Sunday, 22 December 2024

"লৌকিকতার পরিবর্তে আশীর্বাদ প্রার্থনীয়"

কোন কোন  লোক থাকেন যাঁরা দাদা ডাকেই খুব আনন্দ পান, তা সে ব্যক্তির বয়স যাই হোক না কেন। এইরকম ই একজন ব্যক্তি বিশুদা।আপামর জনতার বিশুদা, সে আমার বাবার ও বিশু দা, আমার ও বিশুদা, আমার ছেলের ও বিশুদা, আবার তার ছেলেও হয়তো বিশুদা ই বলবে যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন । এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশুদা তাঁর বিশাল দশাসই চেহারা নিয়ে নতুন বাজার যেতে যে উঁচু ধাপিওয়ালা বাড়িটা পড়ে সেখানে বসে থাকেন এবং বাজারগামী  বা বাজার করে ফিরে আসা সমস্ত লোকজন একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টা সামান্য প্রসারিত করে কোন শব্দ উচ্চারন না করেও ভাল আছেন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রত্যুত্তরে বিশুদা ও মাথা নাড়িয়ে কোন কথা না বলেও ভাল থাকার কথা বলেন । কোন কোন সময় হাত তুলেও ভাল থাকার কথা‌ জানান । বিশুদা কে বেশিরভাগ সময়ই আদুর‌ গায়ে দেখা যায়, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, ‌বড়জোর একটা হাতকাটা সোয়েটার বা একটা চাদর । তাঁর  ঠাণ্ডা না লাগার কারণ জিজ্ঞেস করলেই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা একটা তামার পয়সা  বের করে দেখাতেন আর বলতেন বুঝলি পয়সার গরম কাকে বলে? প্রকাণ্ড শরীরের মালিক এই বিশুদা কোথায়  থাকেন,  কে ই বা তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন কিছুই  জানা ছিলনা । কাজকর্মহীন বিশুদা কে দেখা যেত ফুটবলের মাঠে। কোন  বিশেষ দলের সমর্থক ছিলেন বলে মনে হয়না কারণ যে দল ভাল খেলত  তাকেই উৎসাহ  যোগাতেন।হয়তো যে  দলের সমর্থক আমি তার বিরুদ্ধে একটা গোল হয়ে গেল আমার মন খারাপ  হয়ে গেল কিন্তু পাশে বসে থাকা বিশুদা দুহাত তুলে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমার মন দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেলেও বিশুদার প্রতি রাগ করতে পারতামনা।শুধু আমি কেন,  কেউই রাগ  করতে পারতনা। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। 
খেতে খুব  ভালবাসতেন বিশুদা আর চেনা অচেনা সব লোকই তাঁকে  নিমন্ত্রণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিশুদা কে নেমন্তন্ন করা মানে দশটা লোককে নেমন্তন্ন করা কিন্তু  তা সত্ত্বেও বিশুদা কে লোকে নিমন্ত্রণ করত।উপহার‌ বিশুদার একগাল হাসি সমেত আশীর্বাদ । এ ছাড়া বিশুদার কাছ থকে কেউ কোন উপহার আশা করতনা। তারাশঙ্কর দা ছিলেন একটা স্কুলের  মাস্টারমশাই । তখন স্কুলের  মাস্টারমশাইদের  মাইনে তিন চার মাস  অন্তর হতো। মাইনে পেতেই প্রায় সবটাই চলে যেত ধার শোধকরতে। তবু ও মাইনে পাবার মাসে কোন নিমন্ত্রণ হলে খুব  একটা অসুবিধা হতোনা উপহার দিতে কিন্তু সেই নেমন্তন্ন যদি মাইনে পাওয়ার প্রায় শেষ অবস্থায় পাওয়া যায় তা হলে ধার করা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকেনা। এইরকম একসময়  তারাশঙ্কর দার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তারাদার নেমন্তন্ন হলো, সঙ্গে বিশুদার ও। আর ঐ বন্ধুই হচ্ছে তারাদার মুশকিল আসান । নানা সময় তারা দা তারই শরণাপন্ন হন টাকার দরকারে কিন্তু তাঁর ই মেয়ের বিয়েতে উপহার  দেওয়ার জন্য তাঁর ই কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা  হচ্ছিল তারাদার। না, কিছুতেই ওর কাছে নেওয়া যাবেনা। অনেক  চিন্তা ভাবনা করে বিডিও অফিসের হেডক্লার্ক মুকুদার শরণাপন্ন হলো। মুকুদা বলল আসতে তারাদাকে তার অফিসে, যদি কোন ব্যবস্থা করাযায়  ধারের। সেদিন ছিল শনিবার শেষ দুটো পিরিয়ড ছিল কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল । আমার ও ছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস । হেডমাস্টার মশাইকে বলে ম্যানেজ করে আমার ওপর দুটো ক্লাসের  ভার দিয়ে উনি তো মুকুদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন । মুকুদার সমস্ত চেষ্টা বিফল, কারও কাছে  বাড়তি টাকা নেই  ধার দেওয়ার মতো । তারাদাও খুবই বিমর্ষ । না,বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে  কোন  উপহার  না নিয়ে কিছুতেই  যাবেনা সে। হঠাৎই  মনে পড়ে গেল  বিশুদার ও নিমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বিডিও অফিসে অনেক লিফলেট পড়ে ছিল। উই প্ল্যান ফর প্রসপারিটি, রুরাল ডেভেলপমেন্ট,  ফাইভ ইয়ার প্ল্যান এই জাতীয় যত লিফলেট ছিল সবকটা থলি ভর্তি করে নিয়ে এল। স্টেশনারি দোকান থেকে মলাট দেবার লাল, কমলা রঙের অনেক গুলো কাগজ কিনে নিয়ে  এল।  সেলোফেন পেপার দিয়ে  ভাল করে মুড়িয়ে ঐ পুস্তিকাগুলো একটা দেখনদার গিফট প্যাক করে বিশুদার পাশাপাশি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল। বন্ধু তারাদার হাতে সুদৃশ্য প্যাকেট  দেখে একটু আশ্চর্য ই হলো, ভাবল তারা ধারদেনা করে কেন এইরকম একটা দামী উপহার  কিনতে গেল। যাই হোক,  মুখ্য আকর্ষণ বিশুদার আশীর্বাদের পাশে অন্য যে কোন  লোকের উপহার কেমন ম্যাড়মেড়ে। তারা দা তো একেবারে লেপটে রয়েছে বিশুদার সঙ্গে । বিশালদেহী বিশুদার আশীর্বাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারাদার গিফট প্যাকেট দিয়েই তারাদার খাওয়ার জায়গায় প্রস্থান বিশুদা কে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পরেই যত তাড়াতাড়ি  সম্ভব বাড়ি ফিরে  আসা।
বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়রা থাকে যারা কে কি উপহার  দিল তা একটা লম্বা কাগজে লিখে রাখে। মোটামুটি সব গিফটের উপহারদাতার নাম পাওয়া গেলেও  ঐ বিশেষ  প্যাকেট কে দিয়েছেন তা জানা গেল না। আর প্যাকেটটা এত মজবুত ভাবে মোড়ানো  হয়েছে  তাকে ঐ মূহুর্তে  খোলা গেলনা। পরদিন কন্যা বিদায়ের সময় অনেক  উপহারের সঙ্গে সেই মজবুত প্যাকেট ও চলে গেল । শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের ঘনঘটা থিতিয়ে যেতেই ছুরি, কাঁচি দিয়ে সেই প্যাকেট খুলতেই পঞ্চবার্ষিকী প্ল্যান,গ্রামীন উন্নয়নের সরকারী ইস্তেহার সব ছড়িয়ে  ছিটিয়ে  পড়ল। সবাই ছিছি করতে লাগল আর মধুমিতার লজ্জ্বায়, দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মা কে বলল এই উপহারের কথা। মা তো হাঁ করে চেয়ে রইল কিছুই আঁচ করতেই পারলনা কিন্ত ওর বাবা অর্থাৎ  তারাদার বন্ধু কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে এটা তারার কাজ। বিয়ের  পর বেশ কিছুদিন  কেটে গেছে । তারাদার মাইনে হয়েছে এবং  ধার শোধের পালা। বন্ধুর  কাছে  এসেছে টাকা ফেরত দিতে  কিন্তু  বন্ধু বলল, " তারা, পঞ্চাশ টাকা  বাড়তি দিবি এবার।" হকচকিয়ে গেল তারা দা। " কেন রে পঞ্চাশ টাকা বাড়তি কেন, তুই কি আজকাল  সুদের  ব্যবসা করছিস না কি?"
"না, সুদের  ব্যবসা নয়, তিরিশ টাকা  মেয়ের  বিয়ের  উপহার  আর কুড়িটাকা মেয়ের  শ্বশুরবাড়িতে  আমার সম্মান  নষ্ট করার জন্য।"
তারা দা যত ই অনুনয় বিনয় করে কিন্তু বন্ধু অনড় এই পেনাল্টিতে । "তোর কাছে টাকা ছিলনা তো তুই  এইসব ছাইপাঁশ এখানে আনলি কেন?"
তারা দা বলল, " দেখ , সবসময়ই টাকা তোর কাছেই নিই কিন্তু  তোর  মেয়ের  বিয়েতে  উপহারের জন্য তোর কাছে  টাকা নেওয়া  কি উচিত? "
" তোকে উপহার দিতেই হবে, এমন কোন  বাধ্যবাধকতা তো নেই ঐ তো বিশুদার মতন তুই ও আশীর্বাদ করতে পারতিস।"
 যাই হোক তারাদাকে বড্ড লজ্জায় ফেলে দিল তার বন্ধু। 
পরে আর কোনদিন  তারা দা ঐ বন্ধুর কাছে টাকা  ধার নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি।

