শতাংশ  লোক ইনকাম  ট্যাক্স  দেয়। কেউ কেউ  বলেন, না এটা ঠিক  নয়,  এটা প্রায় এক দশমিক  ছয় শতাংশ সাবালক লোকদের  অর্থাৎ যাঁরা রোজগার  করেন। এঁদের  মধ্যেই রয়েছেন  দরিদ্র এবং অতি দরিদ্র যাঁদের  নুন আনতে পান্তা ফুরায়  তাঁদের  ট্যাক্স  দেওয়ার প্রশ্ন  তো আসেই না বরং তাঁদের  বেঁচে থাকার  জন্য  সরকারকে নানাধরণের  সাহায্য  করতে হয়। আর এই সাহায্য  পাওয়ার  জন্য তাঁদের  রাজনৈতিক  নেতাদের  দ্বারস্থ হতে হয় এবং এইখানেই  চলে কেরামতি। আমরা তোমাদের জন্য  চোখের জল ফেলব, তোমাদের  কথা যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেব, সব ঠিক আছে কিন্তু  তাতে আমাদের  পেট চলবে কি করে? তোমরা আমাদের  কিছু ভাগ দাও আর তোমরা ও বেঁচে থাকো আর আমাদেরও  শাঁসালো করে রাখো। তোমাদের  ভাগের  টাকায় আমাদের  ছেলেমেয়েরা ভাল  স্কুলে পড়বে, বড় হয়ে বিদেশ  যাবে, সেখান  থেকে মেধা না থাকলেও  একটা সার্টিফিকেট  কিনে আনবে যার জোরে ভাল  চাকরি না পেলেও নেতা হতে কোন আপত্তি নেই,  তাদের দিকে তোমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে আর বলবে বাবুসাহেবকে জেতাতেই  হবে, উনি তো আমাদের  ঘরের  ছেলে। এই খেলা  চলতেই  থাকবে ততদিন পর্যন্ত  যতদিন  এই সাধারণ  মানুষের  জ্ঞাননেত্র  উন্মীলিত না হয় এবং সেই আশা সুদূর  পরাহত। তোমাদের  ছেলেমেয়েরা মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পড়ুক,  পড়াশোনা কিছু হোক না হোক ,দুপুর বেলায় কিছু খাবার  খাক আর ফিরে এসে গুলতানি করুক আর একটু বড় হয়ে আমাদের  পার্টিতে নাম লেখাক। যখন  দরকার  পড়বে তখন  কারো বাড়িতে বোমা মেরে বা দরকার  পড়লে প্রতিবাদী কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ  করে দিয়ে আমাদের  পার্টির পাকাপাকি সদস্য  হয়ে যাবে। দরকার  পড়লে আমরাই তোমাদের  পুলিশের  হাজতে পাঠিয়ে দিয়ে চিরতরে সরকারি চাকরির  সুযোগ  বন্ধ করে দিয়ে আমাদের  অঙ্গুলিহেলনে নাচতে বাধ্য  করবো। তোমাদের  জন্য  মাঝেমধ্যেই  চোখে গ্লিসারিন দিয়ে চোখের  জল ফেলব, মাঝে মাঝেই কিছু শাঁসালো মানুষকে ঠান্ডা চোখে হুমকি দিয়ে টাকা তুলে তোমাদের  খাওয়াব আর ফটোগ্রাফার  আমাদের ফটো  তুলে বিভিন্ন  পত্রপত্রিকায়  ছাড়বে আর লোকে ধন্য ধন্য  করবে। এই চক্রব্যূহ  থেকে বেরোনোর  কোন রাস্তা নেই। 

কিন্তু এতসব কিছু বলার  সঙ্গে কুমড়োকাটা ভাসুরের কি সম্পর্ক?  যে কোন যৌথ পরিবারেই  এক আধটা ভাই থাকতো যারা বিয়ে থা না করে সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি সব কাজ করতো এবং বাবা মায়েদের  দেখাশোনা ,বাজার  করা, ভাইদের  বাচ্চাদের খেলতে মাঠে নিয়ে যাওয়া , ভাই ভাদ্দর বৌদের  সিনেমার  টিকিট  কেটে আনা মায় যাবতীয় ফাই ফরমাস  খাটা এইসব কাজ করা। এঁদের  মধ্যে কেউ যদি সর্বজ্যেষ্ঠ  হতেন তাহলে  বৃদ্ধ বাবা মায়ের সমস্ত  কিছু  দায়দায়িত্ব সামলে সংসারের সব ঝামেলা মেটাতে গিয়ে আর বিয়েই করা হয়ে  উঠতো না। এঁরা নিজের  প্রয়োজনের কথা বলতেই পারতেন  না এবং যদি বা কোন বিয়ের সম্বন্ধ  এল সেটাকেও  কিভাবে নাকচ করতে হয় তা এঁদের  ওপর যারা নির্ভরশীল  তাদের  কাছে শিক্ষনীয়  ছিল। কোন কোন বাবা মা বলতেন  বা অন্যান্য  ছেলে বা বৌমারা তাঁদের  বলতে বাধ্য  করতেন যে ও তো বিয়ে করবে না বলেছে। আর সেই বড় ভাই  কি করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে বলেন  যে আমি বিয়ে করব। সেটা বলাও হতো না আর তিনি অকৃতদার হয়ে সবার  প্রতি দায়িত্ব পালন করে একদিন  পৃথিবীর মায়া ছাড়াতেন। অত বড় সংসারে সবার  মুখে খাবার  জোগাতে  শস্তার  তরকারি কুমড়ো আসত কিন্তু কোন ভাই বা ভাইয়ের  বৌদের  ঐ কুমড়ো কাটার ইচ্ছে না থাকায় সেই  অগতির  গতি বড়ভাসুরকে অনুরোধ  কুমড়ো কেটে দেওয়ার জন্য।  যুক্তি শুনলে মাথা ঘুরে যাবে। কুমড়ো কাটলে  তাদের  স্বামীদের  জীবন হানির  আশঙ্কা থাকে। এই কথা শোনার  পর আর কোন ভদ্রলোক  আর কুমড়ো  না কেটে থাকতে পারেন।  কে চান তার ভাইয়ের  বৌ বিধবা হন।এই কারণেই  তাঁদের  কুমড়ো কাটা ভাসুর বলা হতো। 

এবার  আসি আমাদের  দেশের  নব্য যুগের কুমড়ো কাটা ভাসুর কে হতে পারেন? হয়তো এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খুব  কম হলেও এখনও  আছেন এইসমস্ত বিরল প্রজাতির  মানুষ  যাঁরা নিজেদের  স্বার্থ না দেখেই অন্যের  সাহায্যে এগিয়ে আসেন। নিশ্চয়ই  একজনের  কথা বিশেষ ভাবে মনে আসে আর তিনি হচ্ছেন  টাটা গোষ্ঠীর  কর্ণধার  শ্রী রতন টাটা মহাশয়। দেশের  প্রয়োজনে, দশের  প্রয়োজনে তিনি যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাতে একনম্বর  কুমড়োকাটা ভাসুর  তিনিই হতে পারেন। ভারতের  মতন এত বড় দেশে আরও  অনেক  ভাই রয়েছেন  কিন্তু তাঁরা নিজেদের  সম্পদ বাড়িয়েছেন এবং তুলনামূলক ভাবে  দেশের জন্য  সেরকম কিছু করেন  নি। অবশ্য  একেবারেই  কিছু করেন  নি বললে সত্যের অপলাপ হবে কারণ  তাঁরা বহুলোকের অন্নসংস্থান করেছেন  এবং দেশের  অগ্রগতিতে যথেষ্ট  সাহায্য করেছেন  কিন্তু তাঁরা কেউই এঁর সমগোত্রীয়  নন। অকৃতদার  এই  ভদ্রলোক বিভিন্ন  সময়ে যথেষ্ট  অপমানিত  হয়েছেন  কিন্তু তিনি ন্যাড়া বেলতলায় একবার  যান এই প্রবাদ বাক্যটিকে  মিথ্যা প্রমাণিত  করেছেন।  তাঁর  দীর্ঘ জীবন  কামনা করি এবং ভগবানের  কাছে অশেষ প্রার্থনা আরও  অনেক  রতন টাটা সৃষ্টি করুন  তিনি যাতে আমাদের  মতন স্বার্থপর  লোকেরা যারা আমাদের  কোন দায়িত্ব  নেই এবং অন্যের  ঘাড়ে দায়িত্ব  চাপিয়ে আরও  নিশ্চিন্তমনে  ঘুমাতে পারি।
  
 

Monday, 23 August 2021

ITU 9 Bed No.2 of RTIICS

অনেকদিন ধরেই  ভাবছি জীবনের প্রথম হাসপাতালে থাকার  অভিজ্ঞতা একটু লিপিবদ্ধ করার কিন্তু শরীর টা জুৎসই  না থাকার জন্য কিছুতেই  তা হয়ে উঠছিল না। আজ শরীরটা একটু ফুরফুরে অনুভব করতেই বসে পড়তে ইচ্ছে হলো একটু দুচার কলম লিখে ফেলার ঘটনাক্রম ভুলে যাবার  আগেই। 
অনেকদিন  ধরেই হাঁটুর  ব্যথা একদম কাহিল করে দিয়েছে। বন্ধ সমস্ত  রকমের  কাজকর্ম  করা। গোদের ওপর বিষফোড়া করোনা। বাড়িতে যারা দেখা করতে আসত, তারাও  ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোয় না। সামাজিক  মেলামেশা একদম বন্ধ। বন্ধুবর  অমিত বাবু যাঁর সেলুনে  চুল কাটা ছাড়াও বাড়তি পাওনা ছিল  চা এবং অসাধারণ  ভক্তি গীতি। ভারী মিষ্টি গলা ছিল  তাঁর, যদিও  কস্মিনকালেও  তিনি গান  শেখেন নি। তাঁর চলে যাওয়াটা এক ভীষণ  আঘাত যদিও  বয়স মাত্র  পঞ্চান্ন। এই করোনার  মাঝে যখনই  সরকার নিয়মকানুন একটু  শিথিল  করেছেন  তখনই  বন্ধু আমার সকাল  বেলায় দোকান  খোলার আগেই  আমার  বাড়িতে  এসে আমাকে ভদ্রলোক  বানিয়ে গেছেন। সেইদিন ও তিনি এসেছিলেন এবং তাঁর গুরুদেবের আশ্রমে লোকনাথ বাবার জন্মতিথি  পালনের  জন্য চাঁদা নিয়ে গেলেন আর তার কয়েকদিন  বাদেই তাঁর  ছেলের  কাছথেকে  তাঁর  হঠাৎই  চলে যাওয়ার  খবর পেয়ে একদম বাকশূন্য  হয়ে গেলাম। এই অতিমারিতে অনেক আত্মীয়স্বজন,  বন্ধুবান্ধবদের হারিয়ে হাসপাতাল সম্বন্ধে এক অত্যন্ত  ভয়াবহ ধারণা হয়েছিল। হাঁটুর  অবস্থা দিনদিন  খারাপ  হচ্ছে কিন্তু অপারেশনের  কথা ভাবতেই  পারছিনা এই অতিমারি এবং হাসপাতালের  কথা ভেবে।এরপর  অনেক কিছু  সমস্যা এসে যাচ্ছে একের পর এক। সহধর্মিনী এসে পড়লেন বম্বে থেকে। ইতিমধ্যেই  বন্ধুবর  অমলবাবু একদিন  সার্জেনের  কাছে নিয়ে গেলেন এবং মোটামুটিভাবে স্থির হয়ে গেল অপারেশনের। আগে যাঁকে দেখিয়েছিলাম তিনি পিয়ারলেস হাসপাতাল  ছাড়া কোথাও  করেন না কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবহার ঠিক  মনঃপূত  না হওয়ায় একরকম  বাধ্য হয়েই  অন্য ডাক্তার এবং অন্য হাসপাতালের  খোঁজ  করতে হলো। আমার  ভাগ্নী এবং একজন  বন্ধুস্থানীয়  দাদা যাঁর  কাছে হাঁটু অপারেশন করিয়েছেন এবং খুব ভাল  আছেন তাঁর  সঙ্গেই  যোগাযোগ  করলাম এবং বলা যায় প্রথম দর্শনেই  প্রেম। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালে ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হল এবং সেটাও আমাদের  অর্জুন অমলবাবুর তত্ত্বাবধানে। স্থিতপ্রাজ্ঞ  অমলবাবুই ছিলেন  হোতা আমাদের  দাদাস্থানীয় বন্ধু বিমান দার অপারেশনের  সময় এবং সেই একই  ডাক্তার  সৌম্য চক্রবর্তীর কাছে। ওঁর প্রথম  হাঁটু আঠারই  ডিসেম্বর দুহাজার উনিশে এবং দ্বিতীয় হাঁটু বিশে  ডিসেম্বর  করা হয়েছিল এবং তিনি এখন  সম্পূর্ণ  সুস্থ।  তাঁর  সেই  প্রথম  অভিজ্ঞতার ফলের হিসাব আমি অপারেশনের  আগে যেসব  পরীক্ষা করানোর  দরকার  সেগুলো করিয়ে নিয়েছিলাম  এবং তাতে আমাদের পরিশ্রমের  সুরাহা হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে দিন স্থির হল যে উনিশে জুলাই  প্রথম  হাঁটু এবং একুশে জুলাই  দ্বিতীয় হাঁটুর অপারেশন  হবে। আঠারই  জুলাই  সমস্ত  বন্ধুবান্ধব  একরকম  প্রায় ব্যান্ডপার্টি  বাজিয়ে আমাকে ভর্তি করে দিল  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালে। আমার  মনে হচ্ছিল  সতীদাহের সময় ঢাকঢোল বাজিয়ে সতীকে যেমন স্বামীর চিন্তায় সহমরণে যেতে বাধ্য  করা হতো ঠিক সেরকমই  যেন খানিকটা। আবার  কোন কোন সময় এটাও  মনে হচ্ছিল  যে পাঁঠাকে  বলি দেবার  আগে স্নান  করিয়ে কপালে সিঁদুর পরিয়ে যূপকাষ্ঠের সামনে যখন আনা হয় তখন  পাঁঠার যেরকম  মনের  অবস্থা হয় আমারও  যেন সেই অবস্থা। কিন্তু যে কষ্ট এই কয়েকবছর  পেয়েছি সেটা যখন ভাবছিলাম  তখন  মনে মনে একটা বল ভরসা পাচ্ছিলাম  এবং পাঁঠার  থেকে মনের দিক সামান্য একটু হলেও ঘএগিয়েছিলাম। অবশ্য  পাঁঠার  মনে এই ভাবোদয় যদি কখনও  হয় যে আমার  জন্মই হয়েছে লোককে মাংস খাওয়ানোর  জন্য, তাহলে ভগবানের  সামনে যদি উৎসর্গ হতে পারি তাহলে  পুণ্য বই পাপ তো হবেনা। যাই হোক,  মনের  মধ্যে যে ঝড় চলছিল তা বাইরে কিছুতেই  আসতে দেওয়া যাবেনা। ভিজিটিং  আওয়ার্স শেষ  হবার  পরেই  সাজো সাজো  রব পড়ে গেল। একজন  মেল নার্স  এসে বাঁহাতে  চ্যানেল  করে গেলেন। তিনি হঠাৎই জিজ্ঞেস  করে বসলেন যে স্যার  এই অল্পবয়সে আপনি কেন  হাঁটুর অপারেশন করাচ্ছেন? আমি তো হতচকিত হয়ে গেলাম।  তার  মানে সত্তর  বছরের পরে অপারেশন  না করালে আবার  কবে করাব? তিনি উত্তর শুনে একটু ঘাবড়ে  গেলেন।  অ্যাঁ, আপনার  বয়স সত্তর? হ্যাঁ, এই দুদিন  আগেই  জন্মদিনে পায়েস খেয়ে, কেক কেটে বাংলিশ হয়ে তবেই  না এসেছি এখানে। না না স্যার, বিশ্বাস  করুন , আপনাকে দেখে  পঞ্চাশ বাহান্নর বেশি লাগছেই  না। উত্তরটা শুনে মনে মনে ভাবলাম হুঁহুঁ বাবা, গডরেজ  কালি মেহেন্দি কি কামাল।  জানিনা কতটা আমার  মনোবল বাড়ানোর  জন্য  আর কতটাই  বা সত্যতা  আছে তার  মধ্যে। কিন্তু মনে মনে একটা খুশির  আমেজ ছড়িয়ে গেল। ঠাঁই  হয়েছে কেবিন নম্বর  আঠারোয় । অপারেশনের  আগে যা যা করণীয় একে একে তা সমাপ্ত হচ্ছে কিন্তু মনে বেশ খুশি খুশি ভাব। সকাল  বেলায় স্নান সেরে রেডি হয়ে বসে আছি ।অন্য একজন  নার্স  এসে অ্যাপ্রন পরিয়ে দিলেন এবং স্ট্রেচারে শুয়ে অপারেশন থিয়েটারের  দিকে যাত্রা শুরু হল। নিজেকে কেমন  যেন  একটা রাজা রাজা মনে হচ্ছিল।  ঐসময়  আমিই  তো আকর্ষণের  কেন্দ্রবিন্দু। ওটিতে  ঢোকার  আগের  মূহুর্তে দেখলাম ভাই  দেবাশিস, বন্ধু অমলবাবু ও  আমার  স্ত্রীকে। হাত নাড়িয়ে একটু হেসে সবার কাছে বিদায় নিয়ে যুদ্ধযাত্রায়  রওনা দিলাম। 
শুরু হল অ্যানেসথেসিয়ার কামাল। শিরদাঁড়ার  নীচের  দিকে পুটুশ  পুটুশ  করে গোটা চারেক  ইঞ্জেকশন দেওয়া হল এবং আমাকে বলা হল শুয়ে পড়ার জন্য। এর খানিকক্ষণ  পরে আমাকে বলা হল পা দুটো তোলার জন্য।  আমি বহু চেষ্টা করেও পা নড়াতেই  পারলাম  না। তখন  শুনতে পেলাম  যে ঠিক  আছে, অ্যানেসথেসিয়া সাকসেসফুল।  চোখের  উপর একটা কাপড় দিয়ে দেওয়া হল এবং মাথা ওঠাতে বারণ করা হল। ইতিমধ্যেই ডাক্তার  সৌম্য চক্রবর্তী এসে গেছেন  এবং আমাকে সকালের  শুভেচ্ছা  জানিয়ে তাঁদের  কাজ  শুরু করে দিলেন।  মাথা এবং শরীরের  মাঝে একটা পর্দা টেনে দেওয়া হল যাতে আমি  মাথা তুলে কি হচ্ছে তা দেখতে যেন  না পাই।
খানিকক্ষণ  পরে করাত চলার ভয়ানক  আওয়াজ  কানে আসছে কিন্তু টের পাচ্ছিনা কিছুই।  অবশ্য  টের পেলে যে কি হতো ভগবান  জানেন। এরপর  শুরু হল হাতুড়ির আওয়াজ। নতুন  হাঁটুর  প্রতিস্থাপন  চলছে কিন্তু আমার  মনে হচ্ছে কামারশালায়  কাস্তে,  কোদাল  তৈরী হচ্ছে। সবার কথাই  শুনতে পাচ্ছি কিন্তু স্পীকটি  নট। এর খানিকক্ষণ  পরে ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তীর  গলা, শ্যামল বাবু ,অপারেশন  হান্ড্রেড  পার্সেন্ট  সাকসেসফুল।  খুব ভাল  হয়েছে।  উনিতো বিদায় নিলেন  এবং এর কিছুক্ষণ  পরে আবার  রাজার মতো স্ট্রেচারে শুয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম এবং দেখা হল ঐ তিনজনের সঙ্গে। এবার  ঠাঁই  হল ছতলায়   নয় নম্বর আই টি ইউ এর দুনম্বর  বেডে।  সন্ধে বেলায় ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তী এলেন  এবং একটা ইন্টারভেনাস চালাতে বললেন  এবং হার্ট বিট পঞ্চাশ হলেই যেন  ওটা বন্ধ করে দেওয়া হয় কারণ ঐ ওষুধটা চালালে হার্ট বিট কম হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে  এটাও  বলে গেলেন  যে কোনরকম  অসুবিধে হলেই যেন  তাঁকে খবর দেওয়া হয়। শরীরের  বিভিন্ন  জায়গায় নানান জাতীয় নল লাগানো, ভিন্ন ধরণের  কাজ তাদের।  নড়াচড়া করার  উপায় নেই। মাঝরাতে হাতটা পায়ের  দিকে লাগল। চমকে উঠলাম। এটা কার শরীর? আমি কি শবদেহের স্তূপের  মধ্যে শুয়ে আছি , না কি? টিভিতে দেখেছিলাম  করোনার  সময় স্তূপীকৃত লাশের  মধ্যে থেকে  বড় লোহার  আঁকশি  দিয়ে একটা একটা লাশ কি করে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমারও  খানিকটা সেরকমই  মনে হচ্ছিল  কিন্তু উপায় নেই,  এখন  এই অবস্থায়ই  থাকতে হবে। মাঝে মাঝেই একজন  দুজন  আসছে এবং মনিটরের  দিকে নজর দিচ্ছে। কোনসময় নতুন  স্যালাইন চালাচ্ছে বা কোন সময় ওষুধ  দিচ্ছে চ্যানেল  দিয়ে। ইতিমধ্যে ডিউটি বদল হচ্ছে। বিভিন্ন  ধরনের  ইউনিফর্ম,  কারো সবুজ, কারও খয়েরি  আবার  কারও  বা নেভি ব্লু। যাদের  সবুজ  ড্রেস  তারা জুনিয়র  নার্স, খয়েরি রঙ পরিহিতরা  সিনিয়র  নার্স এবং নীল পোশাকধারীরা ডাক্তার। এসবগুলো  হয়তো সবাই  জানে কিন্তু  আমি যেহেতু হাসপাতালে প্রথম  এসেছি সেহেতু সবকিছুই  আমার  কাছে নতুন। বৃদ্ধ লোকের অ,আ,ক,খ শেখার  মতন। রাতের  ডিউটির রোস্টারের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে কে কে এসেছে আর যারা নির্দিষ্ট  সময়ের  মধ্যে আসেনি তাদের  জায়গায় ডবল ডিউটি করতে বলা হচ্ছে কাউকে কাউকে। এটা কেউ কেউ  করতে চায় আবার  কারও কারও খুবই অনীহা। এইরকম  একজন ইচ্ছুক  ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম কেন  সে ডবল ডিউটি করতে চায়? উত্তরে জানলাম  যে এটাতে সে ওভারটাইম বাবদ পাঁচশো টাকা এবং ফ্রীতে  খাবার  পাবে। সত্যিই তো, গরীব ঘরের  ছেলে, মাইনে বাবদ আঠার হাজার  টাকা থেকে পি এফ বাবদ  কিছু টাকা কাটিয়ে, ঘর ভাড়া মাসে আট,নহাজার  টাকা দিয়ে, বাড়িতে কিছু টাকা পাঠিয়ে কিই বা তারা খাবে আর কিই বা জমাবে?  