Saturday, 7 December 2024

মধুর যাত্রা

হঠাৎই ছেলের ফোন বেশ রাতে, ব্যাগ গুছিয়ে রাখ, যেতে হবে আমাদের মাউন্ট আবু। সবেমাত্র নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠা আমি চমকে উঠলাম প্রস্তাব শুনে। এখনও  নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে ওঠেনি, আমি তো ভয়েই শুকিয়ে গেলাম। তবু একবার ভাবলাম যে প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর বেছে নেওয়া জায়গা মাউন্ট আবুর অপরিসীম শিল্প কীর্তি দিলওয়ারা টেম্পলের পাশে যদি বিলীন হয়ে যেতে পারি তাতে মন্দ কি? সোমবার  ২রা ডিসেম্বর আকাশ এয়ারলাইন্সে দুপুরের টিকিট আমাদের কিন্তু কপালের ফের, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দুঘন্টা লেট। কিন্তু সবদিক দিয়েই লোকসান হলো না, প্রত্যেক যাত্রার ই একটা আলাদা মাত্রা থাকে এবং এখানেও তার ব্যাতিক্রম হলো না।
দুপুর বেলায় খাওয়া দাওয়া সেরে এয়ারপোর্ট  পৌঁছলাম । এসে গেল  হুইল চেয়ার । একটু বেচারা বেচারা মুখ করে চেয়ারে বসতেই একটা লজ্জ্বা চারদিক থেকে  ঘিরে এল। দিব্যি হেঁটে চলে হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছি অথচ এয়ারপোর্টে এসেই যেন ঠুঁটো জগন্নাথ । তবু চেষ্টা করি এই হুইল চেয়ার বাহকদের কষ্টটা একটু প্রশমিত করার তাদের পকেটে কিছু গুঁজে দিয়ে একটু লোকচোখের নজর এড়িয়ে  কারণ এদের কর্মকর্তাদের নজরে এলে এদের চাকরি চলে যেতে পারে। আমরা অনেক সময়েই অনেক ভুল কাজ জেনে শুনেই করি। এর বদলে যদি এয়ারলাইন্স আমাদের কাছ থেকে   এই সেবার জন্য কিছু  মূল্য ধার্য করে তাহলে এই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়না। যাই হোক,  সিকিউরিটি চেক হয়ে যাওয়ার পর বোর্ডিং ও হয়ে গেছে,  এয়ারোব্রিজ দিয়ে তারা এদিক ওদিক করে প্লেনে ঢোকার আগে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছি  কিন্তু  প্রতীক্ষার অবসান আর হয়না। প্রায় ঘন্টাখানেক ঐ অবস্থায় থাকার পর জানা গেল  যে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য প্লেন ছাড়তে দেরী হবে । বেচারা হুইল চেয়ার বাহকদের আরও  দুর্ভোগ বাড়ল, ফের আশি কেজির এই শরীরটাকে টেনে নিয়ে  আবার এক তলায় নিয়ে এল, ফের নতুন করে আবার সিকিউরিটি চেক আর এর ই মাঝে যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে নেওয়া। দুটো ঘন্টা  কেমন করে যে কেটে গেল  বুঝতেই পারলাম না।কিন্তু যাদের  যাওয়ার  তাড়া আছে তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কারণ তাদের  তো অনেক কিছু  সামলাতে হবে, সবাই তো আমাদের  মতো বেকার নয়। যাই হোক,  এয়ারোব্রিজ থেকে মুক্তি পেয়ে রানওয়েতে এসেও আবার অপেক্ষা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের ক্লিয়ারেন্সের জন্য। এরপর আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু কথায় বুঝতে পারলাম যে নির্দেশ  এসে গেছে।
এতক্ষণ যারা হৈচৈ করছিল প্লেন ঠিক সময়ে না ছাড়ার জন্য তারাই বেশ কলরবে মেতে উঠল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় । কোন কোন  সময়ে ডেসিবেল একটু বেশি ই হয়ে যাচ্ছিল ।  আমাদের দুজনের টিকিট এক জায়গায় হয়নি, পাশে একজন অল্প বয়সী মেয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখেই চলেছে আর মাঝে মাঝেই নিজের মনে খিলখিলিয়ে হাসছে‌। পিছনে একটা যুগল(বন্ধু ও  হতে পরে  বা সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েও হতে পারে) যেখানে ছেলেটি হিন্দি, ইংরেজিতে মিশিয়ে প্রচণ্ডভাবে ইম্প্রেস করে চলেছে। খারাপ  লাগছিল না বিশেষ করে স্ত্রী পাশে না থাকায় ধমক খাওয়ার ভয় ই ছিলনা। সুতরাং লোকজনের কথাবার্তাতেই নিজেকে খুশী রাখার চেষ্টা করছিলাম । সামনের সারিতে এক মুসলিম পরিবার কিন্তু তাদের তিনজনের সিট ও একসাথে হয়নি। কি বেআক্কেলে এয়ারলাইন্সের লোকজন । বাচ্চাটা জানলার ধারে ছাড়া বসবেই না।অল্প বয়সী স্ত্রীর পাশে অন্যান্য লোক বসে থাকবে এটা কিছুতেই  মেনে নিতে  পারছে না বেচারা। 'আইল' সিটে বসে থাকা ভদ্রলোক  বেশ জুত করে বসে সীটবেল্ট বেঁধে ফেলেছেন আর অল্প বয়সী স্বামী তাকে কাতর অনুনয় বিনয় করে চলেছে সীট বদলানোর জন্য । কিন্তু লোকটার মন ভিজল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই জানলার ধারে বসে থাকা সীটে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উদাসী দৃষ্টিতে পেঁজা তুলোর মতন ভেসে থাকা মেঘের দিকে মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকল। সে আবার আমার ই সারির জানলাতে থাকায় তাকে দেখে একটু কষ্ট ই লাগছিল। পাষাণ হৃদয় লোকটার মন কিন্তু বিন্দুমাত্র টলল না । আমার ও অবস্থা  বিশেষ  সুবিধার নয়। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে এবং এইরকম পরিস্থিতির মোকাবিলা মাঝে মাঝেই আমাকে করতে হয়েছে । কিন্তু খিদেটা বেশ  চাগিয়ে উঠেছে আর খাবারগুলো সব তার কাছে থাকা ব্যাগে, সুতরাং,  আমার অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। মাথাটা তার বেশ বড়সড় এবং  দাড়ি নিয়ে সমস্ত জানলাটা প্রায় বন্ধ ই হয়ে গেছে। সেই কারণে আমার দিকের ডান দিকের জানলা দিয়ে যতটা দেখা সম্ভব তাই দেখেই মনের স্বাদ  মেটাচ্ছি। প্লেন  চলেছে  পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অন্ধকার তাড়া করে চলেছে আলোকে কখন ধরবে বলে। মনে হচ্ছে অ্যানিম্যাল কিংডমে চিতা তাড়া করছে হরিণের পিছনে আর হরিণ প্রাণভয়ে ছুটে চলেছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। দৃশ্য অপূর্ব কিন্ত দেখার বিষয়ে কখন চিতা হরিণকে ধরে। অবশেষে দৌড়ের সমাপ্তি, লাফিয়ে পড়ে অন্ধকার ধরে ফেলল ক্লান্ত আলোর শিখাকে। আমাদের চারপাশে এত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে আছে আমরা তার দিকে  না তাকিয়ে সামান্য বিষয়ে নিয়েই তুলকালাম করি। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ প্লেনের চাকা মাটিতে আলতোভাবে চুমু খাওয়ার জায়গায় সিনেমার ভিলেনের মতো নায়িকার সঙ্গে জবরদস্তি করার মতো ল্যাণ্ড করল এবং  প্রমাণ করল ক্যাপ্টেনের অনভিজ্ঞতা। উবের বুক করে গেস্ট হাউস পৌঁছতে প্রায় নটা বেজে গেল। খাওয়া দাওয়া সারতে বেজে গেল দশটা।কাল গাড়িতে আসবে ছেলে বৌমারা।পাঁচ শ কিলোমিটারের কিছু বেশী রাস্তা আসতে দশ ঘন্টা তো লাগবেই, এ ছাড়া রয়েছে ট্র্যাফিক জ্যাম, কতক্ষণে এসে পৌঁছাতে পারে নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে পারে তার উপর। 
আমেদাবাদ শহরটা খুব অপরিচিত নয়। তবে যে ভাবে শহরটা দৈর্ঘে প্রস্থে বেড়েছে এবং দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতার বাসস্থান হবার কারণে সৌন্দর্য্য আরও ত্বরান্বিত হয়েছে । ওদের না আসা পর্যন্ত আমাদের আর কোন কাজ নেই, এদিক ওদিক  ঘোরা ছাড়া। চারদিকে ফ্লাইওভারের ছড়াছড়ি, চেনা শহরটাও যেন বিদ্রূপ করে বলছে আমি কে বল তো? সত্যিই তো ,চিনতে পারছিনা । তবে ভাগ্য ভাল উবেরের কল্যাণে গাঁঠগচ্ছা বেশী গেলনা। আগে শহর কে দুইভাগে ভাগ করা সাবরমতী নদী ছিল শীর্ণকায়,  এখানে সেখানে ইতস্ততঃ জলরাশি নদীর বুকে জমে থাকা পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছোট ছোট তরঙ্গ সৃষ্টি করছে এটা চোখে পড়ত। কিন্তু দুই পাড়েই বেশ খানিকটা জায়গা  ভরাট করে সেখানে হয়েছে রিভার ফ্রন্ট এবং নানারকম আলোয় সজ্জিত হয়ে এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন বয়সী লোকজন এসে পার্কে বসে আছে এবং আলোকমালার সৌন্দর্য্য উপভোগ করছে। দেখে ভাল লাগল যে এতকর্মব্যস্ততার মধ্যেও  লোকজন একটু সময় বের করে নিতে পেরেছে । হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা মনে পড়ল যে শেষ কবে সবাই একসঙ্গে এসে এইভাবে আনন্দ উপভোগ করেছি। কাজ, কাজ আর কাজ। কাজের মধ্যেই  হারিয়ে গেছে যৌবন, চোখের জ্যোতি কমেছে, দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে,  পাক ধরা চুলে কলপ লাগিয়ে নিজের বয়স কমানোর চেষ্টা  হয়তো হয়েছে কিন্তু চটপটে ভাবটা তো বয়সের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতি, তা যেন ভয়ানক ভাবে কমে গেছে। মনটাই কেমন যেন  বুড়িয়ে গেছে। কর্মজীবন এবং  পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটা ব্যালেন্স যারা রাখতে পারেনা তাদের ই এই দশা হয়। যাই হোক ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে ব্যথা আনন্দের  এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। এক সময় মন যখন ছিল চাঙ্গা তখন কর্মব্যস্ততায় জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারিনি আর আজ যখন অখণ্ড অবসর তখন শরীর ও মন বিদ্রোহ করে।
প্রায়  এগারটা বেজে গেল  গাড়ী এসে থামল গেস্ট হাউসের সামনে । ওদের ঘর ঠিক করাই ছিল । রাস্তায় খেয়ে নেওয়ায় ঐ হাঙ্গামা হলো না। অল্পবিস্তর কথার মাঝে জানতে পারলাম যে নাতনির পা মচকে গেছে এবং  নাতির ও গায়ে বেশ  জ্বর। সঙ্গে থাকা ওষুধ দেওয়া হলো কিন্তু  মানসিকভাবে একটু ধাক্কা খেলাম, আদৌ যাওয়া হবে  তো? ছেলে বৌমার জন্য খারাপ লাগছিল,  ওদের ও সেই আমাদের মতন দুর্ভাগ্য দেখে। দেখা যাক, কি হয় আগামী কাল । পরদিন ভোর বেলায় উঠে স্নান করে তৈরী হয়ে আছি। সামনের জৈন মন্দিরে এক বিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে। মন্দির দর্শন এবং বিবাহ দর্শন, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হলো। ফিরে এসে দেখি তখনও ঘুম ভাঙেনি ওদের। দরজায় টোকা দিয়ে জানতে পারলাম যে নাতির জ্বর বা নাতনির পায়ের ব্যথার উপশম হয়নি। সুতরাং,  মাউন্ট আবু যাওয়া আপাতত হচ্ছেনা। আমাদের কষ্ট এতটা হলোনা যতটা আমার বৌমার বা বাচ্চাদের হলো ।আমি নিজের শরীর  সম্বন্ধেও যথেষ্ট সন্দিহান  ছিলাম । কিন্তু দুঃখ যে একেবারেই  হয়নি  তা নয়, কারণ প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর  ওই মেডিটেশন হলটা আমাকে বারবার কেমন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কোনরকম রিস্ক না নিয়ে আমার পুরনো শহরটাকেই নতুন ভাবে দেখলাম এবং  বাচ্চারাও যথাসম্ভব গাড়ি থেকে না নেমে শহরটাকে দেখল। দুপুরের  খাওয়া স্যাটিলাইটে অবস্থিত নৈবেদ্যম রেস্তোরাঁয় সেরে গেস্ট হাউসে ফিরে আসা এবং  পরদিন সকাল বেলায় বম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা ।
ঠিক কথাই যে মাউন্ট আবু যাওয়া হলো না কিন্তু ছেলে, বৌমা, নাতি,নাতনিদের সঙ্গে একসাথে সময় কাটানো তো আজকাল এক দুর্লভ ব্যাপার।

Friday, 15 November 2024

গুরু নানক জন্ম জয়ন্তী --স্মৃতি রোমন্থন

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী গুরুনানকজীর আজ জন্মদিন। তাঁর  জন্মদিন নিয়ে একটু দ্বিমত রয়েছে । কেউ কেউ  বলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল  পাকিস্তানের  নানকানা সাহেবের  তালওয়ান্দি  গ্রামে। কিন্তু ভাইবালা জন্মসখী এবং  অন্যান্য বিশিষ্ট শিখ ধর্মগ্রন্থের লেখকদের পরিভাষায় কার্তিকমাসের পূর্ণিমার দিন  নানকজীর জন্ম হয়েছিল  এবং  সেটাই সরকারের মান্যতা পেয়েছে এবং  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ  মহা সমারোহে এই দিনটি পালন করেন এবং  তাঁর বাণী প্রচার করেন সঙ্গীত ও লঙ্গরখানায় বহু লোককে খাওয়ানোর মাধ্যমে ।
আজ ১৫ইনভেম্বর ২০২৪ শ্রী নানকজীর জন্মদিন । কিন্তু ৫২ বছর আগে ১৯৭২ সালে কার্তিকপূর্ণিমা ছিল ২০ই নভেম্বর, সোমবার সারা ভারতবর্ষে স্বীকৃত ছুটির দিন  এবং   আমার  বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করল যে শনিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে  বহরমপুর  যাবে এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে যাবে রবিবার ও ফিরে আসা সোমবার অর্থাৎ গুরু নানকজীর জন্মদিনে । কোথায়  থাকা হবে? ঠিক হলো তারা সবাই উঠবে আমাদের বাড়ি। শ্যামল দা যেতে পারলেন না, অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  হরিশচন্দ্র, শিবু, সুজিত, জয়ন্ত, চৌধুরি, শিবুর এক বন্ধু দীপু ও মেয়েদের মধ্যে ছায়াদি,  মাধবিকা ও কনিকা। তখন বহরমপুরে বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে,অন্তত কলকাতার  তুলনায়  তো যথেষ্ট  ঠাণ্ডা । আমার ঘরে দাদুর দুটো জম্পেশ খাটে ছায়াদিদের শোয়ার ব্যবস্থা হলো, মুস্তাফি সাহেবের ব্যবস্থা হল ঐ বাইরের বিশাল ঘরে আর সুজিত, শিবু , জয়ন্ত, চৌধুরী,  হরিশচন্দ্র ও দীপুদের সদ্য কেনা লালুদার বাড়িতে। সবার জন্য  লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা করতে হয়েছে নাহলে যত ই নাক মুখ চাপা দিয়ে  লেপ মুড়ি দিয়ে  শোওয়া যাক না কেন মশা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওরা সবাই এসেছে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে। আমি একদিন আগে ছুটি নিয়ে  এসে গেছি। দাদাও এসে গেছে বিরাট মাছ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা কুতুবপুর  থেকে। হৈ হৈ ব্যাপার আর কি। বাবা ও আমি সাইকেল  নিয়ে  বাস স্ট্যাণ্ডে ওদের  নিয়ে  আসতে গিয়েছি। লালু দা, সেজদি এবং  আজিমগঞ্জ থেকে  বড়পিসিমাও এসে গেছে ওদের  আদর আপ্যায়নে যাতে কোন ত্রুটি  না হয়। রিক্সা সব বলাই ছিল। ওরা  আলো ঝলমলে জজসাহেবের বাড়িতে এসে পৌঁছানো মাত্র ই  গরমজলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল বাইরের ঘরে। গরম চা ও  হালকা জলখাবার খেয়ে  বেশ খানিকক্ষণ  আলাপ পরিচয়ে কেটে গেল।   আমাদের  বাড়ির ভেতরের বারান্দায় আসন পেতে রাতের খাওয়া দাওয়া  হলো। মুস্তাফি সাহেব জমিদার বাড়ির ছেলে এবং যথেষ্ট  ভোজন রসিক, বড়সড় মাছের মাথাকে কি করে খেতে হয়, তা দেখিয়ে দিলেন । মুস্তাফি সাহেব বললেন উনি একা বাইরের ঘরে থাকবেন না, তিনিও লালুদার বাড়িতেই থাকবেন । ওখানে তিনটে বেশ বড় ঘর ছিল , ভালভাবেই  সেখানে সবাই ঠিকঠাক ভাবেই ম্যানেজ হয়ে গেল। লালুদার  বাড়িটা ছিল  আমাদের  বাড়ির  তিনটে বাড়ি পরে। সকাল বেলায় গরম চা নিয়ে দাদা, আমি ও লালুদা যখন এলাম তখন দেখি অনেকে ফ্রেশ হয়ে গেলেও হরিশচন্দ্র এবং  মুস্তাফি সাহেব  তখনও  বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। শিবু সুজিতের পিছনে লাগছে এবং  হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে  এবাড়ির আনন্দের  রেশ  ও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে।  যাই হোক, এক প্রস্থ চায়ের পর  সবাই স্নান সেরে আমাদের  বাড়িতে এসে গেছে এবং  লুচি, তরকারি, বেগুনভাজা এবং  মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে চা খেয়ে একটা মিনিবাসে সবাই রওনা দিলাম  লালবাগের  পথে। একটু বেলাই হয়ে গেল হাজারদুয়ারি  দেখে ফিরে আসায় কিন্তু খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে । জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর দরকার  একটু গা গড়িয়ে নেওয়ার তবে কেউ আর লালুদার বাড়িতে  গেলনা, বাইরের  ঘরেই সবাই মিলে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিল। সন্ধের সময়ে মোহন হাউসে সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া এবং রাতে মাংস ভাত ও বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।  অনেক রাত অবধি গল্প গুজব করে রাতে গভীর ঘুম। এদিন আর মুস্তাফি সাহেব লালুদার বাড়িতে গেলেননা, বাইরের ঘরেই শুয়ে পড়লেন। সকাল  হতেই সব চা জলখাবারের ব্যাপার  কিন্তু মুস্তাফি সাহেব বললেন বাসি মাংস  দিয়ে মুড়ি খাবেন। তাই হলো, অন্যরা লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেল। দুপুর  বেলায় খাওয়া  মাছের ঝোল,  ভাত, চাটনি দই ও মিষ্টিতে সারা হলো তারপর রিক্সায় চড়ে স্টেশনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে শিয়ালদহে ফিরে আসা । দুদিনের ঠাসা প্রোগ্রাম,  এক ঝাঁক পায়রা ঘুটুর ঘুঁ, ঘুটুর ঘুঁ করতে করতে সবাই  ফিরে এল।
ইতিমধ্যে এদের মধ্যে অনেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে । শ্যামল দা, মুস্তাফি সাহেব,  সুজিত,  চৌধুরী , দীপু আগেই চলে গেছেন । সেই লিস্টে  নবতম সংযোজন ছায়াদি । হরিশচন্দ্র কোথায় আছেন জানিনা। 
আজ এতদিন  বাদে এই লেখার উদ্দেশ্য স্মৃতিটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং যারা অবশিষ্ট রয়েছে তাদের হৃদয়ে পুরনো দিনের  একটু বিদ্যুতের ঝলক আনা।