চারিদিকে এত সমস্যা কিন্তু সমাধানের  রাস্তা আমার  জানা নেই। শুনি আর কেবলই  কষ্ট  পাই। তবে একটা জিনিস  নজরে পড়ল যে এত কষ্ট  সত্ত্বেও মুখের হাসি কিন্তু মেলায় নি এবং সেবার যে আদর্শ  তার  থেকে এতটুকু ও বিচ্যুতি ঘটেনি। আমার  উল্টোদিকের  সারির বেড সাতনম্বরে একজন বর্ষীয়ান বিধবা ভদ্রমহিলা যাঁর  কোন সন্তান সন্ততি নেই কিন্তু পয়সার কোন অভাব  নেই কেবলই  অস্ফূট স্বরে বলে চলেছেন ঠাকুর  আমায় এবার  নিষ্কৃতি দাও আর দুই  চোখে বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত জলের  ধারা। একটি অল্পবয়সী মেয়ে( নার্স) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে আর বলছে দিদা, কাঁদছো কেন , তুমি ভাল  হয়ে যাবে আর আবার  আগের মতো সব কিছু ঠিক  হয়ে যাবে। কিন্তু অন্ধের  কি বা দিন  আর কিই বা রাত্রি। খুব  ইচ্ছে হচ্ছিল  তাঁর সঙ্গে কথা বলার  কিন্তু দূরত্বের জন্য সে আশা আর পূর্ণ  হল না। আর নয় নম্বর  বেডে একজন  রোগী কিন্তু সম্পূর্ণ  ভিন্ন  চরিত্রের।  কেবলই  চেঁচাচ্ছেন আর পয়সার  গরম দেখাচ্ছেন  আর নার্স,  ডাক্তার  সবাইকেই  গালিগালাজ  করে চলেছেন। সবাই  অতিষ্ঠ  হয়ে উঠেছে। হক, হক করে আওয়াজ আসছে আর ডাক্তার,  নার্সদের মুন্ডপাত হচ্ছে আর তার সাথেই ঐ ওয়ার্ডের  সমস্ত  রোগীদের দফারফা। কয়েকজন  ডাক্তার  এসে তাঁর  ভিতরের  কফটা  বের  করে দেবার পরেই শুরু হল জল জল বলে  তারস্বরে চিৎকার। জল দেওয়ার পরেই শুরু হল বাটি বাটি বলে চিৎকার  এবং যথারীতি গালাগালি  কিন্তু একজনের ও মুখ থেকে কোন খারাপ শব্দ বেরোল না। খুবই  ভাল লাগল তাদের  অসাধারণ  ট্রেনিং এর কথা ভেবে। এর  জন্য আমি নিশ্চয়ই  বাহবা দেব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এত কষ্টের  মধ্যেও  যে ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে সেবা করে চলেছে তার  জন্য  কোন প্রশংসাই  যথেষ্ট  নয়। উনিশ তারিখ  রাতে একটি ছেলে এল আমাকে দেখাশোনা করার  জন্য।  নাম জিজ্ঞেস  করায় জানালো যে রাজেশ  দেবনাথ। চোখেমুখে  তার  ফুটে উঠছে সহৃদয়তা। এতটুকু চোখের  পাতা এক না করে শুধু আমাকেই  নয় সমস্ত  রোগীদের  যেভাবে দেখাশোনা করল তাতে মনটা শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। সকাল  বেলায় তার রিলিভারকে  সমস্ত  কিছু বুঝিয়ে দিয়ে আঙ্কল আমি যাচ্ছি। এই মেয়েটি এখন  আপনাকে দেখবে। ইতিমধ্যেই  চলে এসেছে আমার পায়ের এক্সরে করতে, কেমন  হয়েছে অপারেশন  দেখার  জন্য। এরপর  দুজন এলেন পায়ে ব্রেস পরিয়ে হাঁটানোর  জন্য। আমার  দেখাশোনা করার জন্য যে মেয়েটি এসেছিল তার নাম দেবলীনা। একটু বেশিই  কষ্টের  মধ্যে থাকে সে, যেটা বোঝা যাচ্ছিল  তার  ব্যবহারে। সব কিছুই  করছে মেয়েটি কিন্তু চোখেমুখে  খুব  ক্লান্তির  ছাপ। এরমধ্যেই  আর একটি মেয়ে তাকে কিছু বলেছে সাহায্যের জন্য কিন্তু ও তার  আবেদনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সাড়া দিলনাএবং আমার ই পরিচর্যা করতে থাকল। আমি তাকে বললাম  দেবলীনা তুমি বরং ওকে গিয়ে একটু সাহায্য  কর। ও বেচারা ঠিক  বুঝতে পারছেনা কি করা উচিত।  তার উত্তরে সে বলল যে  একদিন  দেবলীনা  ওর কাছে সাহায্য  চাওয়ায়  সে করেনি। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম  যে ঠিক  আছে তুমি তাকে সাহায্য  করে বুঝিয়ে দাও  যে সেদিনের  ব্যবহার  তার  ঠিক ছিলনা। কিছুক্ষণ  পরেই  তাদের  দুজনের চোখেমুখে ফুটে ওঠা  আনন্দ  দেখে নিজের  মনটাই খুশিতে ভরেj উঠল।ইতিমধ্যেই  দিন গড়িয়ে সন্ধে হল, এল দীপা আমাকে দেখার  জন্য। সারারাত  আমার পায়ের  কাছে বসে মনিটর করছে।কখনও  চালাচ্ছে স্যালাইন  কখনও  অন্য  ওষুধ। পরের দিন  সকালেই  ডান হাঁটুর অপারেশন আর দীপা যেন  এক অতন্দ্র প্রহরী। যারাই  এসেছে আমার দেখাশোনা করতে তারা সবাই  নর্থ ইস্টের  ছেলেমেয়ে। কেউ ত্রিপুরার,  কেউ মেঘালয়ের,  কেউ বা নাগাল্যান্ডের আবার  কেউ  বা মণিপুরের। মনে মনে গেয়ে উঠলাম  বিবিধের  মাঝে দেখ মিলন মহান। ইতিমধ্যেই সেই গালাগাল দেওয়া ভদ্রলোক কে অন্য  কোথাও  পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে আর বেশ শান্তির  পরিবেশ  তৈরী হয়ে গেছে ওয়ার্ডে। দ্বিতীয় অপারেশনটাও বেশ রাজকীয় ভাবেই  সম্পন্ন  হয়ে গেছে এবং সন্ধেবেলায় যার সান্নিধ্য  আমি পেলাম  তার নাম  পরমার্থ। পরমার্থ ভৌমিক,  ত্রিপুরার  ছেলে। রাত্রি পৌনে বারটায় সে আমার ড্রেস চেঞ্জ করে দিল।  রাত দেড়টায় দেখি  সে এদিক থেকে ওদিক করছে এবং প্রত্যেকটি রোগীদের  খেয়াল  রাখছে। মনটা অপূর্ব  কৃতজ্ঞতায়  ভরে উঠল।  ডেকে বললাম,  ভাই  আপনি একটু বসবেন  না? স্যার,  আমি যদি বসি তাহলে আপনাদের  কে দেখবে? এই উত্তরে আমি আশ্চর্য  হয়ে গেলাম  ছেলেটির  কমিটমেন্ট  দেখে। অনেক উচ্চপদে  আসীন  লোকদেরও  এই ধরণের  আচরণ  দেখা যায়না আবার  খুব  সাধারণ  লোকের ও এই ধরণের  আচরণ শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে  দেয়। ওর ফোন নম্বর নেবার  জন্য  মনটা হাঁকপাঁক করতে লাগল এবং অবশেষে নিলাম ও। আরও  কিছু ছেলেমেয়েদের  ব্যবহার খুবই মনে রাখার  মতন। অভিজিত, রণজিত,  স্বাতী এবং আরও  একজনের যার নামটা জিজ্ঞেস  করা হয়নি। আমি তার  নাম দিয়েছি ত্রিপুরেশ্বরী।  ছোট্ট খাট্টো সুন্দর মেয়েটি সকাল  বেলায় এসেই মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস  করত," দাদু ,কেমন  আছ?" মনটা আনন্দে ভরে যেত। কেউ ডাকে স্যার, কেউ ডাকে আঙ্কল আবার  কেউ বা ডাকে কাকু কিন্তু দাদু ডাকের একটা আলাদাই  মাহাত্ম্য।  আমার  ভাইপো, ভাগ্নী দের ছেলেমেয়েরা কেউ ডাকে দাদাভাই,কেউ বা বলে ছোড়দাভাই। আর নিজের  নাতনি ডাকে ভাই  বলে কিন্তু দাদু ডাকের একটা আলাদাই মজা। হঠাৎই  লাফিয়ে একটা জেনারেশন  উঠে পড়লাম  কিন্তু যে আনন্দ  পেলাম  তা ভাষায় বর্ণনা  করতে  পারব না। আজ বাইশ তারিখ,  আই টি ইউ থেকে আমার  বিদায় নেওয়ার পালা। তার আগে যথারীতি এক্সরে নেওয়া এবং হাঁটানোর  পালা শেষ।  লাঞ্চের পরে আমাকে চলে যেতে হবে। এদিকে একনম্বর  বেডে একজন রোগীনী  এলেন  অপারেশনের পর।  যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন  আর ব্রাত্য  ব্রাত্য  বলে ডাকছেন। মাঝে মাঝেই  মা মা বলে যন্ত্রণায় ডেকে উঠছেন। মনটা খুব খারাপ লাগতে শুরু করল কিন্তু আমার  তো কিছুই  করার নেই।  অবশেষে রণজিত  আমার  কষ্টের  অবসান  ঘটিয়ে আমাকে আটতলায়  কুড়ি নম্বর  কেবিনে স্থানান্তরিত  করল।
বাইশে  জুলাই বিকেল বেলায় বাড়ির লোকজন এসেছে। অনেকদিন পর তাদের  দেখে আইটিইউ ছাড়ার  দুঃখ খানিকটা কমলো।  কিন্তু করোনার থাবা আবার  নতুন  করে বসতে শুরু করায় বিধি নিষেধের  মাত্রাটাও  বেড়ে গেল।  একজনের  বেশি লোককে আসতে দিচ্ছেনা। অথচ বন্ধুবান্ধবদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয় কিন্তু স্বাস্থ্য বিধির কথা চিন্তা করে একরকম  বাধ্য হয়েই দেখতে আসা বন্ধ করতে হলো। এরই মধ্যে অতনু আরটি পিসিআর  টেস্ট করিয়ে ফেলেছে আমার  সঙ্গে থাকবে বলে কিন্তু শনিবার রাতে রিপোর্ট  আসায় কেবলমাত্র  রবিবারের  জন্য  ওর থাকাটা অনেকটাই  নিরর্থক  হয়ে যাবে বলে ওকে নিষেধ ই করলাম।  যদি ও থাকতো তাহলে ওকে কেবিনের মধ্যেই  বন্দি থাকতে হতো কারণ  ওরা কেবিনে থাকা লোকদের  বাইরে যেতে দিচ্ছেনা।আর আমাকে সোমবার  ছেড়ে দেবে বলেছে। পরমার্থ এখানে শেরউইন বলে একজনের নাম উল্লেখ করেছিল। ও আমার সঙ্গে এসে দেখাও করলো। এও খুব  ভাল  ছেলে। দীপক  দাস, গৌতম মাইতি প্রত্যেকে খুব ভাল  ছেলে। এত ভাল  লোকদের  সংস্পর্শে এসে বাড়ির  লোকের  না আসাটা যেন  কিছুই  মনে হচ্ছিল না। দেখতে দেখতেই  সোমবার  বা ছাব্বিশ  তারিখ  এসে গেল।  আমাকে আজ ছেড়ে দেবে। কিন্তু সকাল থেকেই  মনটা কেমন  একটা বিষণ্ণতায়  ভরে গেল। মজুমদার দা ও দোলা বৌদি আসতে চেয়েছিলেন  কিন্তু সেই একজন ছাড়া কাউকে যেতে না দেওয়ার জন্য  বারণ করলাম। এদিকে সমস্ত ফর্ম্যালিটি পূর্ণ করে আমাদের অর্জুন  বা ভট্টাচার্য  সাহেব এবং দেবাশিস নীচে অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে পিউ এবং আমার  সহধর্মিনী নীচে অপেক্ষারত।  সমস্ত  কাগজপত্র  গোছগাছ করে দীপক  দাস আমাকে বিদায় জানাল। আমি দেবাশিসকে বললাম  ওদের  কিছু দেবার  জন্য  কিন্তু কাউকেই  রাজি করাতে পারলাম না। এবার  আবার রাজার  মতন ফিরে আসার  পালা। স্ট্রেচারে শুয়ে আমি যখন  আসছি তখন  আমার  দুচোখে জলের  ধারা দেখে সিস্টার  দুজন জিজ্ঞেস  করলেন, " আঙ্কল, বাড়ি যাওয়ার  সময় তো লোকে খুব  উৎফুল্ল  থাকে, আর আপনার  চোখে জল?" না ভাই, এটা হচ্ছে আপনাদের  ভালবাসা ও সহযোগিতার  ফল।
পৃথিবীতে ভালবাসা খুবই  দুর্মূল্য। আমি কতজনকে ভালবাসতে পেরেছি জানিনা কিন্তু যে পরিমাণ  ভালবাসা সকলের  কাছ থেকে পেয়েছি  তার  জন্য  আমি ভগবানের  কাছে অশেষ  কৃতজ্ঞ। অজয় ভাই ও লালুবাবু  ছুটে এসেছেন  সমস্ত  কাজ ফেলে যদি রক্ত লাগে তবে তাঁরা দেবেন।  সুদীপ্ত ছুটে এসেছে যদি কোন ডকুমেন্টের দরকার  হয়। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ  তাদের  শুভেচ্ছার জন্য । ভগবান  সকলের  মঙ্গল  করুন। 

Saturday, 8 May 2021

কবি ও অ-কবি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুরের  জন্মদিন। অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষের  সমাগম। সবাই  এসেছেন  কবিকে একবার  চোখের  দেখা দেখতে। উনি যে সবার  প্রিয়। বেশীর ভাগ মানুষ  এসেছেন  কবিকে ভালবাসার জন্য আবার  কেউ কেউ  এসেছেন  স্ট্যাটাস  সিম্বল  বজায় রাখতে। এ যেন  পন্ডিত  রবিশঙ্কর  বা বিলায়েত খানের সেতার  শোনার জন্য সবচেয়ে দামী টিকিট কেটে হলে আসা। কমদামী টিকিট ওঁরা ভুলেও বসবেন না। ঝাঁ চকচকে জামা কাপড়, গয়নাগাঁটি লোককে দেখানোর এ এক অপূর্ব  সুযোগ। পিছনে কারা বসে? ওরা সঙ্গীত হয়তো একটু আধটু বোঝে কিন্তু রেস্তয় টান পড়ার ভয়ে তারা আসে শুধু সঙ্গীত শুনতেই আসে। ওরা কি বুঝবে এইসব দামী গয়নাগাঁটির  কদর। ঐখানে বসব, নৈব নৈব চ। সুতরাং অমুক  দাদা,তমুক ভাইকে ধরে একেবারে সামনের  সারির  টিকিট  চাই। বাজাতে বাজাতে পন্ডিতজীর  বা ওস্তাদজীর একবার  চোখ যদি পড়ে তাহলে জীবনটাই ধন্য হয়ে গেল।  আর যদি বা একটা অটোগ্রাফ  নেওয়া  যায় তাহলে তো তিন চার  পুরুষের  স্মৃতি রোমন্থন  চলতে থাকবে। যাক এসব কথা। এবার  আসল প্রসঙ্গে  আসা যাক। 

অনেক রথী মহারথীর  মাঝে একটা অবাঞ্ছিত  লোককে দেখে সবার  ভ্রূকুঞ্চন  শুরু হয়ে  গেল। ইতিউতি  ফিসফাস থেকে একটা চাপা গুঞ্জন  ছড়িয়ে পড়ল। একজন হোমরাচোমরা গোছের  উদ্যোক্তা তাকে এসে চেপে ধরে জিজ্ঞেস  করল," অ্যাই, তুইই  গুরুদেবের  কলমটা  চুরি করেছিলি  না? " আজ্ঞে হ্যাঁ। "হতভাগা, গুরুদেবের  কলম চুরি করে তুইই  আবার এই সুন্দর  অনুষ্ঠানে এসেছিস? চিনতে পারছিস  আমাকে? আমিই তোকে জেলে চালান  করেছিলাম।  হুঁ, হুঁ আমিই সেই  কোর্ট ইন্সপেক্টর  শরত  ঘোষ। আমার  চোখকে ফাঁকি? স্বর্গ, মর্ত্ত,  পাতাল যেখানেই থাকো না কেন  ঠিইক  খুঁজে  বের করব। এখন  এখান থেকে দূর হ ,ব্যাটা চোর কোথাকার। "  শরত বাবুর  গলার  আওয়াজ  নেহাতই  কম নয়। চেঁচামেচির  আওয়াজ গুরুদেবের  কানে পৌঁছেছে। উনি শশব্যস্ত  হয়ে সশরীরে উপস্থিত।  আহা হা, ছেড়ে দিন  বেচারিকে। কিন্তু শরতবাবু ইতিমধ্যেই  গদাম করে একটা কিল বসিয়ে দিয়েছেন  তার  পিঠে। বেচারার  নিঃশ্বাস  প্রায় বন্ধ হবার  জোগাড়। ইতিমধ্যেই  অ্যাডভোকেট  সৌরীনবাবু  মানে সৌরীন্দ্রমোহন  মুখোপাধ্যায়ের  আগমন। তিনি কোনমতে চোরকে শরতবাবুর হাত থেকে উদ্ধার  করে সস্নেহে  জিজ্ঞেস  করলেন, বাপু তুমি গুরুদেবের  কলমটি কেন চুরি করলে? উত্তরে চোর যা বলল তাতে  অনেকেই  বিস্মিত  হয়ে গেল। চোর  জানালো যে সে ভাবত যে গুরুদেবের  অত সুন্দর সুন্দর  লেখা ঐ কলমের  জন্যই  হয়। এত সুন্দর সুন্দর  কবিতা লেখেন তিনি যে তার সর্বদাই  মনে হতো গুরুদেবের  ছান্দিক জীবনের  পিছনের ঐ কলম। তার  নিজের  জীবন  কখনোই  পদ্য হয়ে উঠতে পারেনি এবং সদাই গদ্যময়। সে যে একেবারেই  গোমূর্খ তা নয় কিন্তু কবিতার  ছন্দ  কেন  যেন  আসেনা তার  কলমে। সুতরাং সে কখনোই  কবি হতে পারেনি, অ-কবিই থেকে গেছে। ঝলমলে ডগ শোয়ের  মাঝে নেড়ি  কুত্তার  যে অবস্থা হয় কবিকূলের  মাঝে অ-কবির সেই অবস্থাই হলো। চোখের  জলে টলটল করছে এহেন  অবস্থায় সে সভাত্যাগ  করল আর অন্যান্য  বহু গুণীজনের চোখে জল সিঞ্চিত  করে গেল।

Sunday, 11 April 2021

তুই, তুমি,আপনি

শমীক দা ছিলেন  রীতিমত  প্রেমিক মানুষ।  যেমন  দেখতে, তেমনই  পয়সাওয়ালা। প্রায়শই  লোকে তাঁকে প্রদীপ কুমার  বলেন ভাবতো। লাল টুকটুকে চেহারা আর পরতেন নিপাট করা ফিনফিনে ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি। ঐ হোস্টেলেই থাকা একজন অঙ্কের প্রফেসর তাঁর মাস মাইনের বেশিরভাগ  টাকাটাই  সংসার খরচা বাবদ মানি অর্ডার করে দিয়ে কোনরকমে নিজের  পিছনে খরচ করতেন। শমীক দা প্রথমে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়ে অঙ্কের ক্লাসে ঐ স্যারকে দেখে এমন কিছু মন্তব্য  করেছিলেন  যাতে তাঁর চামচা  কিছু ছেলেমেয়ে  খুব উল্লসিত  হলেও বেশ কিছু পড়াশোনা করতে আসা ছেলেদের চাপে তাঁকে গুটিয়ে যেতে হয়েছিল  কারণ  সময়টা ছিল  ষাটের  দশকের শেষ ভাগ। স্যার কিন্তু কোন কথা বলেন নি যদিও  মনে মনে খুবই  কষ্ট পেয়েছিলেন।  তখনকার  দিনে স্যারদের  সামনে সিগারেট  খাওয়ার   কথা কেউ ভাবতেও  পারতো না। কিন্তু বড়লোকের  আদরে বাঁদর হয়ে যাওয়া শমীক দা স্যারের  পাশ দিয়ে যাওয়ার  সময় স্যারের  মুখের  ওপরই  ধোঁয়া ছেড়ে দিতেন। স্যার  কিছুই  বলতেন না।একদিন  ঐ ক্লাসের ই একটি  মেয়ে রেখা সরাসরি শমীক দাকে চার্জ করল।" কি ভেবেছেন বলুন তো? অনেকদিন  ধরেই  দেখছি  আপনি স্যারকে সবসময়  অপমান  করার  চেষ্টা করেন কিন্তু উনি আপনাকে কিছুই  বলেন না। কিন্তু  তার মানে এই নয় যে উনি অপমানিত  হন না। আপনার  অনেক  টাকা থাকতে পারে কিন্তু আপনি ওঁর নখের ও যোগ্য  নন।" স্যার  কিছু না বললেও  মনে মনে খুব  খুশী হয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই সব ছেলেগুলোও যারা রেখার একটু ঘনিষ্ঠ  হবার  চেষ্টা করতো কিন্তু শমীক দার পয়সায়  খাওয়া কিছু ছেলেদের জন্য  কাছে ঘেঁষতেও  সাহস করতো না।

শমীক দার সঙ্গে রেখার একটু কাছাকাছি আসার সম্ভাবনাটা  প্রায় এটাতেই শেষ। তখনকার  প্রেম  নিবেদন  একটা কিরকম যেন  ছিল। একটা ফিসফিসানি চুপিচুপি  কথা একান  সেকান  হতে হতে পাত্র এবং পাত্রীর  কানে পৌঁছে যেত, তারপর সেটা  টিকবে কি টিকবে না নির্ভর করতো পরিস্থিতির  উপর। যদি পাত্র শাঁসালো  হতো মানে বাবার  প্রচুর টাকা, বাড়ি গাড়ি জমিজমা  আছে তাহলে আপত্তির  তো কোন কারণ ই নেই। কত সুন্দরী মেয়েরা কতছেলেদের  বুক ভাসিয়ে চলে গেছে তার ইয়ত্তা  নেই। এইরকম ই এক ফিসফিসানি  রেখার কানে পৌঁছেছিল  কিন্তু ও ছিল  এক অন্যধাতের  মেয়ে।  ঐরকম  মাকাল  ফলকে  ও কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং সুযোগের  অপেক্ষায় থাকা রেখা  এর পুরোপুরি  সদ্ব্যবহার  করল এবং ফল যা হবার  তাই হলো। শমীক  দার আপনি থেকে তুমিতে  আসা আর হয়ে উঠল না। হঠাৎই  একদিন  দেখি একটা অ্যাম্বাসডার  গাড়ি এসে থামল  হোস্টেলের সামনে। এক সুপুরুষ ভদ্রলোক  নামলেন  গাড়ি থেকে এবং সরাসরি চলে গেলেন  স্যারের  ঘরের  দিকে। দেখি স্যারের  হাত  ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু যেন বলছেন  আর স্যার  মাথা নাড়িয়ে একটু করুণ করুণ মুখে কিছু  বলছেন  যে না না কিছুই  হয়নি।
তখন একই  ক্লাসে পড়া ছেলেমেয়েরাও  আপনি আপনি করেই কথা  বলতো এবং বেশ  কিছুদিন  যাবার পর  আপনি থেকে তুমি বা তুই সম্বোধনে  আসত সম্পর্কের  গভীরতার  উপর। দুটো ছেলের মধ্যে সম্বোধন একধাপ বা দুই ধাপ নামতো। এখানে ধাপটা  এইরকম।  আপনি (এক), তুমি(দুই) এবং তুই( তিন)। কিন্তু একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের সম্বোধন  এক থেকে তিনে নামলেও এক থেকে দুইয়ে  নামলেই ছেলেমেয়েদের  মধ্য  গুঞ্জন  শুরু হয়ে যেত। জানিস ,বলেই ফিসফিসানি শুরু হতো। কিন্তু সময়ের  সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা আজকাল  অনেক সহজভাবেই  মিশতে শুরু করেছে এবং তিন থেকে দুই বা এক যাবার  প্রশ্নই  নেই। বন্ধুত্বের পরিণতি  যদি বিয়ে অবধিও  গড়ায় তাহলেও তুই থেকে তুমি সম্বোধনে আসেনা। বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে শ্রুতিশক্তি কম হবার  উপকারিতাটা  বোঝা যায় কারণ  কানে আর খটকা লাগেনা।