Saturday, 9 November 2024

"বাসুদেব"

বাসুদেব থাকতো সুবীরবাবুর  বাড়িতে। তাকে সেন্ট্রাল স্টেট  ওয়েলফেয়ার  হোম থেকে সুবীরবাবু এনেছিলেন তাঁর বন্ধু ঐ হোমের সুপারিনটেনডেন্ট অসীমবাবুর অনুরোধে। অসীমবাবু ছিলেন অকৃতদার  এবং  খুবই  আমুদে। মানুষটি ছোটখাটো হলেও ছিলেন একজন খুব ভাল বন্দুকবাজ শিকারী। ছুটির দিনে  বেড়িয়ে পড়তেন শিকারের খোঁজে এই জঙ্গলে বা ঐদিকের বিলে  এবং সঙ্গী থাকতেন আদি অকৃত্রিম বন্ধু সুবীরবাবু। কোন সময় রাতে দুই বন্ধু ফিরে এলেন কোন  বনমুরগী বা হাঁস শিকার করে এবং সুবীরবাবুর স্ত্রীকে বললেন, " বৌঠান, বেশ ঝাল ঝাল করে মাংস রাঁধতে হবে, ভাল করে মশলা বাঁটুন; আর ইতিমধ্যে আমরা এটার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে পরিষ্কার  করছি। তখনকার দিনে  না ছিল মিক্সি, না ছিল ফ্রিজ বা প্রেশার কুকার । শিল নোড়ায় বাঁটা মশলা ও কড়াইয়ে ঘুচ ঘুচ করে সিদ্ধ  হওয়া মাংসের স্বাদ ই হতো আলাদা। বাসুদেব ছিল  অসীমবাবুর হোম থেকে সদ্য বেড়িয়ে আসা ছেলে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী হোমে একটা বয়সের পরে আর থাকা যায়না । সুতরাং নিয়ম লঙ্ঘন করে অসীমবাবুর পক্ষে বাসুদেবকে ওখানে  রাখা সম্ভব ছিলনা। হোমে থাকাকালীন  ছেলেদের  বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং  দেওয়া হয়। যাতে পরবর্তী জীবনে সে নিজেই জীবিকা অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু চাকরি করব বললেই তো আর চাকরি পাওয়া যায়না। সবসময়ই চাকরির আকাল ছিল, এখনও  আছে এবং  ভবিষ্যতেও থাকবে। যতদিন ও একটা ঠিকমতন চাকরি না‌ পায় ততদিন সুবীরবাবুর  বাড়িতে বাসুদেব  থাকবে এবং  ফাইফরমাশ খাটবে ও খাওয়া দাওয়ার অভাব ওর হবে না। ইতিমধ্যে সুবীরবাবুর ছোট ছেলেটা বছর দুয়েক হয়েছে এবং  তার দেখাশোনা করার  জন্য একটা লোকের  দরকার  ছিল  যেটা বাসুদেব মিটিয়ে দিত। দুজনের  দুজনকেই দরকার  ছিল, অতএব বাসুদেবের  ঠাঁই  হলো সুবীরবাবুর বাড়িতে ।