Saturday, 10 April 2021

বিশ্বাসঘাতক

বেজে উঠেছে ভোটের  দামামা। চারিদিকে সাজ সাজ  রব। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। নেতারা রয়েছেন  নিজেদের  জায়গায়। দল বলে একটা বস্তু আছে কিন্তু ওটা একটা ছাতার মতন। আমরা সবাই  রাজা নিজেদের  রাজ্যে, রয়েছে  আমাদের  নিজস্ব  বাহিনী। প্রয়োজন  মতো তাদের  ব্যবহার  হয় কেউ ট্যাঁ ফো করলে কিন্তু বেকায়দায় পড়লেই ঢুকে পড় সেই ছাতার  তলায়। ছাতার  মালিক  তাদেরই  সেখানে আশ্রয় দেয় যাদের  নজরানা বেশ  পছন্দ মাফিক  হয়। নাহলে নিজের  হ্যাপা নিজেই সামলাও। অনেকটাই  সেই আগের  দিনের  রাজা, সামন্ত ও জমিদারের  মতো। আমরা যারা শান্তিপ্রিয়  নাগরিক, তাদের  হয়েছে  জ্বালা। না পারি এদের  বিরুদ্ধাচরণ  করতে, না পারি মন থেকে মেনে নিতে। সুতরাং গুমরে গুমরে মর।
ভোট আসে, ভোট যায় কিন্তু আমরা যে তিমিরে  সেই তিমিরে। দিনদিন  বয়স জনিত কারণে শরীর অশক্ত হচ্ছে , দৃষ্টিশক্তি  ক্ষীণ  হয়ে আসছে আর হয়ে পড়ছি পরের উপর নির্ভরশীল। মনটা এখনও  সচল থাকাতে ভাবি যে আর নয়, এবার  রুখে দাঁড়ানোর  পালা। পরিচিত  ব্যক্তিরা ভোটের  স্লিপ দিতে আসেন এবং যথারীতি মুখে একগাল হাসি নিয়ে কেউ বাঁদিকে আবার কেউ  ডানদিকে মাথা হেলিয়ে চোখের  ভাষায় জিজ্ঞেস করেন  ভাল তো? আরও  একটা অনুচ্চারিত  অনুরোধ  একটু দেখবেন।  এই মানুষটিকে  কিছুতেই  ফেলা যায়না। বিপদে আপদে  এই বর্ষীয়ান  মানুষটিই  আপনার  পাশে এসে দাঁড়ান। কোন কোন সময় মনে হয়, এইসমস্ত  ভাল মানুষগুলো কেন একটা নিজেদের  দল করেন না যাঁরা আমাদের  মতন সাধারণ  মানুষের  পাশে সবসময়ই  থাকবেন। হয়তো সবটাই  অলীক কল্পনা। সেইকারণে ভোট  দিতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত  হয়ে যাই। কাকে ভোট  দেব? নিজের  বিবেক অনুযায়ী না পাশেথাকা  সেই  ভাল মানুষটির  দলকে যার পরিবর্তন  চাইছিলাম? শেষমেশ নিজের  বিবেকের  সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বার্থান্বেষী হয়ে সেই  ভাল মানুষের  দলকে যারা বছরের পর বছর  সাধারণ  জনগণের  সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। কে বিশ্বাসঘাতক? আমি না সেই  দল?

ভাইজাগের ডাইরি : সিরকা 1988



সবেমাত্র বদলি হয়ে এসেছি বিশাখাপত্তনমে। সঙ্গে মা, স্ত্রী ও ছেলে। ভাষা একেবারেই অন্যরকম।আমাদের বাংলা বা ইংরেজি বা হিন্দিরসঙ্গে কোন মিল এইমুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছিনা। সুতরাং আকারে, ইঙ্গিতে যতটা বোঝানো যায় আরকি। সন্ধ্যে বেলায় অফিস থেকে ফিরে একটু জায়গাটা দেখতে বেড়িয়েছি। অবশ্যই বাড়ির আশে পাশে কারণ বেশিদূর গেলে বাড়ি ফিরতে অসুবিধে হতে পারে এই ভেবেই কাছাকাছি থাকাই শ্রেয় ভেবেছি। বাড়ির পাশেই ছোট ছোটসাইকেল ভ্যানে সুন্দর বাজার বসেছে অনেক। ছোট ছোট এল ই ডি বালবের আলোয় চত্ত্বরটা খুবসুন্দর হয়ে উঠেছে। স্বপনের বাড়িটা প্রায় একদম মোড়ের মাথায়। ডান পাশে রবিদের বাড়ি আর বাঁ পাশে প্রসাদের বাড়ি আর পিছনেই মধুসূদনের বাড়ি। রবিদের বাড়ির পাশ দিয়েই একটা গলির মত রাস্তা চলে গেছে যেখানে থাকেন কানাড়া আম্মা। উনি আবার বাঙালিদের খুবই ভালবাসেন এবং মান্না দে ওঁর খুব প্রিয় শিল্পী।

Tuesday, 16 March 2021

"ও রাজা তোর কাপড় কোথায়---- কিছু ধেয়ে আসা প্রশ্নের উত্তর "

অনেকেই  আজকাল  কিছু প্রশ্ন করেই সমস্যা তুলে ধরেন কিন্তু তার  সমাধানের কোন সুরাহা না দিয়েই। অবশ্য প্রশ্ন  করা খুব সহজ ব্যাপার  নয় এবং যথেষ্ট  বুকের  পাটা  না থাকলে  তো একেবারেই  নয়। আর উত্তর,  সেটা তো অন্যলোকের  কাজ। মাথা খুঁড়ে মর এবার। 
একটা প্রশ্ন  উঠে এসেছে  যে প্রাক  দুহাজার  চৌদ্দ সালে যে ব্যাঙ্ক গুলো লক্ষাধিক  কোটি লাভ করছিল তারা হঠাৎই  আজ ধুঁকছে  কেন এবং তাদের  বাঁচাতে  কেন সরকারকে লক্ষ লক্ষ  কোটি টাকা মূলধনে  ঢালতে হলো? এই প্রশ্ন  জাগাটা খুবই  স্বাভাবিক এবং তার  উত্তরটাও  প্রায় সকলেই  জানেন।  কিন্তু  এর পিছনের  ঘটনা অনেকেই  জেনেও  না জানার  ভান করেন। দীর্ঘদিন ধরেই  ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ  অনাদায়ী  ঋণের বাস্তব  অবস্থা যেকোন  ভাবেই  হোক  না কেন  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নজরে আনেন  নি বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দেখেও দেখেননি।  কিন্তু যখন  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের  গভর্নর  স্বয়ং রঘুরাম  রাজন সংসদে জানালেন  যে বিপুল পরিমাণ  অনাদায়ী  ঋণ বাণিজ্যিক  ব্যাঙ্কগুলি তাঁদের  নজরে  আনেননি তখন  রীতিমত  হৈচৈ  পড়ে যায়। তিনি আরও জানান  যে এই ঋণের  বেশিরভাগ টাই দুহাজার  ছয় থেকে  দুহাজার আট সালের। নিয়মানুযায়ী  প্রত্যেক  ঋণের জন্যই প্রভিশনিং করতে  হয় এবং যতক্ষণ অনাদায়ী  ঋণের শত প্রতিশত প্রভিশনিং না করা হচ্ছে ততক্ষণ  লোনকে  রাইট অফ করা যায়না। এমন ও হতে পারে যে লোন দেবার  কিছুদিন  পরেই  বোঝা গেল  যে লোনটা পরিশোধ  করতে  পারবেনা তখন  পুরো লোনের  টাকাটাই প্রভিশনিং  করতে হয় যার অর্থ  সরাসরি লাভ কমে যাওয়া ।সুতরাং, যে ব্যাঙ্ক গুলো এতদিন  লাভ  দেখিয়ে এসেছে  তারা আসলে  লোকসানে  ছিল  এবং অনাদায়ী  ঋণ না দেখানোয় তারা লাভ  দেখিয়েছে। এরপর  দুহাজার চৌদ্দ  সালে  জুন মাসে সরকারকে সেন্ট্রাল রিপোজিটরি  অব্  ইনফরমেশন  অন লার্জ ক্রেডিটস  গঠন করতে হয় যাতে  ভবিষ্যতে এই ধরণের  ঘটনার  পুনরাবৃত্তি না হয়।
সরকারি মালিকানাধীন এবং বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের  মধ্যে পার্থক্য  এখানেই  যে যেখানে  সরকারের  শেয়ার  একান্ন  শতাংশের  বেশি সেটা সরকারি  ব্যাঙ্ক  আর অন্যথায় বেসরকারী  মালিকানাধীন। যে কোন ব্যবসার মূল লক্ষ্য যে সংস্থা  যাতে লাভ করে এবং শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশ বেশি  দিতে পারে। ব্যাঙ্ক  যখন  সরকারের  অধীনে আনা হয় তখন  মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল  যে এই ব্যাঙ্ক গুলো লাভ করবে এবং সেই লাভ  জনগণের  উদ্দেশ্যে ব্যবহার  করা হবে। কিন্তু  সরকারকে  যদি জনগণের  ট্যাক্সের  টাকা থেকে ব্যাঙ্কের  পুনরুজ্জীবনের  জন্য ব্যবহার  করতে হয় তাহলে  তো মূল উদ্দেশ্য ই ব্যর্থ হয়। এই কথাটা মনে রাখতে হবে সরকারি ব্যাঙ্ক বলেই সেটা যেমন  ইচ্ছা চলবে তা হয়না। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে সরকারি প্রকল্প ও যেমন বাস্তবায়িত  করতে হবে তেমনই সেই  ঋণ শোধ  করার  ব্যবস্থাও করতে হবে  যেটা একটা দুরূহ কাজ। কারণ  রাজনৈতিক  নেতাদের  চাপে অনেক  ঋণ দিতে হয় আবার  এই নেতারা ই ঋণগ্রহীতাদের  ঋণ পরিশোধ  না করার  জন্য উদ্বুদ্ধ  করেন।  এটা অনেকটাই  চোরকে  চুরি করতে  বলা আর গৃহস্থকে  সজাগ থাকতে বলা। এঁদের  চরিত্র  বদলানো শিবের  বাবার  অসাধ্য। তবে সবাইকে  এই দলে ফেলা যায়না। এখনও  অনেক  রাজনীতিবিদ  রয়েছেন  যাঁরা প্রকৃত ই সৎ কিন্তু তাঁরা আজ বিরল প্রজাতির।  এই ধরণের  চাপ বেসরকারি ব্যাঙ্কের  উপর চাপানো যায়না বলে তাদের লাভ  বা মুনাফা অনেক  বেশি এবং অনেক  বেশি লভ্যাংশ তাদের বিনিয়োগকারীদের তাঁরা দিতে পারেন যার নীট  ফল আরও  বেশিসংখ্যক বিনিয়োগকারী  আকৃষ্ট হন  এবং শেয়ারের  মূল্য ও চরচরিয়ে বেড়ে যায়। আর এই কারণেই  এইচ ডি এফ সি  ব্যাঙ্কের  ব্যালান্স  সিট এবং ব্রাঞ্চের সংখ্যা স্টেট ব্যাঙ্কের এক চতুর্থাংশ হলেও মার্কেট  ক্যাপিটালিজেশন  স্টেট ব্যাঙ্কের প্রায় দ্বিগুণ এবং আমাদের  দেশের  এক নম্বর  ব্যাঙ্ক। খুব সহজেই  যদি উত্তর  খুঁজতে  হয় তাহলে বলা যায় যে ঐ ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্কের  চেয়ে বেশি যোগ্য।  কিন্তু এই উত্তরটা এত সহজ নয়। স্টেট ব্যাঙ্ক  করে আমজনতার  ব্যাঙ্কিং আর তারা করে বিশেষ শ্রেণীর  ব্যাঙ্কিং। সরকারের  যাবতীয় প্রকল্পের  রূপায়ণ স্টেট ব্যাঙ্কের  এবং অন্যান্য  সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের  মাধ্যমে হয় যেটা বেসরকারী  ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য  নয়। সুতরাং তারা যেখানে বেশি লাভ  হবে সেখানেই ঋণ দেবে এবং সেটা যাতে পরিশোধ  হয় তার ও ব্যবস্থা করে। প্রত্যন্ত  গ্রামে তাদের  উপস্থিতি খুবই নগণ্য। তাহলে আমজনতাকে  পরিষেবা কে দেবে-- সেই  সরকারি  ব্যাঙ্ক। সুতরাং দুজনের খেলার  জমি এক নয় এবং তুলনা করাটা সামগ্রিক ভাবে একটু অবিচার ই হবে সরকারি ব্যাঙ্কের  প্রতি। 