অসীমবাবুর ব্যবহারের জন্য  উনি সকলের খুব প্রিয় ছিলেন কিন্তু  বন্ধু বলতে সেই সুবীরবাবু এবং  ঐ একটি বাড়ি ছাড়া উনি আর কোথাও যেতেন না। তাঁর হোমটা ছিল স্টেশনের কাছে যা সুবীরবাবুর বাড়ি থেকে  প্রায় আড়াই মাইলদূরে। বেশীরভাগ দিন ই অসীমবাবুর রাতের খাওয়া হতো সুবীরবাবুর বাড়িতে এবং  তারপর সাইকেল চালিয়ে হোমে ফিরে যাওয়া।  একদিন কথায় কথায় বাসুদেবের প্রসঙ্গ উঠল। উনি জানালেন যে একদিন  উনি সকাল বেলায়  উঠে দেখেন দরজার বাইরে  কাঁথায় মোড়ানো একটা  ছোট্ট শিশু । মাঝে মাঝেই  কেঁদে  উঠছে । একে অকৃতদার মানুষ,তার উপর ঐ শহরে কোন  আত্মীয় স্বজন নেই । বাচ্চাটাকে নিয়ে কি করবেন  ভেবেই পাচ্ছিলেন না। অগতির গতি সুবীরবাবু । একটা রিক্সা করে বাচ্চাটাকে নিয়ে সোজা তাঁর বাড়ি। বললেন বৌঠান একটা ব্যবস্থা করতে হবে এই বাচ্চাটার। অনেক ভেবেচিন্তে সুবীরবাবুর  স্ত্রী একটা উপায় বের করলেন । ওঁদের  বাড়িতে কাজ করা শিবানীর কোন সন্তানাদি ছিলনা এবং  এখানে সেখানে  কোন পীঢ় বাবা বা সন্ন্যাসীর  পায়ে মাথা ঠুঁকতো এবং  মানত করতো একটা সন্তানের আশায়। অভাবের সংসার,  একটা বাচ্চাকে মানুষ করা খুব  সহজ কথা নয়,তবুও শিবানীর  মনে হলো এটা ভগবানের দান এবং বাচ্চাটিকে নিতে রাজি হলো। সুবীরবাবুর স্ত্রী শিবানীর  মাইনে একটু বাড়িয়ে দেবেন বলে একটু আশ্বস্ত করলেন। শিবানীর  আদরে মানুষ  হওয়া বাসুদেব একটু বড়সড় হতেই ঠাঁই  হলো সরকারী  হোমে এবং  তারপর আবার  সেই  সুবীরবাবুর বাড়ি।
বাসুদেবের মা কিংবা বাবার মধ্যে কেউ একজন নেপালি ছিল কারণ বাসুদেবের চেহারায় ছিল নেপালিদের মতন হাবভাব। যাই হোক হোমের খাতায় তার পদবী হলো মণ্ডল। বাসুদেব কয়েকবছর হোমে থাকার সুবাদে কাঠের কাজে  হাত পোক্ত করেছে এবং কাজের অপেক্ষা করছে । বাসুদেব  সুবীরবাবুর ছোট  ছেলেটার যাবতীয় বায়না মেটায় যেখানে  কোন পয়সা খরচ হয়না। খুবই ভাল বাসে  ছোট বাচ্চা  সুমনকে। তাকে নিয়ে  কোলে করে ঘোরা, তার সঙ্গে খেলা করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা সবকিছুই আব্দার বাসুদেবের কাছে। সুবীরবাবুর  ব্যবসায় ইদানিং একটু মন্দা চলায় টাকা পয়সা  নিয়ে একটু টানাটানি চলছে।বাসুদেব এটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোথায়  যাবে সে এবং একটা চাকরি যোগাড় না করতে পারা পর্যন্ত্য, তাকে সুবীরবাবুর বাড়িতে ই থাকতে হবে। তার পালিত মা শিবানীও বাচ্চা হতে গিয়ে দেহ রক্ষা করেছে আর শিবানীর  স্বামীও মদ খেয়ে লিভারের বারটা বাজিয়ে মারা গেছে। সুতরাং  বাসুদেবের এই বাড়ি ছাড়া আর কোনও  জায়গা নেই। দিন দিন সুবীরবাবুর আর্থিক অবস্থা শোচনীয়  হয়ে পড়ছে কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত ভদ্রলোক,  হাজার কষ্টের মধ্যেও  বাসুদেবকে  চলে যেতে  বলছেন না। ব্যবসায় যারা ধার বাকিতে জিনিস পত্র নিয়েছিল তারাও ঠিকমতো পেমেন্ট না করায় তাঁকে ও ধার করতে হয়েছে  এবং সেই ধারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাঝে মাঝেই  ঋণদাতারা এসে অপমান করছে যেটা বাসুদেবের একদম সহ্য হচ্ছে না। অসীমবাবু ঐ শহর  থেকে  বদলি হয়ে গেছেন। তিনি থাকলেও হয়তো খানিকটা সুরাহা হতো । যাই হোক বাসুদেব  একদিন  ঘরের  সব কাজ সেরে  পল্টনবাবুর কাঠের  গোলায়  দেখা করল এবং  একটা কাজ চাইল। কোথায়  থাকো জিজ্ঞেস করায় জানালো যে সুবীরবাবুর বাড়িতে  থাকে এবং  একটা চাকরির খুব  দরকার । সুবীরবাবুদের একটা সুনাম ছিল  ভদ্রলোক হিসেবে এবং  কানাঘুষোয়  জানতে পেরেছিলেন তাঁর  দুর্দশার কথা। সুতরাং  তিনি মনে মনে স্থির করেছিলেন  যে বাসুদেবকে একটা কাজ দেবেন ।  কি কি কাজ করতে পার জিজ্ঞেশ করায় বাসুদেব জানালো যে সে হোমে কাঠের  কাজ করতে শিখেছিল এবং  সুযোগ পেলে সে ঐ কাজ ভালভাবেই করতে পারবে। পল্টন বাবু বিশ্বাস  করতেন যে নেপালিরা খুব  বিশ্বস্ত হয়। তিনি ভাবছিলেন  যে কাঠের  গোলায়  তাকে দারোয়ানের কাজে লাগাবেন । দুদিন বাদে তাকে দেখা করতে বললেন। বাসুদেব তো ভগবানের কাছে  প্রার্থনা করতে  লাগল যাতে চাকরিটা সে পায়। বাড়ি ফিরে আসতে বেশ  দেরী  হয়েছে  আর মা( সুবীরবাবুর  স্ত্রীকে সে মা বলে ডাকতো) ভাতের থালা  নিয়ে  বসে আছে, অপেক্ষা করছে তার জন্য। বাসুদেবের  চোখে জল এসে গেল মাকে না খেয়ে বসে থাকতে দেখে। 
 "কোথায়  ছিলি এতক্ষণ? "
কিছু না বলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল রান্নাঘরে আসন পেতে।
মা জিজ্ঞেস করল আবার কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারল না সে , কেবল চোখ  দিয়ে জল বেরোতে থাকল।
মা বলল যে খেয়ে নে বাবা, খাওয়ার সময় চোখের জল ফেলতে নেই।
মায়ের মুখের দিকে  তাকাতে পারছে না সে , কেমন একটা অপরাধ বোধে তার মনটা ভার হয়ে আছে। ভাবছে এত কষ্টের মধ্যেও  মা বা বাবা কেউ কিছু বলছেনা তাকে। যাই হোক,  তাকে এই বাড়ির জন্য কিছু করতেই হবে কিন্তু যতক্ষণ কিছু না হয় ততক্ষণ সে কিছুই  বলবে না। নিজের  বাবা মাকে সে দেখেনি। শিবানী মায়ের  কাছে ছোট অবস্থায়  ছিল, পেয়েছে তাদের  ভালবাসা, তারপর দেবতা তুল্য মানুষ অসীমবাবুর ভালবাসা ও শাসন এবং  সবশেষে এই বাবা মা আর ছোট ভাই যাকে সে বড়দাদার মতো মানুষ  করেছে আর সুবীরবাবুর মেয়েদের  দিদির মতন দেখেছে। আর কি চাই ভগবানের কাছে?  সব  তো তিনি দিয়েছেন। 
দুদিন  পরে বাসুদেব দেখা করেছে পল্টন বাবুর সঙ্গে। কাঠের  গোলায়  তাকে থাকতে হবে রাতে। বাসুদেব  তাঁকে অনুরোধ  করল যে শহরে তাকে কারখানায় রাখার  জন্য কারণ রাতে সেই কাঠগোলায় থাকতে হলে সুবীরবাবুর বাড়িতে  সে কখন  কাজ করবে?  মন তার ভীষণ খারাপ । যারা তাকে এতদিন  আশ্রয় দিয়েছে , দুর্দিনের মধ্যে ও তার খাওয়া পড়া নিয়ে  কিছু বলেন নি,  তাদের  এই বিপদের দিনে সে ছেড়ে চলে যাবে এটা সে কিছুতেই মন থেকে  মেনে নিতে  পারছে না। বাড়ি ফিরে  এল সে। মা তো বুঝতে পারছেন যে কিছু একটা হয়েছে বাসুদেবের কিন্তু কি হয়েছে সেটা বুঝতে  পারছেন না। শেষে মায়ের  কাছে  কাঁদতে কাঁদতে সত্যি কি হয়েছে সেটা বলল। সুবীরবাবু পাশ থেকে  সব শুনতে পেয়েছেন এবং  দুঃখ  পাওয়া সত্ত্বেও তাকে উৎসাহিত করলেন কাজটা নেওয়ার জন্য। পরদিনই বাসুদেব নিজের  কিছু জামা টা পড় ও খানিকটা চাল ডাল ও কিছু দরকারি জিনিস  নিয়ে চলে গেল  কাজে যোগ দিতে, বেশীরভাগ জিনিস ই রইল পড়ে। যাবার আগে বাবা মাকে প্রণাম করে ভাইকে কাঁধে তুলে নাচানাচি করে জলভরা চোখে চলে গেল পল্টনবাবুর  কাঠগোলায় । টালির ছাউনি কাঠগোলায় । বাঁশের বেড়া দিয়ে দরজা, ঐদিকে মেসিনগুলো আর একদিকের কোণে একটা চাটাই,  সতরঞ্চি, মশারি ও চাদর। দিনের  বেলায়  মেশিন চলত, অনেক লোক কাজ করছে, গমগম করছে জায়গাটা কিন্তু সন্ধে নামতেই অন্য সব লোক জন চলে গেল কর থাকল ও একা। জঙ্গলের মধ্যেই মেশিন ঘরের দিকে ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে আর নিজে যেখানে  থাকবে সেখানেও একটা টিমটিমে বালব জ্বলছে আর আছে এক কেরোসিনের লন্ঠন যেটা কারেন্ট চলে গেলে কাজে লাগে। বেশীরভাগ সময়েই রাতে নাকি কারেন্ট থাকেনা আর সেই কারণেই নাকি লণ্ঠনের উপযোগিতা অনিবার্য। এই জঙ্গলের মাঝে একা থাকা বেশ কঠিন  ব্যাপার । জন্তু জানোয়ার ছাড়াও  বিষাক্ত সাপ খোপ তো থাকতেই পারে। কিন্তু বাসুদেবের  কোন ভয়ডর বলে কোন জিনিস  নেই । নিজের শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত এবং  সাহস ও ছিল অদম্য। একটা বেশ শক্ত বাঁশের  লাঠি আর আছে একটা ছোরা আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন ই প্রথম রাত,কিছুতেই ঘুম আসছেনা , কেবল ই মায়ের, বাবার ও ছোট ভাইয়ের  কথা ভাবছে। কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে লেগে এসেছে খেয়াল  নেই। রোদ বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখের ওপর পড়তে ঘুম ভাঙল। একটু দূরেই একটা ছোট ঘর চোখে পড়ল, সম্ভবত সেটাই বাথরুম । একটা ছোট টিউব ওয়েল রয়েছে  তার ই পাশে। প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান সেরে উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে সকালের খাবার  তৈরী করে ফেলল সে। একবার  মেশিন চালু হলে আর অন্য দিকে  তাকাবার সময় পাবে না সে। আগে যে লোকটা ছিল সে বাড়ি গেছিল কয়েকদিনের জন্য কিন্তু  তার পরে সে আর আসে নি । আদৌ আসবে কিনা তাও  জানা নেই । সুতরাং, পল্টনবাবুকে একটা লোক রাখতেই হতো। উনি ভাবছিলেন ও সেইরকম ই আর তারই মাঝে বাসুদেবের আগমন এবং  তার চাকরি । কাঠগোলায়  একটা পুরনো ঝরঝরে সাইকেল আছে।বাসুদেব দেখে নিল যে ওটাকে কি ভাবে কাজে লাগানো  যায় । সাইকেল টাকে ঝেড়ে মুছে রাখল কিন্তু চাকায় হাওয়া নেই।  বেশ খানিকটা দূরে  একটা সাইকেল রিক্সা সারানোর দোকান  আছে, যেখান থেকে ও সাইকেল টা সারিয়ে নিল। সারাদিন কাজ করে পরেরদিন সাইকেল  নিয়ে  সাতসকালে বাবা মা ভাইয়ের  সঙ্গে দেখা করতে আসা। অত সকালে মা বাসুদেবকে দেখেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর দুশ্চিন্তায় মন ভরে গেল । হ্যাঁ রে কেমন আছিস বাবা? একটা দিন তোকে দেখিনি  কিন্তু মনে হচ্ছে  কতদিন তোকে দেখিনি ।সুবীরবাবু ও ইতিমধ্যে হাজির,  ভাই ও এসেছে দাদাকে দেখতে। মা চট করে একটু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে কয়েকটা রুটি করে দিয়েছে। চা ,জলখাবার  খেয়ে তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে  কাঠগোলায়  ফিরে আসা । দৈবাত কেউ এসে যদি পড়ে এবং  কাঠগোলায় ঢুকতে না পারে তাহলে তো ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে এবং চাকরিটাও চলে যাবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। যাই হোক,  কোন বিপত্তি ঘটেনি। কোন লোক আসার আগেই  সে ফিরে এসেছে এবং  কাজ ও সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে । প্রায় রোজই বাসুদেব  সাইকেল নিয়ে চলে আসে এবং  চা ও জলখাবার খেয়ে কাজে চলে যায়। মাস শেষ হলো। আজ মাইনে দেবেন পল্টনবাবু। সবাই খুব  খুশী র মেজাজে। টাকা পেয়ে সবাই খুব খুশী  কিন্তু বাসুদেবের আনন্দের  কোন সীমা নেই কারণ এটাই তার প্রথম রোজগার । সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে। মা অত সকালে  বাসুদেবকে দেখে চমকে উঠেছেন। হ্যাঁ রে শরীর ঠিক আছে তো রে? 
হ্যাঁ মা, ঠিক আছি, ভাল ই আছি। বলে মাকে প্রণাম  করে প্যান্টের পকেট থেকে  মাইনের সব টাকা মায়ের  পায়ের কাছে  রেখে দিল। মায়ের  চোখে জল, উনি কিছুতেই নেবেন না।সুবীরবাবু ও এসে পড়েছেন। তাকেও প্রণাম করল বাসুদেব । ভাই অকাতরে ঘুমোচ্ছে।  বাসুদেব কাঁদছে আর বলছে মা তুমি যদি টাকা না নাও তাহলে আমি বুঝব যে তোমরা আমাকে ছেলের মতো ভালবাসনি। আজকে আমি যেখানেই  থাকি না কেন  তা তোমার   বাবার এবং কাকাবাবুর জন্য। আমাকে তোমরা দূরে সরিয়ে  দিওনা।  যথারীতি চা ও জলখাবার  খেয়ে কাঠগোলার দিকে রওনা দিল। দেখতে দেখতে তিনটে মাস কেটে গেছে বাসুদেবের  ঐ কাঠগোলায় । আর এদিকে ফিরে  এসেছে  সেই আগের  লোক যে বাড়ি গিয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়েছিল। পল্টন বাবু একটু ধন্দের মধ্যে পড়ে গেছেন । পুরনো লোকটাকে রাখতে গেলে বাসুদেবকে  ছাড়িয়ে দিতে হয়। আর বাসুদেব এই তিন মাস যেভাবে কাজ করেছে তাকেও হাত ছাড়া করতে চাইছেন না। সমাধান  বেরোল সবচেয়ে  পুরনো  মিস্ত্রীর পরামর্শে। বহাল হলো পুরনো লোক কাঠগোলায় আর বাসুদেবের স্থান হলো ফার্নিচার দোকান  সংলগ্ন কারখানায় আর সঙ্গে বাড়ল মাইনেও। 
বাসুদেব  এখন সুবীরবাবুর বাড়িতে মা ও ভাইয়ের  সঙ্গে। সুবীরবাবুর কাছে যারা ধারে মাল নিয়েছিল  তারাও অনেকে টাকা ফেরত দেওয়ায়  অবস্থার অনেক  উন্নতি হয়েছে । সৎ পথে থাকলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভগবান তাদের  শান্তি দেন ।

Wednesday, 6 November 2024

বন্ধন

বন্ধন কি, কেন আসে, কোথা থেকে আসে এইসব নানাধরণের  চিন্তা য় মাথাটা কেমন ভার হয়ে গেল । বন্ধন তো ভালবাসার ই আর একটা রূপ। রক্তের সম্পর্ক থাকতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । অনেক সময়ই দেখা যায়  যে সম্পূর্ণ একজন অজানা ব্যক্তির প্রতি তীব্র আকর্ষণ আবার  কোন রক্তের সম্পর্কের প্রতি  একেবারেই ভ্রূক্ষেপহীন। সব সময় যে কোন ব্যক্তি ই হতে হবে এমন কোন  কথা নেই, কোন প্রাণীর প্রতিও হতে পারে। সুতরাং,  সংক্ষেপে বলা যায় যে ভালবাসা না থাকলে বন্ধন আসতে পারেনা। ডাক্তারি শাস্ত্রে বলে অক্সিটোসিন ভালবাসার উৎস। এটা না থাকলে ভালবাসা ভুলেও আসবে না। সুতরাং যে সংসারে একটু খুটোখুটি চলছে সেখানে ডাক্তার বাবুরা একবার ভেবে দেখতে পারেন  যে বিবদমান  ব্যক্তিদের মধ্যে কোনভাবে এটা সঞ্চার করা যায়না কিনা।
অনেকদিন ধরেই নাতি নাতনিরা আবদার করছে ওদের সঙ্গে  কিছুদিন  কাটিয়ে যাওয়ার কিন্তু নানা কারণে  তা আর হয়ে উঠছে না। এবার  কিন্তু আর ছাড় পাওয়া গেলনা। ছেলে টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে,  আর বারবার তাদের অনুরোধ  ফেলাও যাচ্ছে না। ভাইফোঁটার দিন  সন্ধের ফ্লাইটে রওনা  দেওয়া হলো। দুজনের ই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে সুবিধা ও আছে আবার  অসুবিধা ও রয়েছে । মালপত্রের সঙ্গে নিজেদেরকেও একটা লাগেজের( মাল বলতে একটু লজ্জ্বা লাগল) মতন মনে হতে লাগল। দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায় তবে অনেকটা  রাস্তা  চলতে হবে।এ ছাড়াও রয়েছে  চেক ইন করা, সিকিওরিটি চেক করার সময় মোবাইল,  মানি ব্যাগ মায় কোমরের বেল্টটা পর্যন্ত খুলে এক্সরে মেশিনে চেক করানো এক ভীষণ ঝামেলার ব্যাপার  যেটা সামলে দেয় ঐ হুইল চেয়ার  বাহকেরা। নিজেরা বোকার মতো হুইল চেয়ারে বসে সবকিছুই লক্ষ্য  করা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সিকিওরিটির লোকজন একটু করুণার সঙ্গে ব্যবহার করে এটা ভাবলেই কেমন ভেতরে ভেতরে  কুঁকড়ে যেতে হয়। যাই হোক,  হুইল চেয়ারে বসলে লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের টাটা বাই বাই করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে  যাওয়া। হাতে যে ব্যাগটা যাবে তাকে কোলের ওপর বসিয়ে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে অসহায়ভাবে বসে থাকা । একা থাকলে খুবই বিশ্রী লাগত কিন্তু দুজনে থাকায় একটু কম হয়েছিল অস্বস্তি। কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় একেবারে শেষে হুইল চেয়ারের যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া মানে প্রায় দুঘন্টার বেশী সময়  ধরে ঐ বাঁধা ছাঁদা  অবস্থায় বসে থাকা কোন সুখকর পরিস্থিতি  নয়। এয়ারোব্রিজ হলে গড়গড়িয়ে প্লেনের দরজা অবধি পৌঁছে যাওয়া যায় কিন্তু বাসে করে গিয়ে তারপর সিঁড়ি দিয়ে একটা প্রায় আশি কেজির জ্যান্ত লাগেজকে ওঠানো সেটা খুব সহজ সাধ্য নয়। কিন্তু ঐ অবস্থায় চেয়ার থেকে নেমে আমি চলে যেতে  পারব বলাটাও নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এয়ারলাইন্সের  নিয়ম অনুযায়ী ঐ হুইল চেয়ার বাহকদের কিছু টাকা পয়সা দেওয়া বারণ। ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের কাছে কিছু টাকা নেওয়া  উচিত আর সেক্ষেত্রে  নিজেদের  অপরাধ বোধে ভুগতে হয়না। যাই হোক দুঘন্টা ধরে  বোর্ডিং গেটের সামনে বসে নানা ধরণের যাত্রীদের নানারকম ব্যবহার লক্ষ্য করা সেটাও একটা বিরাট ব্যাপার । ভিনদেশী একটা ছোট্ট শিশু নিজের  মনে গান করে চলেছে, ভাষাটা বুঝতে না পারলেও সুরেলা মিষ্টি সুর সব বাধা অতিক্রম করে মনে যথেষ্ট আনন্দের  সঞ্চার করছে। একে একে সবাই চলে গেল নিজেদের গন্তব্যস্হলের প্লেনের  দিকে, চলে গেল সেই মিষ্টি বাচ্চাটাও।  বোর্ডিংয়ের সময়ে একটা জিনিস নজরে এল। প্রায়োরিটি বোর্ডিং বলে একটা কথা কানে এল। যারা বিজনেস ক্লাস বা এক্সিকিউটিভ ক্লাস বা  প্রিমিয়ার ইকনমি  ক্লাসের যাত্রী তারা একটু আগে যাবেন । একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের টিকিটধারী তাদের সঙ্গে একসাথে  যেতে পারবেন না। কথাটা কানে গেল যখন একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের যাত্রী হয়তো ঠিকমতন না শুনেই ঐ প্রায়োরিটি বোর্ডিং এর যাত্রীদের সঙ্গে যেতে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে যেতে দেওয়া হলোনা এবং বলেও দেওয়া হলো। ব্যাপার টা হচ্ছে  ফেল কড়ি মাখো তেল।    
এরপর ই শুরু হলো আমাদের  বোর্ডিং। সবশেষে আমরা চারজন হুইল চেয়ারের যাত্রী। 

নাতি নাতনিদের কাছে বলা হয়নি যে আমরা তাদের  সঙ্গে কদিন কাটাতে আসছি। হঠাৎই এসে তাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য । কিন্তু বাচ্চারা  ভীষণ বুদ্ধিমান । তারা ঠিক জেগে বসে আছে। আট বছরের মিশু আর সাড়ে চার বছরের লিও, ওরাই আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটা বানচাল করে দিল যারা নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে তারাই সাড়ে এগারটা অবধি জেগে আমাদের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল। বুড়ো বয়সের সমস্যা হলো যে একজায়গায় যেখানে  ওঁরা থাকেন সেইখানে ই তাঁরা খুব স্বচ্ছন্দে  থাকেন এবং বাইরে বেড়াতে গেলেও দুচারদিনের বেশী থাকতে চাননা । যদিও মিশু এবং লিওর খুব ব্যস্ত শিডিউল কিন্তু তাদের ওর ই মধ্যে অন্ধকার রাতে বিদ্যুত ঝলকের মতো উপস্থিতি আমাদের মতো বুড়োবুড়িদের শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ভালবাসা আরও কিছুদিন বাঁচার তাগিদ বাড়িয়ে দেয়।

Monday, 28 October 2024

বুদ্ধিজীবি

বুদ্ধিজীবির সংজ্ঞা বেশ কঠিন বলেই মনে  হয় আমার কাছে । খুব বেশি বুদ্ধি মগজে নেই বলে কোনরকমে একটা কাজ জুটিয়ে সারা জীবন ঐখানেই কেটে গেছে । আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব বুদ্ধিদীপ্ত ও ঝকঝকে । তারা বেশ মাথা খাটিয়ে কোন এক  সংস্থায় বছর দুয়েক কাটিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায় আরেক সংস্থায়, মাইনেও বেড়ে যায় তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ -- যার যেমন বারগেন করার ক্ষমতা তার উপর । কয়েক বছরের মধ্যেই  একটা কোম্পানির কেউকেটা। তারা কাজটাকে ভালবাসে কোম্পানিকে নয়। তারা কি বুদ্ধিজীবি নয়?  কিছু লোক সংস্থায় ঢোকা ইস্তক রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত  সব কাজ ঠিকঠাক করে পরবর্তী যে লোক এসেছে তার জায়গায় তাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়েও তার শান্তি নেই । একটু কিছু অসুবিধা হলেই তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন বা অনেক  সময়েই তাঁকে অফিসে আসতে বলেন। ইনি তো কখনোই  বুদ্ধিজীবি নন, তবে কি ইনি  বোকা ? না, ইনি বোকা নন, ইনি একজন  ভাল মানুষ যিনি তাঁর জীবনের সেরা সময় তাঁর সংস্থাকে দিয়েছেন এবং অনেক  সময়ই  পরিবারকে বঞ্চিত করে কোম্পানির জন্য প্রাণপাত করেছেন । বিনিময়ে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কাজটা গুছিয়ে নিয়েছেন এবং বাহবা কুড়িয়েছেন। তবে এই কর্তাব্যক্তিরা কি বুদ্ধিজীবি? অবশ্যই । যারাই নিজের  মাথা খাটিয়ে অন্যদের  মাথায়  কাঁঠাল ভেঙ্গে নিজের  কার্যসিদ্ধি করেছেন  তিনি  তো বুদ্ধিজীবি বটেই। কিন্তু ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত  ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে এদের একাসনে ফেলাটা ঠিক হবেনা । 

আজকের দিনে  বুদ্ধিজীবি বললে কেমন একটা তির্যক  শব্দ বলেই মনে হয়। কেউ হয়তো লেখক বা  কোন শিল্পী( চিত্রকর বা সঙ্গীত বা নাট্যকলায় পারদর্শী) যখন প্রয়োজন মতো নিজের অবস্থান বদল করতে পারেন তখন তিনিই বুদ্ধিজীবি বলেই গণ্য হন। অবশ্যই এই শিল্পীরা নিজেদের চোখ কান খোলা রেখে কোনদিকে বাতাস বইছে সেটা বুঝতে পারেন এবং সেই মতন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এঁদের নানা রঙের জামা আছে এবং সময় মতন এঁরা জামা বদল করেন এবং বলেন আমি তোমাদের ই লোক যদিও নিজের  সুবিধা ছাড়া আর  কিছুই  বোঝেন না এঁরা। 
সুমিত আজকাল একটু লেখালেখি করছে এবং  পাঠকমহলে ওর লেখা বেশ নজর কেড়েছে । বাচ্চাদের জন্য লেখা ছড়া গ্রাম ও মফস্বলে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। শহরে বাচ্চারা একটু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্যই  হোক বা একটু বেশি চালাক চতুর হবার জন্যই হোক ছড়ার দিকে নজর দেয়না। নানারকম লেখা যেমন ছোটগল্প, উপন্যাসেও বেশ ভালরকম প্রশংসা পেয়েছে। অনেক জায়গা থেকে প্রধান অতিথি হবার আমন্ত্রণ পাচ্ছে। সেদিন বই মেলায়  তো ওকে দেখে  বেশ ভীড় জমে গেল অনেকেই ওর অটোগ্রাফ  নিতে চাইছিল। দেখে বেশ ভাল লাগছিল কারণ প্রথম দিকে ও আমাকে পড়তে দিত ওর লেখাগুলো। উৎসাহ  ওকে দিয়েছি এবং  ধীরে ধীরে ওর লেখা  আরও  পরিণত হয়েছে। সেই জন্য ওর সাফল্যে নিজেকে রামচন্দ্রের  সেতু বন্ধনে কাঠবিড়ালির মতন মনে হচ্ছিল । কিন্তু ওকে কেউ বুদ্ধিজীবি বললে ও খুবই রেগে যেত। একদিন ওকে বললাম, " তুমি এত রেগে যাও কেন?"
ও রাগ না কমিয়ে বলল যে ও একটা নীতি মেনে চলে যা সরকারী নীতির পরিপন্থী। অতএব ও বুদ্ধিজীবি বলে ছাপ নিতে রাজি নয়।"
সত্যিই তো এঁদের  অনেকেই  একসময় তাঁদের লেখা ও গানে বা অন্যশিল্পকলায়  তাঁদের  ছাপ রেখেছেন এবং অনেক লোককে উদ্বুদ্ধ করেছেন, হঠাৎই  কিছু স্বীকৃতির বিনিময়ে বা কিছু  সুবিধার বিনিময়ে কেন তাঁরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছেন এটা বোধগম্য হয়না। তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে আপনারা স্বকীয়তায়  ভাস্বর, আপনারা সেই মহিমায় বিরাজ করুন,  কেউ যেন আপনাদের  এইভাবে কলঙ্কিত করতে না পারে ।

Monday, 14 October 2024

সাবেকি দু্র্গাপূজো বনাম থিম পূজো

এখন শহর ও শহরতলীতে থিম পূজোর ঘনঘটা যা ধীরে ধীরে  গ্রাস করছে গ্রামের মানুষকেও। সাবেকি পূজো শহরাঞ্চলে খুব  কম জায়গায়ই  হচ্ছে আজকাল । বাঙালি আগে প্রতিদিন মানে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে অঞ্জলি দিত। পূজো মানেই হৈ হৈ, যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর সময় নিজের  কোটরে এসে হাজির। হাতে হাত লাগিয়ে রাত জেগে পূজো মণ্ডপ করা, নিজেদের  মধ্যেই  যাদের  শৈল্পিক ধারণা আছে তারাই প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরী করা এবং মৃৎশিল্পীদের কারখানা বাড়ি থেকে প্রতিমা আনা সব ই নিজেরাই করত যার ফলে পূজোর প্রতি পদক্ষেপে পাড়ার ছেলেদের ঘাম লেগে থাকতো এবং আনন্দটাও ছিল অবর্ণনীয় । আস্তে আস্তে পাড়ার ছবিটা  বদলে গেছে। একটা জমির উপর একটা বাড়ির জায়গা দখল করেছে বহুতল বাড়ি যেখানে  অনেক পরিবার  একসঙ্গে থাকলেও সম্পর্কের আঠা তেমনভাবে লাগেনি যার নীট ফল বাড়ির কেউ অসুস্থ  হলে  বা মারা গেলে কোন সংস্থাকে খবর দিতে  হয় যেটা আগে ভাবাই যেত না। তখন কি তাহলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার অনেক  লোক ছিল ? হয়তো খানিকটা  তাই। প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলে মেয়ে  ছিল। দু একটা ছেলেপিলে যারা লেখা পড়ার ধার সেরকম ভাবে মাড়াতো না তারাই এই পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যারা খুবই ভাল  পড়াশোনায়  তারা এগিয়ে  না এলেও মধ্য মেধার ছেলেমেয়েরাও যোগ দিত। এক কথায় পাড়া থেকেই সবাই এগিয়ে আসত এবং যে কোন  সমস্যার সমাধান পাড়ার  লোকজন সামলে দিত। ধীরে ধীরে  চারদিন অঞ্জলির বদলে অষ্টমী ও দশমীতে অঞ্জলি দেওয়া ঠিক হলো। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার  সময়ই ভীড় সামাল দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার ছিল। প্রথমে বুড়োবুড়িদের অঞ্জলি দেওয়া,  তারপর মাঝ বয়সী এবং  সবশেষে চেটো চ্যাংড়াদের । এই সময়টাতে অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে একটু চোখাচোখি বা একঝলক মিষ্টি হাসির মধ্যে মন্ত্র পড়া এবং  ফুল ছোঁড়ার সময় কোন  নির্দিষ্টের গায়ে বা মাথায় ফুলের আঘাত। দশমীতে অঞ্জলি দেওয়ার পর অপরাজিতার ডাল হাতে বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মা, মাসি বা কাকি, পিসিরাও এটাতে একটু উৎসাহ  যোগাতেন, হয়তো বা নিজেদের  পুরনো দিনের  কথা ভেবে । অবশ্যই এটা খুব  একটা দোষের নয় কারণ সব বাবা মা ই চায় যে তার মেয়ের  একটা ভাল  ছেলের  সঙ্গে  বিয়ে হোক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ই এটা ঠিক  না হলেও দু চারটে যে পরিণতি পেতনা  তা নয়। যাই হোক,  পূজো নিয়ে একটা বিরাট  হৈচৈ হতো এবং  সেটা সাবেকি পূজোয়।
 এখন এসেছে থিমের পূজো । কোন শিল্পী কোন বিশেষ  জায়গার আদলে মণ্ডপ বানিয়ে তাঁর শৈল্পিক  ধারণা  বাস্তবায়িত করেন এবং অনেক সময়ে ও অর্থ ব্যয়ে  এবং  যথেষ্ট উঁচু মানের হয় কিন্তু প্রতিমা দর্শন করে ভক্তি রসে উদ্বেলিত হয়ে মনে মনে  মা মাগো বলে ডাকটা আসেনা। আবছা আলো আঁধারিতে মা সেখানে গৌণ এবং  মণ্ডপ সজ্জা মুখ্য। সেখানে প্রবেশের জন্য কাউকে ধরা ধরি করে পাস যোগাড় করতে হয়ে। এই পাসের ও আছে রকমফের। সাদাসিধে পাস, ভি আই পি পাস আবার ভি ভি আই পি পাস। যার যেমন  ওজন তিনি তেমন পাসের অধিকারী। সুতরাং এখানে মণ্ডপসজ্জাই হচ্ছে মুখ্য। তা, এত কৃতিত্বের অধিকারী যাঁরা তাঁদের  শিল্পকীর্তি এক বিশাল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা সরকারী বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  করা যায়না এবং  তাঁদের  যথাযথভাবে সম্মানিত করা যায়না? এতে প্রচুর  লোকের  কর্মসংস্থান হবে এবং  শিল্পীরাও তাঁদের যথাযথ সম্মান পেতে পারেন কিন্তু যে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে সেই ভক্তিরস না আসে সেইরকম ঠাকুর  করার কি দরকার?  এটা না হাঁস না সজারু হয়ে গেল  হাঁসজারু । একটু ভেবে দেখার অনুরোধ  কি রাখতে পারি? 