এবার  আসা যাক  সুদের হার  কমে যাওয়ার  ব্যাপারে।সুদের  হার  কমে গেলে  যাঁরা ব্যাঙ্কের  সুদের  উপর নির্ভরশীল তাঁদের  সংসার  চালানো ভীষণ কষ্টসাধ্য  হয়ে পড়ে। অথচ, দিনদিন জিনিস পত্রের  দাম  হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে।বৃদ্ধ বয়সে মানুষের খাবার  খরচ কমে যায় কিন্তু ওষুধের খরচ বহুদিন বৃদ্ধি পায়। তাহলে উপায় কি? নোট ছাপিয়ে সমস্যার কোন সমাধান  হবেনা। সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি  হবে। ব্যাঙ্ক কে আগের  মতন সুদ দিতে গেলে ঋণে অন্তত চার শতাংশ সুদ বেশি নিতে হবে । আর তা না হলে তাকে ব্যবসা গোটাতে হবে। কর্মীদের বেতন ও ভাতা, বিদ্যুতের  খরচ এবং অন্যান্য  খরচ মিটিয়ে লাভ  করতে হলে ব্যাঙ্ক  কে প্রায় তের  বা চৌদ্দ  শতাংশ  সুদ পেতেই  হবে। প্রায়রিটি সেক্টরে  কমপক্ষে মোট ঋণের  চল্লিশ  শতাংশ  হতে হবে। মোট ঋণের  এক শতাংশ  অতি দরিদ্র মানুষের  জন্য দিতে হবে চার শতাংশ  সুদে। এদিকে ব্যাঙ্কের মোট ঋণ মোটামুটিভাবে  সমস্ত জমারাশির  ষাট শতাংশ  অতিক্রম  করবে না। এছাড়াও  ব্যাঙ্ক কে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের  কাছে কিছু টাকা স্ট্যাটুটরি  লিকুইডিটি রেডিও, ক্যাশ রিজার্ভ  রেসিও  বাবদ রাখতে হয়। সামান্য  একটা উদাহরণ দিলে জিনিস টা একটু পরিষ্কার  হবে। যদি মোট  ঋণ ষাট  টাকা হয় তবে প্রায়রিটি  সেক্টরে কম সে কম চব্বিশ টাকা দিতে হবে এবং ষাট  পয়সা  ডি আই আর লোন দিতে হবে আর বাকি পঁয়ত্রিশ টাকা চল্লিশ  পয়সা কমার্শিয়াল ও ইনস্টিটিউশনাল  লোন বাবদ দিতে হবে যেখানে বেশি হারে সুদ পাবে ব্যাঙ্ক।  কিন্তু  আন্তর্জাতিক  বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কস্ট অব ক্যাপিটাল কম হতেই  হবে। এছাড়াও  বিদেশ  থেকে অনেক কম সুদে লোন পাওয়ার সুযোগ  থাকার জন্য বড় শিল্পপতিরা  বিদেশ  থেকে লোন নেবে এবং সেক্ষেত্রে আমাদের  দেশীয় ব্যাঙ্কগুলো আরও  ধুঁকতে থাকবে। যদি বড় শিল্পপতিরা লোন না নেন তাহলে উৎপাদন  ব্যাহত হবে এবং বেকারের  সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে সুদের  হার  কমাতেই  হবে। আর এইখানেই  অর্থনীতিবিদদের  অনেক জটিল  গণনা করতে হয়। আমরা এই জটিল  গণনা না বুঝলেও কিছুটা আন্দাজ  করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু যদি বোঝার  চেষ্টাই  না করি তাহলে সব আলোচনাই  বৃথা। এছাড়াও ঐ  সময়  মুদ্রাস্ফীতির হার  ছিল  অনেক  বেশি যেমন  আট সালে 8.35, নয় সালে 10.88,দশ সালে 11.99,এগারোয় 8.86,বারোয়9.31, তেরোয় 10.91, আর চৌদ্দ  সালে 6.35. বাস্তবিক  ক্ষেত্রে আমরা ঐ সময় ঋণাত্মক  সুদের হার  পেয়েছি। কিন্তু এটা অত্যন্ত  সত্যি কথা যে সংসার  চালাতে সবাই  হিমসিম  খাচ্ছে। এটাও খুব  সত্যি যে মধ্যবিত্তরা  চারদিক  থেকে মার খাচ্ছে। নেতাদের  চোখ ছলছল করে ওঠে গরীবদের  কথা ভেবে। যতরকম  ভাবে পার তাদের  সাবসিডি দেবার  কথা ভাবো আর তার  থেকে খানিকটা নিজেদের  পকেটে না গেলে ভাবব কেন?  যত্রতত্র  দান, গরীবদের  নামে প্রকল্প  চালু করে নিজেদের  পকেট ভরাতে না পারলে আমাদের  দেখবে কে? সাবসিডি  দিয়ে লোকদের  অথর্ব  না করে যাতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে সেই প্রচেষ্টা  কেউ  করতে চায়না কারণ  তখন  ঐ লোকজনেরা নেতাদের  পাশে ভিড় করবেনা। 

একটা কথা মনে রাখা দরকার  যে অলাভজনক  সরকারি সংস্থা বেসরকারী  হাতে গেলে ক্ষতি কিসের? দিনের পর দিন  সাধারণ  ট্যাক্সদাতাদের  টাকায় কিছু লোক মৌরসিপাট্টা করে আয়েস  করে বসে বসে খাবে আর এই ট্যাক্সদাতারা নির্বাক দর্শক  হয়ে থাকবে এটা চলতে পারেনা। যদি কাজ করতে ইচ্ছা না করে তবে সরে দাঁড়াও, বহুলোক  কাজের প্রতীক্ষায় রয়েছে। বেসরকারী শিল্পপতিরা নিষ্ক্রিয়তাকে  বরদাস্ত  করবেনা। আরও  একটা কথা জানার আছে যে কোন উন্নত দেশে সরকারের  কাজ রেগুলেটরের।  ব্যবসা চালানো সরকারের  কাজ  নয়। কমিউনিস্ট  দেশ চীন  তার  ষাট শতাংশ  সরকারি মালিকানাধীন উদ্যোগ বেসরকারী উদ্যোগপতিদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং ফল স্বরূপ  আজ চীন  পৃথিবীর  এক অন্যতম  শক্তিধর দেশ।  সমস্ত  পৃথিবীর  মানচিত্র  থেকে কমিউনিজম  আজ বিলুপ্ত প্রায়। একমাত্র  দেশ  চীন , তারাও  আজ রিফর্মের  পথে হাঁটছে  আর আমাদের  দেশের  নব্য কমরেডরা এখনও  পুরানো ধারণাতেই নিমজ্জিত। 

কর্পোরেট  ট্যাক্স কম করাতেই কয়েকজন  শিল্পপতির  সম্পদ আড়াই আড়াইশো  শতাংশ বেড়েছে এই ধারণাটা  আদ্যোপান্ত  ভুল। শেয়ার  মার্কেট  সম্বন্ধে যাঁদের  বিন্দুমাত্র  ধারণা আছে  তাঁরা জানেন  যে বাজারে তাঁদের  উপর ভরসা না থাকলে তাঁদের শেয়ারের  দাম  কখনোই বাড়বেনা  আর সেই কারণেই  এইচ ডি এফ সি ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্কের  থেকে অনেক ছোট  হলেও  তারাই  আজ ভারতবর্ষের  বৃহত্তম  ব্যাঙ্ক ( মার্কেট ক্যাপিটালিজেশন  হিসাবে)। 

এখন ভাবার  সময় আমরা শক্তিশালী  উন্নত  দেশ হবো না উন্নতিশীল দেশ হিসাবে ভিক্ষার  পাত্র নিয়ে উন্নত দেশের  মুখাপেক্ষী থাকব।

Sunday, 24 January 2021

খ্যাপামি সংকলন

ক্ষ্যাপা নানা ধরণের হয় এবং তাদের খ্যাপামিও। মাঝে মাঝে যখন ঐ কথাগুলো মনে পড়ে তখন নিজের মনেই হাসি আসে কিন্তু একটা কথা আছে না, যে আনন্দ সবসময় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় কিন্তু দুঃখটা অন্তরেই চেপে রাখা ভাল। এবার আসা যাক এক এক করে সেই ক্ষ্যাপা খেপির উপাখ্যান।
 প্রথমেই আসি সুরোধনি মাসির কথায়। মাসি লোকের বাড়িতে ফাই ফরমাশ খেটে দিন গুজরান করতো। বেচারার ছিল অস্টিও আর্থ্রাইটিস কিন্তু চেহারাটা ছিল বেশ ভারিক্কি এবং সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটাও। কিন্তু কারো সাতে পাঁচে থাকত না বেচারা তবুও ছেলে ছোকরারা তার পিছনে পড়ত তার হেলে দুলে চলার কারণে। তাতে ওর কি দোষ- কিছুই না। ওটাতো ওর পায়ের অসুখের জন্য। যেহেতু ও হেলে দুলে চলতো ছেলেরা ওকে বলতো হেলকা ভারী। মাসি কানে একটু কম শুনতে বলে তবু খানিকটা রক্ষা কিন্তু যেই মাত্র ও বুঝতে পারত যে ওকে ঐ বলে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে তখনই শুরু, হতো অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। ইঁটক্যাল( ইঁট+পাটকেল) দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব। তাতেও ওর আশ মিটত না ,গজগজ করতে করতে নিঃসৃত হতো ক্ষুরধার সব গালাগালি যা লেখা যায়না। আর যত তার তোড়জোড় ততটাই মজাদার হতো চ্যাঙড়া ছেলেগুলোর কাছে। একদিন মায়ের কাছে কেঁদে কেটে একসা," বৌদি, ছোটনকে একটু বলে ঐ বদমাইশ ছেলেগুলোকে কড়কে দিতে বল না গো।"  তা যাই হোক, বললেই কি শোনে, তবুও খানিকটা কমলো কিন্তু চ্যাংরাগুলোর আনন্দ একেবারে বন্ধ হলো মাসীর ইহজগত ছেড়ে চলে যাওয়ায়।