Sunday, 13 October 2024

গুপ্তিপাড়ার ভ্যাবল

ভ্যাবল আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু না হলেও নয় নয় করে পঞ্চাশ বছর মনের খুব কাছাকাছি ছিল। পড়াশোনা শেষ করেই টগবগে তারুণ্যে ভরপুর আমরা একই সংস্থায় যোগ দিয়ে খুব কাছাকাছি চলে এলাম । পঞ্চাশ বছর নিতান্ত কম সময় নয় , এর মধ্যে নানারকম অবস্থায় কেটে গেছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি কর্মসূত্রে কিন্তু বন্ধুত্বের যে সূক্ষ্ম তার, তাতে কোন সময়ই মরচে পড়েনি বা ছিন্ন হয়নি। রয়েছি দুজন দুই প্রান্তে, হঠাৎই মোবাইলের রিংটোনে দুজনে পড়লাম বাঁধা। মোবাইল ধরতেই সেই চেনাগলায় ভেসে এল, "শোন,একটা গান তুললাম।গানটা শুনে কেমন লাগল বলবে।"  গান শুরু হলো, দরাজ গলায় গান, সকাল টা বেশ ভাল ভাবেই শুরু হলো । চলল পুরনো দিনের  কথা, মাঝে মাঝেই কিছু খিস্তি, গালাগালি আর তার পরেই  হা হা করে হাসি যা থামতেই  চায়না। ঘন্টা দেড়েক সময় যে কোথা দিয়ে  চলে গেল বুঝতেই পারলাম না।
এই ছিল ভ্যাবল যার ছোটবেলা কেটেছে গুপ্তিপাড়ায় । সবচেয়ে ছোট ভ্যাবল ছোটবেলাতেই  মা কে হারিয়ে বাবার কাছে মা ও বাবার দুজনের আদর একসঙ্গে পেয়েছে। তখন ও থাকে উত্তরপাড়ার ভদ্রকালীতে আর আমি থাকি পিসিমার  বাড়ি লিলুয়ায়।একটা রবিবার  ও আমাকে নিমন্ত্রন করল দুপুর বেলায় খাবার জন্য। লিলুয়া থেকে বালিখাল
৫৪ নম্বর বাসে গিয়ে ওখান থেকে  বাস বদলে পৌঁছে গেলাম  ভদ্রকালী । বাস স্টপেই দাঁড়ানো ভ্যাবল নিয়ে গেল তার বাড়ি। ওর বাবা ই রান্না করেছিলেন ইলিশ মাছ,  অসাধারণ রান্না। সারা দুপুর  তিনজন মিলে কত গল্প  এবং তারপর ফিরে আসা। প্রথম আলাপের কয়েকদিন পরে লাঞ্চ রুমে  ওর দরাজ গলায়  গান  শুনে ওকে বললাম  গান শেখার কথা। একদিন অফিস শেষে ও চলে গেল এলগিন রোডের  মুখে ডায়োশেসন স্কুলের উল্টোদিকে  থাকা স্কুল  সৌরভে যেখানে  প্রবাদ প্রতিম পণ্ডিত  জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ  শেখাতেন। ও কিন্তু কোনরকম দ্বিধা না করে সোজা চলে গেল ভিতরে এবং  জিজ্ঞেস করায় ও বলল আমি সেরা লোকের  কাছে  গান  শিখতে চাই। যে কোনদিন গান  করেনি সে যদি এই ধরণের কথা বলে তাহলে বুঝতে হয় তার প্রত্যয় কতটা। যাই হোক  একজন  বিশিষ্ট শিল্পী শ্রীমতি স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায় ওকে জিজ্ঞেস করলেন যে আগে কোনদিন  ও কারও কাছে  শিখেছে কি না। ও সরাসরি জানালো যে "না"।উনি তখন বললেন  যে তুমি একটা গান করতে পারবে?  ও সম্মতি জানিয়েই " আমার  আপনার  চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়" গানটা ওর নিজস্ব ভঙ্গীমায় গাইল আর স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায়  তো ওর গলা শুনে স্তম্ভিত । উনি জানালেন  যে ভ্যাবলকে উনি গান শেখাবেন। চলল কিছুদিন  এইভাবেই এবং স্ববভাবতই গলাও হলো অনেক  পরিশীলিত।
অনেকবার আমাকে এবং  চৌধুরীকে নিয়ে যেতে চেয়েছে তার গ্রামের বাড়ি গুপ্তিপাড়ায়  কিন্তু কোন না কোন  কারণে যাওয়া হয়ে  ওঠেনি।
অনেকদিন পরে আমাদের  অর্জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের উদ্যোগে মহাষ্টমীর দিন  হুগলী সফরের টিকিট কাটল। আমাদের দলটাও  গেছে ভেঙে। কেউ শারীরিক কারণে, কেউ বা বিদেশে আবার কেউ  বা পরিবারের কোন  সদস্যের অসুস্থতার জন্য অনুপস্থিত । বাকি রইল অর্জুন আর সহদেব এবং তাদের  পরিবার মানে মোট চার জন। ভোর ছটায়  উপস্থিতি, সুতরাং ঠিক পাঁচটায় রওনা দিয়ে পৌনে ছটায় রবীন্দ্র সদন পৌঁছে গেলাম ,মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা যখন কবির জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে নামী শিল্পীদের গান শুনতে আসতাম।এখন বহুদিন পর এসেছি যখন রবীন্দ্র সদন  তার গৌরব অনেকটাই হারিয়েছে নন্দনের কাছে।ঐসময়ে ছিলনা নন্দন যার ফলে আমাদের কাছে রবীন্দ্র সদন ই ছিল প্রথম প্রেমের মতো মিষ্টি।আতিথেয়তায়  কোন  ত্রুটি নেই,  যাওয়া মাত্র ই চা, বিস্কুটের আপ্যায়ন আমাদের মতো হাজির হওয়া গুটিকতক লোকের  কাছে। পাশেই একটা বড় ভলভো বাস দাঁড়িয়ে আছে আমাদের  হুগলী সফরের জন্য কিন্তু এখনও বহু মানুষের আসা বাকি। সুতরাং ঠিক সময়ে যে বাস ছাড়বে না এটা নিশ্চিত । সদন প্রাঙ্গনে ছাতিম গাছটা  ফুলে ভরে গেছে  আর একটা মিষ্টি গন্ধের রেশ আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশেই একটা বড় বট গাছ। মোবাইল ক্যামেরা তার দিকে তাক করতেই একটা দারুণ সুন্দর  জিনিস চোখে পড়ল। জুম করতেই দেখি বটগাছের ফুল । জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই জিনিসটা পড়ল চোখে।  ধরে রাখলাম ক্যামেরায় । একটু বিরক্ত ই বোধ করছিলাম সময়ানুবর্তীতা না থাকায় কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য্য  ভুলিয়ে দিল। বাস যাত্রা শুরু করল ঠিক সাতটা বেজে পাঁচ মিনিটে । বিদ্যাসাগর সেতু ধরে বাস চলতে লাগল শ্রীরামপুরের দিকে। ওঠা মাত্র ই একটা বেশ বড়সড় বাক্সে সফরের প্রথম উপহার উদ্যোক্তাদের  তরফ থেকে এবং  সঙ্গে একটা জলের বোতল। আমাদের বিরক্তি উদ্যোক্তাদের আতিথেয়তায় দূর হয়ে গেল । খাবারের গুণমান যথেষ্ট ভাল । অনেক জিনিস আছে, সামান্য কিছু খেয়েই বাক্স বন্ধ করে উপরে রাখা হলো। খানিকক্ষণ পরেই পৌঁছে গেলাম একসময় ওলন্দাজ উপনিবেশ শ্রীরামপুর । মনে পড়ে গেল উইলিয়াম কেরী, জোসুয়া মার্সম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের কথা যাঁরা অগ্রনী ছিলেন খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার এর  সঙ্গে এদেশে শিক্ষা প্রসারে । ১৮০০ সালে ১০ই জানুয়ারী  তাঁদের  প্রেস থেকে বেরোয়  সমাচার দর্পণ। সেই ঐতিহাসিক বিরাট হলে বসার ব্যবস্থা । একটু হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে চা খেয়ে টোটোয় চড়ে শহর পরিক্রমা। বাবা একসময় শ্রীরামপুর কলেজে পড়েছিলেন; সুতরাং  কলেজটা না দেখলে মনে আক্ষেপ থেকে যেত। গাইড মশায়ের অনুমতি নিয়ে  কলেজটা দেখে এলাম। গঙ্গার ধারে বহু পুরনো শহর, আধুনিকতার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। কলেজের গেট বন্ধ থাকায় ভিতরে যাওয়া হলো না, বাইরে থেকেই এক ঝলক চোখের দেখা আর  মনে করার চেষ্টা  যে এখানেই বাবা, মিঠালাল কাকারা( বাবার মুখে শোনা) পড়তেন । চলে এলাম রাজবাড়ির পূজো দেখতে। রাজবাড়ির  সেই জাঁকজমক আর  নেই, তারাও আমাদের মতন ই ছাপোষা হয়ে গেছেন কিন্তু  তবুও রাজবাড়ি  বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাথায় মুকুট কোমরে ঝোলানো  তলোয়ার আর মণিমানিক্য  খচিত রাজপোষাক। দালানের স্তম্ভগুলো এখনও  যেন বুক  ফুলিয়ে বলে আমরা আছি। ওখান থেকে  যাওয়া  হলো শতাব্দী প্রাচীন  গোস্বামী বাড়ির  পূজোয়। ওখানে আমাদের  অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল  যার ফলে আমরাও খুব খুশী হয়েছিলাম। এর পর যাওয়া হলো শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পূজো দেখতে। এখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ডায়মণ্ড হারবারের দিকে এক প্রাচীন  বাড়ির  পূজো  দেখতে  গিয়ে একটু  অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বলি দেওয়া হয়। কোনরকমে অন্যদিকে পালিয়ে গিয়ে ঐ দৃশ্য থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম । এরপর আমাদের  গন্তব্যস্থল বাঁশবেড়িয়ার  হংসেশ্বরী মন্দির । দারুণ  সুন্দর  মন্দিরটির  রক্ষণাবেক্ষণের ভার সরকার নেওয়ায় একটু উন্নতি চোখে পড়ল কারণ উপযুক্ত দেবোত্তর  সম্পত্তি এবং ট্রাস্ট না থাকলে এই পুরনো দিনের  পূজোগুলো ধীরে ধীরে  অবলুপ্ত হয়ে যাবে। সরকারের ক্লাবগুলোতে অনুদান  বন্ধ রেখে এটা ভেবে দেখতে পারে তবে ক্লাবগুলোতে অনুদান দেওয়া  মানে ভোটের সময় তাদের হয়ে প্রচার  করা এবং  ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটানো। এরপর যাত্রা শুরু  গুপ্তিপাড়ার পথে। খানিকক্ষণ চলার পর এলাম সেখানে। এসে পৌঁছলাম  বৃন্দাবনচন্দ্র মঠে। এখানে চারটে মন্দির আছে। বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির  আটচালার কিন্তু  রামচন্দ্র মন্দির  একচালার। পোড়ামাটির  কাজ দেখার  মতন। এই মঠের চতুর্থ  মন্দির চৈতন্যদেবের  মন্দির সবচেয়ে  পুরনো । মনটা ভরে গেল এক অপূর্ব পবিত্রতায় । ওখান থেকে হাটখোলা পাড়ায় সেনবাড়ির শতাব্দী প্রাচীন দুর্গা পুজো দেখা হলো।সেনবাড়িতে একটা  অদ্ভূত জিনিস  চোখে  পড়ল ঝুলন্ত অবস্থায়। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে ওটা না কি তিমি মাছের শিরদাঁড়া । বহুদিন আগে তাঁদের  পূর্বজরা না কি ঐ মাছ শিকার করেছিলেন এবং  তাঁদের  শৌর্যের  প্রতীক হিসেবে তিনি দালানে ঝুলছেন। এবার দুপুর বেলায় খাবার ব্যবস্থা । যেমন খাবারের  গুণমান তেমন ই সুস্বাদু রান্না । সর্বোপরি আতিথেয়তা অতুলনীয় । খাওয়া দাওয়ার পর একটু দূ্রেই তেলিপাড়ায় কনকদূর্গার মন্দির দর্শন করে ফেরার পালা।
গুপ্তিপাড়ায় খোঁজ করলাম  কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার যাঁরা ঐ মাস্টারমশাই বা ভ্যাবল সম্বন্ধে কোনও  খবর দিতে পারেন । কিন্তু  না, পেলাম না ঐ অল্প সময়ের মধ্যে । ভ্যাবল আমাদের  ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে  না ফেরার  দেশে দুবছর আগে চৌঠা জুন কিন্তু রেখে গেছে তার গুপ্তিপাড়াকে। মনটা খুব খারাপ  হয়ে গেল  এই ভেবে  যে কতবার হাজার অনুরোধেও তার শৈশবের গ্রামে  আসতে  পারিনি  আর আজ যখন  এলাম তখন  গুপ্তিপাড়া ভ্যাবলশূন্য। আমার জানা ছিলনা যে এরা গুপ্তিপাড়ায় আসবে,  জানতে পারলে  হয়তো আসতাম না।

Thursday, 25 July 2024

চুল, দাড়ি ও গোঁফ

নাম যদিও  আলাদা কিন্তু গোত্র সব এক। অ্যাপোলো হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা কারণ তিনি যথেষ্টই ওজনদার  এবং তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে বেশ কালঘাম ছুটে যায়। অবশ্য সমস্ত নামী ডাক্তারদের জন্যই এই অপেক্ষা করতেই হয় কারণ তাঁরা শুধু ভাল ছাত্র ই নন, বহু পরিশ্রম করে তাঁদের ঐ জায়গায় পৌঁছতে হয়েছে। সুতরাং তাঁদের দেখাতে গেলে তো এইটুকু কষ্ট করতেই হবে। কিন্তু সময় তো কাটতেই চায় না। সুতরাং নেই কাজ তো খই ভাজ, লোকজনের চুল, দাড়ি, গোঁফের দিকে নজর পড়ল। সঙ্গে কেউ থাকলে গল্পগুজব করে সময়টা কাটানো যেত।