আরও একজনের কথায় এবার আসা যাক। ভজন কাকার বয়স কিছুতেই বাড়তে চায়না মেয়েদের মতন। কি কাকা, কত বয়স হলো? ঐ হবে পঞ্চাশ বাহান্ন। আঁতকে ওঠার মতন অবস্থা। চোখে ভাল দেখেনা, কানে ভাল শোনে না, গাল গেছে ভেঙ্গে তবুও চুলে কলপ লাগানো চাই বয়সকে ধরে রাখতে। ওঁকে দাদু বললেও খুব একটা ভুল হয়না। কিন্তু উনি শুনতে চান দাদা। দাদা বললে খুব খুশি, বলবে চল চা খেয়ে আসি। কাকা শুনলে মোটামুটি নিমরাজি কিন্তু দাদু ডাকলেই শুরু হবে অনর্গল গালাগালি। দাদু বলবি কেন রে, তোরা কি পঞ্চাশ বছরের লোককে দাদু বলিস? কি যে মানসিকতা কে জানে? এই ভজন কাকার জন্য একদিন প্রচণ্ড উত্তম মধ্যম জুটেছিল ভাগ্যে। সেদিনছিল মহানবমী। সন্ধ্যে বেলায় পাড়ার ছেলেরা বিভিন্ন গ্রুপে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তাদেরই কেউ একজন  ভজন কাকার থুতনিতে হাত দিয়ে দাদু বলে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে পাড়ার দুর্গাপূজায় নবমীর দিন দরিদ্র নর নারায়ণ সেবা হতো এবং ধুনুচি নাচের কম্পিটিশন হতো। সুতরাং, হঠাৎ করে ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আমাদের পক্ষেসহজ ছিলনা। এরই ফাঁকে একটু আশ পাশের ঠাকুর দেখবো বলে আরও দুজনকে নিয়েবেরিয়েছি। ভজন কাকাকে কেউ যে ঐ ভাবে হেনস্থা করেগেছে সে সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ ধারণাও ছিলনা। হঠাৎই কাকা আমার দিকে তেড়ে এলো আর গালাগালি দিয়ে শুরু করে একটা আধলা ইঁট হাতে ধরে আমার মাথা ফাটাবে বলে। কোন কিছু না বুঝেই কাকার ঐ রণমূর্তি দেখে আমার রিফ্লেক্স কাজে লাগিয়ে পিছন দিক থেকে জাপটে ধরলাম আর কাকা আমার হাতে ইঁট দিয়ে মেরে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। রক্ত ঝরছে কিন্তু আমি ছাড়ছি না। ছেড়ে দিলেই উনি আমার মাথা নির্ঘাত ফাটিয়ে দিতেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমার দুই সহযোগী তাঁর হাত থেকে ইঁট ছাড়িয়ে নিয়েছে আর আমিও দে দৌড়। একটা ডিসপেনসারি তে গিয়ে হাতে ওষুধ লাগিয়ে ইনজেকশন নিয়ে মণ্ডপে ফিরে এসেছি। এর কিছুক্ষণ পরে আমার বাবা আসছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে এবং শুনলেন একতরফা কথা আর লজ্জায় মাথা নীচু করে চলে এলেন। বাড়ি এসেই আমার খোঁজ করে জানতে পারলেন যে আমি মণ্ডপে আছি। অন্য ছেলেরা আমাকে বলল যে বাবা আমাকে খুঁজছেন এবং পালানোর জন্য বলল কিন্তু আমি তো কোন দোষ করিনি সুতরাং পালানোর প্রশ্নই নেই। আমি বেরিয়ে আসামাত্রই বাবা আমাকে পেটাতে শুরু করলেন কিন্তু আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। মারের চোটে আমার গায়ে হাত পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। কাঁদতে গেলেও ব্যথালাগছে। সমস্ত লোক খাওয়া হয়ে গেলে পাড়ার লোকদের বসার কথা। কিন্তু আমার খাওয়ার মতন অবস্থা নেই। ইতিমধ্যে কারো কাছে বাবা জানতে পেরেছেন যে আসল ঘটনা কি। তখন বাবার কি অনুশোচনা। দাদা বলল,"বাবা তোকে ডাকছেন।" আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে আসলে তিনি বললেন," তুমি আমাকে আসল ঘটনা বলনি কেন?" আমি বললাম আপনি তো কিছু জিজ্ঞেস করেন নি, সেই কারণে ই কিছু বলিনি। সেটা আরও কষ্টদায়ক। যাই হোক, বাবার কাছে আমার ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ মার খাওয়া। উনি একটা কথা জেনে খুশি হয়েছিলেন যে হাজার কঠিন অবস্থাতেও আমি মিথ্যে কথা বলব না। আর ঐদিকে ভজন কাকাও পরে আসল ঘটনা জেনে খুবই অনুতপ্ত হয়েছিলেন। একদিন আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বললেন ," কিছু মনে করিস না রে ,আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম।" আমি কি আর বলব। পরে একটা সংস্কৃত শ্লোক পড়েছিলাম যেটা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজে লাগে। " ক্ষণে তুষ্ট, ক্ষণে রুষ্ট, রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে,
অব্যবস্থিত চিত্তস্য প্রসাদপি ভয়ঙ্কর।" হঠাৎ রেগে গিয়ে কিছু অঘটন ঘটিয়ে পরে তার জন্য পরিতাপ করার কোন মানে হয়না।
এক বিশেষ বন্ধুর কাছে শোনা আরও একটা ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ভদ্রলোকের মুখে এমন একটা জরুল ছিল যে কারণে তাঁকে খানিকটা বাঁদরের মতো লাগতো। কিছু বিচ্ছু ছেলে কাছে গিয়ে হুপ করে আওয়াজ করলেই নিঃসৃত হতো চোখা চোখা বাণরূপী গালিগালাজ। কোন কোন সময় তিনি ইঁট পাথরও ছুঁড়তেন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। ঐ দিকে পাথর ছোঁড়েন তো এদিক থেকে আওয়াজ আসে হুপ। কোনদিক সামলাবেন ভদ্রলোক? এরকম হাজারো খ্যাপামির কাহিনী লিপিবদ্ধ করা যায়। এর উপায় কি? কোন মনস্তত্ত্ববিদ না হয়েও এই কথাটা বলা যায় যে  এই ধরণর মন্তব্যকে উপেক্ষা করা । কজনকে পাথর ছুঁড়ে মারা যায়? আর দুর্ভাগ্যক্রমে যদি ঐ পাথর লেগে মারাত্মক কিছু ঘটে যায় তার দায় কিন্তু খুবসহজ নয়।
ভজন কাকা ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে কোথায় চলে গেলেন কেউ জানতেই পারলো না। হয়তো আমাকে মারার ঘটনায় উনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ওঁর বাড়ি  ভাড়ায় থাকার জন্য ওঁর চলে যেতে বিশেষ একটা অসুবিধে হয়নি কিন্তু আমাদের শহরে আর কোনদিন ভজন কাকাকে দেখতে পাইনি।

Wednesday, 13 January 2021

মকর সংক্রান্তি

আজকের এই সুন্দর দিনে মনে পড়ে অনেক কথা। পিঠে পুলির কথা মনে পড়লেই জিভে ও চোখে জল চলে আসে। মা, জেঠিমা দের ভোর বেলায় উঠে গঙ্গা স্নান করে এসেই শুরু হয়ে যেত পিঠে পুলির তোড়জোড়। একটা উৎসব উৎসব মেজাজ।কত রকমের পিঠে তাঁরা যে করতেন তার নামধাম মনে রাখা বেশ কঠিন কারণ বহুদিন এত রকমের পিঠে একসঙ্গে খাবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদ্ধ পিঠে, রস পিঠে, ভাজা পিঠে, পুলি পিঠে এবং তার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের পায়েস। ওঃ, জিভে জল আসবেনা আর এগুলো ভাবলে চোখে জল আসবে না? যাই হোক, এর মধ্যেই যতটা সম্ভব ততটা করতে হবে এবং বাকিটা মনে মনে ভেবে রাখতে হবে। মাসিমার করা মালপোয়া, আহা যেন অমৃত। একটু বোস বাবা, গরম গরম ভাজছি , একটু খেয়ে যা বাবা। কি আর্তি তাঁদের কথা বার্তায়, সেটাকে অগ্রাহ্য করা কারও সাধ্য নেই। হাজার পেট ভরা থাকলেও না খেয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিলনা। উঠোনের ঐ পাশে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে  ছোট্ট উনুনে কড়াইয়ে ঘি ঢেলে মাসিমা মালপোয়া ভেজেই রসে ডুবিয়ে এনে দিচ্ছেন আর এদিকে দাওয়ায় বসে একটার পর একটা মালপোয়া খেয়েই চলেছি। ভাবতেই অবাক লাগে যে কত খেতে পারতাম। মা, জেঠিমা, মাসিমা দের এত আনন্দের সঙ্গে লোককে খাওয়ানোর মধ্যে যে এত তৃপ্তি, সেটা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। আজ কেউ ভাল করে খেতেও পারেনা আর সেই আন্তরিকভাবে খাওয়ানো যেন উবে গেছে। এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও ক্যালরি মেপে খায়, মিষ্টি বেশিরভাগ বাচ্চা খেতেই চায়না। আর আমাদের সময় শেষে মিষ্টি না হলে মনে হতো কিছুই যেন খাইনি।
সন্ধ্যে বেলার কথা আগেই বলা হয়ে গেল। তাহলে সকালবেলায় কি হলো?  মা, জেঠিমা গঙ্গা স্নানের পর পূজোয় বসলো, তার পর শুরু হয়ে গেল পিঠে করার ধূম। চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে একটু নেড়ে নেওয়ার পর নারকেল কুঁড়ে নতুন গুড়ে পাক করে পিঠের মতন তৈরী করে জলে সেদ্ধ করে দিলেই হয়ে গেল সেদ্ধ পিঠে। গুড়ে পাক করা নারকেলের জায়গায় চাঁছি দিলে হবে অন্য রকমের স্বাদ। জলে সেদ্ধ করার জায়গায় ঘন দুধে মিষ্টি দিয়ে( সাধারণত নতুন গুড়ে) ফোটালে হয়ে যাবে পুলি পিঠে কিন্তু সেক্ষেত্রে  পিঠে গুলো হবে ছোট ছোট এবং তার পুর হবে চাঁছির। রস পিঠের জন্য হবে মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে পিঠের আকারে ঘিয়ে ভেজে আগে থেকে তৈরী করা ঘন রসে দিয়ে দেওয়া। তারপর খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে উঠিয়ে প্লেটে দেওয়া এবং তা মুখে দেওয়া মাত্র মিলিয়ে যাওয়া। সেটা নাহলে কিন্তু রস পিঠের মজা নেওয়া যাবেনা। আর ভাজা পিঠে, সেতো হবে মুগের ডালের। এক নাগাড়ে মিষ্টি খেতে খেতে মুখ মেরে গেলে, দুএকটা ঝাল ঝাল ভাজা মুগের ডালের পিঠে খেলে জমবে ব্যাপারটা আরও ভাল। রাতের খাওয়া যদি ভাজা পিঠে ও পুলি পিঠে এবং পায়েসের মাধ্যমে হয় তাহলে ক্ষতি কি?
এতো গেল বাংলার পৌষ সংক্রান্তি। আমেদাবাদ শহরে থাকাকালীন কিছু বাঙালি পরিবারের কাছাকাছি এসেছিলাম। বাঙালি পরিবার মানে পিঠে পুলি তো আছেই যদিও এত রকমের পিঠে করা সম্ভব নয় কিন্তু বাড়তি আনন্দ ঘুড়ি ওড়ানো। লাহিড়ি দার বাড়িতে দুপুর বেলার নেমন্তন্ন যদিও সকাল থেকেই উপস্থিত থাকতেই হবে। ওদের সনির্বন্ধ অনুরোধ যে সকাল সকাল স্নান সেরেই তাঁদের বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে। যাই হোক, পৌঁছতে একটু বেলা হয়ে যাওয়ায় ব্রেকফাস্ট টা এড়িয়ে যাওয়া গেল কিন্তু দুপুর বেলায় সেই আক্রমণ এড়ানো গেলনা। এরপর ওদের ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর পালা। বাপরে বাপ। আকাশটা যেন ছেয়ে গেছে ঘুড়িতে। রং বেরংয়ের ঘুড়ি। বাড়ির ছেলে মেয়েরাতো বটেই, বাবা মায়েরা পর্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো তে সামিল হয়েছে। একটা একটা ঘুড়ি কাটছে আর ল্যাতরাতে ল্যাতরাতে দূরে কোন ছাদে বা গাছে গিয়ে আটকাচ্ছে। আর কি উল্লাস। আমাদের বাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল একদম নিষেধ কারণ ন্যাড়া ছাদ। হুঁশ নাশা হয়ে ছুটতে ছুটতে কত ছেলে যে প্রাণ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সুতরাং প্রাক যৌবনের স্বাদ অস্তাচলে যাওয়া যৌবনে উপভোগ করা , অনেকটাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। আনাড়ির ঘুড়ি ওড়ানো খুব মুশকিল। কত রকমের মান্জা, কোনটা তেলতেলে আবার কোনটা ভাতের ফ্যানে কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী। সেটাতে নাকি টেনে খেলতে হয় আর তেলতেলে মাঞ্জাতে ঢিলে দিয়ে খেলতে হয়। কত রকমের জ্ঞান অর্জন করা এখনও বাকি কে জানে? সন্ধ্যে বেলায় সাবরমতীর তীরে নানান ধরনের ঘুড়ির প্রর্দশনী। বিশালাকৃতির ঘুড়িগুলো নানান সাজে রাখা আছে ,কোনটা রাক্ষস, আবার কোনটা সূর্য। এ বলে আমাকে দেখ ,ও বলে আমায় দেখ। কিন্তু ঘুড়ির এরকম প্রর্দশনী সত্যিই অদেখাই ছিল।
অন্ধ্র প্রদেশের পোঙ্গল সেটাও কিন্তু অনেকটাই বাংলার মতো পেলব। পূর্বের ছোঁয়াই বেশি কারণ ভারতের পূর্ব প্রান্তে তো। সেখানেও পায়েস বা পরমান্নম কিন্তু ঘরে ঘরে। আমাদের সরুচাকলি মোটামুটি ভাবে ওদের দোসার মতো। কিন্তু সরুচাকলিতে যেমন  একটু ঝাল ঝাল হয় দোসাতে সেটা হয়না। কিন্তু উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত প্রদেশ। 
যদিও পাঞ্জাবের লোঢ়ি বা আসামের বিহু দেখার সুযোগ ঘটেনি কিন্তু এই ফসল ওঠার আনন্দ সমস্ত ভারতবর্ষ ই উপভোগ করে। কিন্তু ঘুরে ফিরে  আসে সেই পিঠে পুলি, মা, কাকিমা, মাসিমাদের ভালবাসা মেশানো।