চুল, দাড়ি, গোঁফের অগ্রজ হচ্ছে চুল। জন্মের সাথে সাথেই তিনি  সঙ্গের সাথি এবং দাড়ি বা গোঁফ তার তুলনায় বয়সে অনেক ছোট । একটা বয়সের পর তারা ধীরে ধীরে আসেন। এদের  প্রকারভেদ মানুষের চেহারাই পাল্টে দেয়। চাঁচরকেশী তো আজকাল  চোখে খুব কম পড়ে আমাদের দেশে কিন্তু আফ্রিকার লোকজনের মধ্যে এর আধিক্য। সেইরকম মেয়েদের মধ্যেও ঢেউ খেলানো চুল খুব কমই  চোখে পড়ে। যাদের  থাকে তারাও সেলুনে গিয়ে তাকে নানা পদ্ধতিতে পকেট থেকে বেশ ভাল পয়সা খরচ করে সোজা করে আসে। স্বাভাবিক চুলের  সৌন্দর্য্যটাই গায়েব।  তা কি আর করা যাবে। চুল তোমার,  পয়সা তোমার, চাহিদাও তোমার।  অতএব হাওয়া উঠলে হাওয়াতেই গা ভাসিয়ে দাও। আমাদের  আদিবাসীদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিকষ কালো কষ্টিপাথরের চেহারার মধ্যে উজ্জ্বল দুটো চোখ আর শ্বেতশুভ্র দাঁত লেপাঝোপা নাকের খামতিকে ছাপিয়ে চোখ টানে। অদ্ভূত এক সরলতা তাদের  ট্রেডমার্ক। কিন্তু শহর কলকাতায় তো সেই সৌন্দর্য তো চোখে পড়েনা। নানাধরণের লোকজন লাউঞ্জে  বসে আছে, আর আমার চোখ পরিক্রমা করে চলেছে এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। কারও টাক( টাকেরও প্রকারভেদ) আবার কারও সাদা চুলের মাথা তাঁদের  ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করছে আবার কারও চুলে কলপ করে বয়সটাকে প্রাণপণে ধরে রাখার  চেষ্টা আবার  কারও মাথায় রঙবেরঙের পাখি যেন বাসা বেঁধেছে। মেয়েদের মধ্যে বেশিরভাগের ই চুল ঘাড়ের কাছেই শেষ  হয়েছে ,একটা ক্লিপ কিংবা গার্ডার দিয়ে অনুশাসিত,  এদিক ওদিক  হবার  যো নেই। হাঁটু ছাড়িয়ে লম্বা চুলের  গোছা খুঁজতে গেলে বোধহয়  গ্লোবট্রটার হতে হবে অথচ কিছুদিন  আগেও অনেক মেয়েরাই এই অপরূপ  সৌন্দর্য্যের অধিকারিনী ছিলেন।  আজকাল মেয়েদের বাইরে বেরোতে  হয়, কেশবিন্যাসের  সময় কোথায়? আগে মা বা কাকিমারা চুল যত্ন করে বেঁধে দিতেন,  সুতরাং সেটা সম্ভব হতো কিন্তু আজকের দিনে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে সেটা আকাশ কুসুম।  মাকে ও বেরোতে হচ্ছে, মেয়েকেও  বেরোতে হচ্ছে, অতএব বিদায় কর লম্বা চুলকে। বিউটি পার্লারে গিয়ে ছেঁটে এস। নিজেকে ঐ লম্বা চুলের কসরত করতে গেলে বালিশের  উপর চুল বিছিয়ে জট ছাড়াতে  হতো, তারপর তো খোঁপা বাঁধা। সময়ের সাশ্রয় করতে চল বিউটি পার্লার। তবু আজকের  দিনেও  দক্ষিণ ভারতের  রাজ্যগুলিতে মেয়েদের এইধরণের কবরীবিন্যাস দেখা যায়। যাই হোক ফিরে আসা যাক অ্যাপোলো হাসপাতালের লাউঞ্জে।

দাড়ি গোঁফ তো একচেটিয়া পুরুষদের অধিকার।  চাপ দাড়িওয়ালা বাঙালির খোঁজ  পাওয়া কঠিন  কারণ পেটরোগা গ্যাস অম্বলে ভোগা  খিঞ্জিবি শরীরে  একদমই  বেমানান যেটা পাঞ্জাবিদের মধ্যে একচেটিয়া।  লম্বা চওড়া শরীরে ওটা মানায়। আমাদের  বাঙালিদের মধ্যেও  যাঁরা ঐ ধরনের চেহারার অধিকারী তাঁরাও  কেউ ঐরকম  বীরত্ব ব্যাঞ্জক দাড়ি রাখেন না, রাখেন তাঁরা ইন্টেলেকচুয়াল  ফ্রেঞ্চকাট  দাড়ি যেখানে গোঁফ এবং দাড়ি ঠোঁটকে ঘিরে রেখে তাঁদের  ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। হাসলেও দাড়ি গোঁফের বৃত্তও  মাত্রা ছাড়ায় না। কারও  গোঁফ বাঙলার বাঘ স্যার আশুতোষের মত ঝোলানো আবার কারও সরু গোঁফ শেষ হবার মুখে একটু ঊর্ধগামী, কেমন যেন  একটু ঔদ্ধত্যপূর্ণ।  কারও গোঁফ  আবার সরু কিন্তু কথাই  বলুক আর না ই বলুক যেন মনে হয় সদাই হাসছে। চওড়া গালপাট্টা গোঁফ জুলফির সঙ্গে মিশে দীর্ঘদেহী চেহারাকে আরও পরাক্রান্ত করে তুলেছে সেইরকম  গোঁফ  আমাদের  বাংলায় বিরল। জয়পুরে বন্ধুর  ছেলের  বিয়েতে গিয়ে এইরকম এক বীরপুরুষের দেখা পেয়েছিলাম।  প্রায় সাতফুট লম্বা চেহারার সঙ্গে মানানসই গোঁফ দেখা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। বাঙালিসুলভ বা বাংলায় থাকা অন্য প্রদেশের লোকজন যাঁরা প্রায় বাঙালি হয়ে  গেছেন তাঁদেরও দেখলাম  বাঙালি ধাঁচের ই গোঁফদাড়ি। ইতিমধ্যেই  ডাক পড়ে গেল আমার,  প্রেসক্রিপসনের ফাইল নিয়ে বড় ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢুকে পড়ায় আর চুল, দাড়ি গোঁফের বিচার  করা গেলনা কিন্তু নয় নয় করে ঘন্টা পাঁচেক সময় যে কি করে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।


Wednesday, 17 July 2024

হরি সতীনের গপ্পো

গরুর গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে ঘটা স্টেশনে। ট্রেনটা আসতে বেশ দেরী করছে। মাস্টারমশাইকে এসে বারবার জিজ্ঞেস করছে ঘটা, বাবু আর কত  দেরী আছে গো?  স্টেশনটা খুব বড় নয়,  আসা যাওয়ার পথে গুটিকতক মানুষ  ওঠে নামে। কিন্তু অনেক মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেন  থামে এখানে রাধাকান্ত বাবুর দৌলতে। রাধাকান্ত বাবু ছিলেন স্টেশন থেকে  চার ক্রোশ দূরে সায়র গ্রামের দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার এবং তাঁর কথায় বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত। স্বাধীনতার পরে তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন । তবে দেশ পরাধীন থাকলেও তিনি সাহেবদের যথেষ্ট  আনুকূল্য পেয়েছেন এবং স্বাধীনোত্তর যুগে কংগ্রেস পার্টির। সুতরাং,  তাঁদের কোন রকম অসুবিধা যাতে না হয়ে সেটা সব সরকার ই দেখেছেন। রাধাকান্ত বাবু বহুদিন হলো দেহরক্ষা করেছেন কিন্তু  বাড়ির কাছাকাছি  স্টেশনের সুযোগ  উত্তরসূরী এবং  আশেপাশের গ্রামের লোক ভোগ করছেন।

আজ গ্রামের বাড়িতে আসছেন রাধাকান্ত বাবুর নাতি  সতীকান্ত বাবু। গরুর গাড়িটা বেশ সুদৃশ্য। ছইটা বেশ  সুন্দর, বলদগুলোও বেশ তাগড়া, বাবুর যাতে কোনও রকম কষ্ট না হয় তার জন্য  বলদগুলোকে মাঝে মাঝেই  চারা খেতে দিচ্ছে  ঘটা আর মাস্টারমশাইকে ট্রেনের খবর জিজ্ঞেস  করছে। দূর থেকে  ট্রেনের হুইসল  শোনা গেল , ঘটাও ব্যস্ত হয়ে উঠল গাড়ি সাজাতে। ছয়জন সাগরেদ নিয়ে এসেছে,  চারজনের মাথায় ইয়া  বড় পাগড়ি,  হাতে তেলচুকচুকে লাঠি  আর একটা লন্ঠন গাড়ির নীচে ঝোলানো  আর দুজন সেরকম  কিছু  না হলেও হাতে আছে লাঠি এবং  লন্ঠন। ট্রেন  এসে থামতেই সতীকান্ত বাবু ও সহধর্মীনি  হরিপ্রিয়া নামলেন। ঢুকুস ঢুকুস করে গড় হয়ে পেন্নামের পালা শেষ হলো। মাস্টারমশাই ও এসেহাতজোড়  করে নমস্কার করলেন  এবং  কুশল বিনিময়  সেরে এগোতে থাকলেন। মাস্টারমশাই বললেন একটু ওয়েটিং রুমে বসতে এবং একজনকে ইশারা করে কিছু  বলতেই সে স্টেশন সংলগ্ন টালির চালার পানুর দোকান থেকে এক ঝুড়ি সন্দেশ নিয়ে এল। ঘটা এবং  তার সাগরেদরা মালপত্র নিয়ে গাড়িতে সাজাতে থাকল আর সতীকান্ত বাবু  এবং  হরিপ্রিয়া  মাস্টারমশায়ের সনির্বন্ধ অনুরোধ  উপেক্ষা  করতে না পেরে সন্দেশ মুখে  দিলেন এবং টিউব ওয়েলের ঠাণ্ডা জলে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন। সন্দেশের ঝুড়ি উঠল গরুর গাড়িতে। তা, এবার কতদিন থাকছেন গ্রামে, জিজ্ঞেস করলেন  মাস্টারমশাই । 
সতীকান্ত বাবু বললেন  এবার  কিছুদিন  থাকব আর পারলে একদিন  পরিবারকে নিয়ে আসুন। ট্রেন এবার  সিগন্যাল পেয়ে হুইসল দিয়ে ছাড়ল আর ট্রেনের  সমস্ত লোক  চোখ বড় বড় করে দেখল কাণ্ডকারখানা । হরিপ্রিয়া প্রথমে এবং  পরে সতীকান্ত বাবু উঠে আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে বসলেন এবং  বলদ জোতা হলো গাড়িতে।  সন্ধে হয়ে আসছে দেখে আগেই  লন্ঠন জ্বালিয়ে  নেওয়া হয়েছে আর দুজন লন্ঠন হাতে ফুরর করে বাঁশি বাজিয়ে চলতে শুরু  করল। লাঠি হাতে  আগে পিছে দুজন করে এগোতে  থাকল। আকাশটা আস্তে আস্তে  কালো হয়ে আসছে,  মাঠের মাঝে নেমে আসা সন্ধের  এক অপরূপ দৃশ্য। বলদগুলো চলছে দ্রুত পায়ে, ঘটারা তার সঙ্গে তাল মেলাতে  হিমশিম খাচ্ছে। প্রায়  ছুটছে তারা কারণ অনেকটা রাস্তা যেতে হবে এবং  বাড়ি পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যাবে।  হলোও তাই। রাত্রি প্রায় সাড়ে নটা। এই সময়  সমস্ত গ্রাম ঘুমিয়ে  পড়ে কিন্তু আজ জমিদার বাবুরা আসছেন মুখ দেখাতেই হবে নাহলে আর আনুগত্য কোথায়? বারবার  চোখ কচলাচ্ছে তারা, এই এসে পড়ল বলে । অবশেষে বাঁশির আওয়াজে সারা গ্রামের অন্ধকার ভেদ করে গ্রামবাসী যারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল তারা সবাই হৈ হৈ করে ফিরে এল, জমিদার বাড়ির সব আলো জ্বলে উঠল,ফুটেউঠল আলোর রোশনাই । 
সমস্ত গ্রামবাসীরা এসেছে, হরি সতীরা নামতেই পেন্নামের ঢল, তারপর নিজের নিজের  বাড়ি ফিরে যাওয়া। খাস যারা, তারা জমিদার বাড়িতেই থেকে গেল,  হাজার হলেও নিরাপত্তার  দিকটা তো  ভাবতে হবে । পরের দিন সকাল থেকেই সারা গ্রামে তোলপাড়।  যে পুকুরের মাছ মিষ্টি স্বাদের সেইখানে জাল ফেলা হচ্ছে  , যেখানে যা ভাল জিনিস  পাওয়া যায় তা মজুদ করা হচ্ছে  কারণ বাবুরা কতদিন  থাকবেন  তা কেউ জানেনা। হরিপ্রিয়া কিন্তু সব ব্যাপারেই নাক উঁচু করে রেখেছে  যেটা সতীকান্ত মোটেই পছন্দ করছেন না কারণ তিনি গ্রামের লোকদের  নাড়িনক্ষত্র সব জানেন । এরা একবার  যদি বিগড়ে যায়  তাহলে এখানে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে যাবে । তিনি যত ই শান্ত করার  চেষ্টা করেন ততটাই অসহিষ্ণুতা  ফুটে ওঠে তাঁর ব্যবহারে। এরপর তো শুরু হলো হিন্দুস্থান পাকিস্তানের মতো আচরণ। ইনি যা বলেন উনি তার বিপরীত । শেষমেশ স্থির হলো যে হরিপ্রিয়া ফিরে যাবেন এবং গ্রামে আর এক মূহুর্ত ও থাকবেন না কিন্তু সতীকান্ত কে থাকতেই হবে কারণ গ্রামের সম্পত্তিকে  একটু ছোট না করলে দেখাশোনার অভাবে সব বেদখল হয়ে যাবে । যথাসময়ে গিন্নী মা হরিপ্রিয়া ফিরে গেলেন  আর সতীকান্ত বাবুর  মন টিকছে না অথচ চলে গেলে সব পরিশ্রম বৃথা চলে যাবে । যাই হোক  মানিয়ে নিতেই হবে । সমস্ত কাজ সমাধা না হওয়া  পর্যন্ত এই অবস্থাই মেনে নিতে  হবে। 
প্রত্যেক  সংসারে ই এই  এক ই অবস্থা। যতক্ষণ  দুজন পাশাপাশি রয়েছে ততক্ষণ ই হিন্দুস্থান পাকিস্তানের সম্পর্ক অথচ একটু দূরে গেলেই অনুপস্থিতিটা প্রকট হয়। হরি সতীনরা  চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ।