Saturday, 9 January 2021

পৌষল্যা

আগে পৌষ মাসে পিকনিক করাকে বলা হতো পৌষল্যা। এখন যেমন বারোমাস ই এখানে সেখানে পিকনিক করার ঘনঘটা, আগে সাধারণত পৌষমাসে বেশ ঠাণ্ডার আমেজে বনভোজন করার মজাটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। এর মানে কিন্তু এই নয় যে গরমকালে বা বছরের অন্যসময় যে পিকনিকগুলো হচ্ছে তাতে মজা নেই।  কাঠফাটা রোদে কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রিসর্টে গিয়ে, সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে হৈচৈ করে খানাপিনা করে কতলোক ই তো পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করছে কিন্তু কজনের এই সাধ্য আছে এত পয়সা খরচ করার। সুতরাং, সাধারণ মানুষের পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করার উপযুক্ত সময় শীতকাল। এইসময় খেয়েদেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে মজা লোটে বেশি ভাগ সাধারণ লোক। 
বনভোজন বা পিকনিক ছিল প্রকৃতপক্ষেই বনে ভোজন। কয়েকদিন আগে জায়গা দেখে আসা হতো, কাছাকাছি জলের জন্য কোন পুকুর বা টিউবওয়েল আছে কিনা এবং যতজন যাবে তাদের বসার মতো উপযুক্ত জায়গা আছে কিনা । তখন কারো কাছে এত পারমিশন নেওয়ার দরকার পড়তো না যদি না সেই জায়গাটা কারও ব্যক্তিগত জায়গা না হতো।
কয়েকটা জায়গা দেখার পর ঠিক করা হতো কোন জায়গায় যাওয়া হবে। বিষ্টুপুর কালীবাড়ির কাছে ছিল একটা প্রকান্ড বিল যেখান থেকে রান্নাবান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জল এবং খাবার জলের চাহিদা  কালীবাড়ির টিউবওয়েল থেকে নেওয়া হতো। তখন কালীবাড়ির আশেপাশে বেশ জঙ্গল ছিল এবং বাড়ি ঘর ছিল বেশ দূরে দূরে। পাড়ার ছেলেদের পৌষল্যার জন্য আদর্শ জায়গা কারণ ঐ পিকনিকে কুড়ি পঁচিশের বেশি লোক হতো না। কিন্তু ক্লাবের পিকনিকে লোক হতো মোটামুটি শতখানেক। সুতরাং, তার জন্য আদর্শ জায়গা মাড়োয়ারি বাগান। ঐরকম নাম কেন ছিল সেটা কোনদিনই জানা যায়নি এবং এর মালিক কোন মাড়োয়ারি ছিল সেটাও জানতে পারা যায়নি। তখন তো বয়স খুবই কম কিন্তু ক্লাবের ডিসিপ্লিন ছিল খুব ভালো। শীতের সকালে বেলা আটটার মধ্যে ক্লাবে পৌঁছে যাওয়া এবং তার পর লাইন করে  মাইল দুয়েক হেঁটে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ছিল বোধহয় কোন রাজারাজড়ার বাড়ি। পঞ্চানন তলা ছাড়িয়ে  জঙ্গলের মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটার পর বিরাট একটা কারুকার্য করা লোহার গেট। সেটা পেরোলেই চারিদিকে প্রচুর আম, কাঁঠাল, জাম, নারকোল,সফেদা,পেয়ারা ও কুলগাছ। ছিল বিরাট বিরাট আরও কত গাছ যার নামধাম জানতাম না। কত বিঘা জায়গা বলা মুশকিল কিন্তু ছিল বড় বড় দুটো পুকুর এবং বাঁধানো ঘাট যা থেকে বোঝা যায় বাড়ির মালিকের ঐশ্বর্য এবং তাঁর রুচিবোধ। পুকুরের পাড়ে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি যেটা আজকালকার পাঁচ ছয়তলা বাড়ির উচ্চতার সমান। বাড়ির কাছে যেতেই একটা ছমছমে ভাব, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। কিন্তু ক্লাবের দাদাদের একদম হুঁশিয়ারি ছিল যে ঐ বাড়ির কাছে বা পুকুর পাড়ে কেউ যেন না যায়। কিন্তু আমরা তাঁদের চোখ এড়িয়ে যেতাম কি আছে দেখতে। একটা কথা আছে না , যে ওখানে যাবেনা বললে সেইখানেই যেতে ইচ্ছে করে আর এচোড়ে পাকা ছেলে হলে তো কথাই নেই, সে ঐখানেই যাবে।
ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি, প্রকাশ বলে উঠল, "এই, ভুটান দার বাঁশি বেজেছে, চল তাড়াতাড়ি নাহলে ভুটান দার বেতের ঘা খেতে হবে।" সবাই তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম কিন্তু দেখি আমাদের আগেই মোটামুটি সবাই এসে গেছে। ভাগ্য ভাল, সেদিন ভুটান দার মেজাজটা বেশ ভালই ছিল, তাই বেতের বাড়ি খেলাম না কিন্তু একটা ঠান্ডা দৃষ্টি আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপ নিয়ে নিল। বোঝা গেল এবার ছাড় পেয়েছ ভাল কথা কিন্তু ফের যদি দেরী হয় তাহলে কিন্তু সরু লিকলিকে বেত টা আমাদের পিঠে নির্ঘাত পড়বে। যাই হোক, লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি, কলা ও ডিম সেদ্ধ নিয়ে দৌড় মারলাম। রান্নার তদারকি করছেন রঘু দা আর ওদিকে দুলু দা , দোদা দা, মোহন দা, শক্তি দা,চঞ্চল দা, রবিদা,বিশ্বনাথ দা, মদন দা, নগেন দারা বসে গল্পগুজব করছেন আর মধ্যমণি হয়ে একটার পর একটা মজার গল্প বলে চলেছেন মনা দা আর সবার পেট ফাটার জোগাড়। পল্টু দা, ছোকুদা, গোপালদা, মিলিদা, দিলীপ দারা সবাই দ্বিতীয় সার্কেলে বসে মনাদার গল্প শুনছে। সুদীপ, অজিত, অভয়, রানা, জয়ন্ত রা ক্রিকেট ব্যাট ও বল এনেছে আর ওদের সঙ্গেই ভিড়ে আছে  আরও অনেকে। কিন্তু বিচ্ছুদের মধ‌্যে আমরা পড়ি আমরা কোথায় সফেদা বা কুল পাওয়া যায় তাই দেখতে ব্যস্ত। আরও একটা জিনিস যে ঐ বাড়িতে কে থাকে সেটা জানার চেষ্টা। বাড়ির সদর দরজায় দেখি এক পেল্লাই সাইজের তালা। এদিকে ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে দেখি একটা জানলা ভাঙা কিন্তু সেখান দিয়ে ঢোকার সাহস আমাদের কারো হলো না। আমরা একটা পেয়ারা গাছে অনেক পেয়ারা দেখে তাতেই মজে গেলাম। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ পেয়ে পেয়ারা গাছ থেকে দুরদার লাফ দিয়ে পালাতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, খন্চা নেই আমাদের মধ্যে। ওর ভাই কুশু ছিল আমাদের সঙ্গে। ও বললো, এই দাদাকে দেখেছিস? নাতো। খোঁজ খোঁজ। গিয়ে দেখি ওর মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরোচ্ছে আর হাত পা সব শক্ত হয়ে গেছে। পুকুর থেকে জল এনে ওর চোখে মুখে ছেটানোর পরে ওর জ্ঞান ফিরে এল। একটু পরে আস্তে আস্তে ও সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমরা ফিরে এলাম। কিন্তু কি করে জানিনা, ভুটান দার কানে চলে গেছে খবরটা। ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি আর আমরাও চোরের মতন মুখ করে কোনরকমে হাজির হলাম। এদিকে খাবার তৈরি। খাবার আগে আর বকাবকি করলেন না। অ্যাই বাচ্চারা, চঞ্চল দার গলার আওয়াজ, তোমরা সবাই লাইন দিয়ে বসে পড়। খাওয়া দাওয়া শেষে হাত ধুতে যাওয়ার সময় মাথায় পড়ল একটা ঠান্ডা অথচ শক্ত হাতের চাঁটি। দেখি ভুটান দা। ভাবছিস, আমি কিছু টের পাইনি?  বাড়ি যাওয়ার পরে টের পাবি। বুঝলাম, মিথ্যে কথা বলে কোন লাভ নেই। বললাম আর কোনদিন করবনা। আপনি বাড়িতে যেন বলবেন না তাহলে আর ভবিষ্যতে বাড়ি থেকে কোনদিন আসতে দেবেনা। ঠিক আছে, মনে থাকে যেন।
আজ এতদিন বাদে কতজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, ক্লাব কিন্তু রয়েছে কিন্তু মাড়োয়ারি বাগান আছে কিনা জানিনা । হয়তো কোন প্রমোটারের কবলে চলে গেছে এবং কোন হোটেল হয়তো হয়ে গেছে।