Wednesday, 3 July 2024

পক্ষীরাজ ঘোড়া

শৈশবে বড়মার কাছে গল্প শুনতাম নানা ধরণের গল্প। বড়মার গল্প বলার ভঙ্গীটা ছিল ভীষণ সুন্দর। গল্প বলার মধ্য দিয়েই  নিয়ে যেতেন সেই কল্পলোকে । চোখ দুটো বড় বড় করে শুনতাম আমি আর ছোড়দি। বড়মা ছিলেন সদরপুর রাজবাড়ীর মেয়ে। তখনকার দিনে স্কুল কলেজে না গেলেও বাড়িতে মাস্টারমশাই আসতেন এবং  বাড়ির মেয়েদের শিক্ষা দিতেন এবং এইভাবেই হয়তো সময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকতেন। সেই মুখে শোনা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র যেতেন দূরদূরান্তের গহন বনে থাকা রাক্ষস বা ডাইনির কাছে বন্দী রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে। ঘোর যুদ্ধে অবশ্যই জয়ী রাজকুমার রাজকন্যাকে উদ্ধার করে পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে ফিরতেন নিজের রাজ্যে এবং  তারপর মহাসমারোহে তাদের বিয়ে হয়ে যেত। এই গল্পটাই বড়মার কাছে বারবার শুনতে চাইতাম আর ছোড়দির চাহিদা ছিল অন্য গল্পের । এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই  খিটিমিটি লেগে যেত আমাদের মধ্যে কিন্তু বড়মা ঠিক বুঝিয়ে সুঝিয়ে দুজনকেই নিরস্ত করতেন। মাঝেমাঝেই গল্প শোনার মধ্যে জিজ্ঞেস করতাম এই পক্ষীরাজ ঘোড়া কি এবং আমরা এখন তাকে দেখতে পাইনা কেন? বড়মা বলতেন যে বহুদিন আগে গ্রীস দেশে পার্সিউস বলে একজন পরম শক্তিশালী রাজা ছিলেন এবং  তিনি মেডুসাকে গলা কেটে হত্যা করেন । ঐসময় মেডুসা ছিল সন্তান সম্ভবা। পসাইডন ছিল তার স্বামী । আরও  বলেছিলেন যে মেডুসার চোখ  যার দিকে পড়বে, সে  পাথর হয়ে যাবে। একটা হেলমেট পড়ে পার্সিউস ঘুমন্ত অবস্থায় মেডুসার গলা কেটে  দেয় এবং  তার মাথাটা একটা থলির মধ্যে ভরে নেয়। গলা কাটার সময়  ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং  জন্ম হয় দুধ সাদা পক্ষীরাজ ঘোড়া  বা পেগাসাসের যার ছিল দুটো ডানা এবং  সে উড়তে পারত প্রচণ্ড বেগে। এরপর পার্সিউস উদ্ধার করে  রাজকুমারী অ্যান্ড্রোমিডাকে এবং  তাকে সঙ্গে নিয়ে আসে।

স্বপ্নালু চোখে সামনে দেখতাম দুধ সাদা পক্ষীরাজ ঘোড়া তার ডানা ঝটপটিয়ে আহ্বান করছে তার পিঠে চড়ার জন্য আর আমিও যখন ই সাড়া দিয়েছি, মায়ের হাতের চাপড় একটু জোরালো ভাবেই পড়েছে আর একটু ভারী গলায় আওয়াজ ঘুমিয়ে পড় শুনেছি । কখনোই  সেই স্বপ্ন সাকার হয়নি এবং আমারও  রাজপুত্র হয়ে ওঠা হয়নি,  রাজকন্যা উদ্ধার তো দূরস্থান । 
কিন্তু একটা কথা ঠিক যে মনে মনে কোন  বাসনা যদি থাকে তাহলে ভগবান কোন না কোন ভাবে সেই মনস্কামনা পূর্ণ করেন । আমারও ভাগ্যে সেই শিকে ছিঁড়ল।আমাদের  পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের বাড়িতে অসুখ বিসুখ,  অর্জুন ও নকুল পাড়ি দিয়েছে সুদূর আমেরিকায়। রয়েছে কেবল ভীম ও সহদেব। ভাইজাগে থাকাকালীন পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে একটা জমাটে বাঙালি সমাজ গড়ে উঠেছিল এবং  এখনও  তা অক্ষুণ্ন । ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেও অটুট রয়েছে তাদের  স্মৃতি এবং কোন অনুষ্ঠানে হয় সকলের দেখা সাক্ষাত আর রোমন্থন হয় পুরনো দিনের  স্মৃতি। এইরকম ই আমাদের  চোখের সামনে জন্ম নেওয়া একটা ছোট্ট মেয়ের বিয়ে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে  এক শহরতলীতে।বহুদিন আগে থাকা পঞ্চপাণ্ডবরা যৌবনকে ফেলে  এসে হয়েছেন প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ এবং কালের গতিতে সেই ছোট্ট শিশুকন্যা আজ যুবতী এবং  তারই বিয়ে । ভীমের কাছে থাকা এক পক্ষীরাজ ঘোড়া ই আজ ভীম, বলধরা ও সহদেব এবং বিজয়ার বাহন এবং  অবশ্যই সারথী সঞ্জয় । এই পক্ষীরাজের আছে চারটে পাখা এবং  পেটের তলায় ও রয়েছে  আরও একটি। বিকেল পাঁচটা নাগাদ রওনা দেবার  মুখেই একটা  পাখা একটু  দুর্বল মনে হতেই পেটের কাছে থাকা পাখনা লাগানো হলো। মিনিট কুড়ি হলো দেরী কিন্তু সঞ্জয়ের পরিচালনায়  পক্ষীরাজ  তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে, পিছনে পড়ে রয়েছে আরও  অনেক আধুনিক ও উন্নতমানের  পক্ষীরাজ । কথায় আছে পুরনো চাল ভাতে বাড়ে এই কথাটা ভীমের পক্ষীরাজ আবার  প্রমাণ করল। যাত্রাপথের শেষ লগ্নে শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি, সামনে প্রায় কিছুই  যায় না দেখা।  এই পক্ষীরাজের সামনে আবার জোড়া দুটো ছোট ছোট  হাত যা বৃষ্টির জলের ঝাপটা সামলাচ্ছে আর আওয়াজ হচ্ছে  ফটাস ফটাস। অজানা অচেনা জায়গায় ভীম একটু বেশি রকম ই বিচলিত, সহদেব এবং সঞ্জয়কে বারবার বলছে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে যে পক্ষীরাজ  ঠিকঠাক চলছে কি না কিন্তু  কে রহিবে এই ঘনঘোর বর্ষায় দিক নির্দেশের তরে? কিন্তু অবিচলিত  পক্ষীরাজ পৌঁছে গেল। গন্তব্যস্হলে  মসৃণগতিতে সারথি সঞ্জয়ের নির্দেশনায় ।
দেখা হতে থাকল সেই পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে, শুরু হল কুশল বিনিময় এবং আক্রমণ ট্রে হাতে কিশোরীদের । কারও  হাতে রয়েছে স্ন্যাকস,  কারও হাতে  কফি আবার কারও  হাতে সুস্বাদু জিলাপী । কেউ কেউ আক্রমণ প্রতিহত করছে তাদের  হাত থেকে নিয়ে আবার  কেউ বা উদাসীন, গল্পতেই মত্ত। ভীম সবাইকে খুশি করছে আর করবেনা এটা ভাবাই অমূলক। সহদেব কেমন একটু লাজুক, একবার একটু নিয়েই গুটিয়ে গেল। কিন্তু কফির অনুরোধ  উপেক্ষা করতে না পেরে দু কাপ নিয়ে নিল।
হাসি, ঠাট্টা, মশকরা চলছে সমানে অথচ বরের দেখা নাই রে , বরের দেখা নাই, আটকে আছে জ্যামে। আবার  অনেক দূরের রাস্তা, বৃষ্টিও হয়েছে,  ফিরতে হবে। তাই ডান হাতের  কাজটা ইতিমধ্যে  সেরে ফেলাটাই ভাল। আর তা করতে করতে পাত্র এসে গেলে দেখা হয়ে যাবে আমাদের  সেই ছোট্ট মেয়েটার জীবনসঙ্গী কে হতে চলেছে ।  তারপর এক ঝলক চোখে দেখেই নিজ গৃহে প্রত্যাগমন।
খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ওপর তলায়। এখানে ব্যুফে সিস্টেম নয়, বসে খাওয়া, আজকাল যা প্রায়ই উঠেই গেছে। দুটো ব্যবস্থারই  সুবিধা অসুবিধা রয়েছে। ব্যুফেতে অনেক লোক একসঙ্গে নিজের পছন্দ মাফিক খেতে পারে এবং কোন  বিশেষ পদ ভাল হলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে পারে  আর অন্য পদগুলো থেকে যেতে পারে। কিন্তু এখানে বসার জায়গা অপ্রতুল হলে কারও প্লেটের ঝোল জন্য  কারও জামাকাপড়  নষ্ট করে দিতে পারে। আর টেবিল চেয়ার ব্যবস্থায়  যারা খাবার  দিচ্ছে তারা ইচ্ছে করলে খাওয়ার বারোটা বাজিয়ে দিতেপারে। একটা জিনিস খাওয়া শেষ না হতেই আরও একটা জিনিস  দিয়ে পুরো স্বাদটাই বদলে দিতে পারে। কিন্তু তারা  যদি ভাল হয় তবে ধীরে সুস্থে লোকজন একটু আরামে খেতে পারে। তবে যদি মনে করা যায়  যে সব জিনিস তো একটাই জায়গায় পৌঁছে যাবে তাহলে আর কোন অসুবিধে নেই ।
খাওয়া শেষ । ব্যাণ্ডপার্টির আওয়াজে বোঝা গেল যে পাত্রপক্ষ হাজির। ম্যারেজ রেজিষ্ট্রার বেশ খানিকক্ষণ আগেই এসে গিয়ে  একটু উসখুশ করছিলেন আর মাঝেমাঝেই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করছিলেন পাত্রের আসা আর কতদূর। যাই হোক,  তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন । আর একটু সময় গেলেই  পকেটে আসবে মোটা টাকা এবং  বিশেষ  উপঢৌকন।
পক্ষীরাজ হাজির। সারথি সঞ্জয়ের খাওয়া হয়নি।তাকে একটা সুদৃশ্য থলিতে দেওয়া হয়েছে একটা ওজনদার বাক্স কিন্তু ফেরার তাগিদে সেটা আর খুলে উঠতে পারেনি বেচারা। বৃষ্টির তোড় বাড়তে থাকল কিন্তু  পক্ষীরাজের সামনে বৃষ্টি ও মানল  হার। তীরের গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের পক্ষীরাজ । আবার ও বিপত্তি শেষ লগ্নে। আরও  একটা ডানা গেল ভেঙে । রাত সাড়ে এগারটা বেজে গেছে। ভীম পক্ষীরাজকে একা ছাড়তে রাজি নয় আবার সঞ্জয়ের  হাতেও ছাড়তে রাজি  নয় ।সহদেব কয়েকজন নগরপ্রহরীকে অনুরোধ  জানালো পক্ষীরাজকে একটু আস্তানা দিতে কিন্তু কেউ সেই অনুরোধ রাখল না। অতএব স্থির হলো যে সহদেব বলধরা এবং  বিজয়াকে নিয়ে অন্য  একটা বাহনে বাড়ি ফিরে আসবে এবং ভীম সঞ্জয় কে নিয়ে পক্ষীরাজের ভাঙা ডানা নিয়ে কোন ডাক্তার বাবুর কাছে নিয়ে যাবে। রাত্রি বারটা বেজে গেছে । বলধরা ইতিমধ্যে একটু অসুস্থ  হয়ে পড়েছে । সহদেব এবং বিজয়া বলধরাকে  বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে বাড়ি ফিরে যখন এল তখন  বাজে রাত একটা। এদিকে ভীমের ও  পক্ষীরাজের ডানা সারিয়ে ফিরতে রাত একটা বেজে গেছে । 
এবার আমাদের  পক্ষীরাজের পরিচয় করানো যাক। এখানে পক্ষীরাজের বা বা মারুতি হচ্ছে  পসাইডন এবং মা মেডুসা হচ্ছে সুজুকি।



Monday, 17 June 2024

সাম্রাজ্য

ছোটবেলায় ইতিহাসে প্রশ্ন আসতো সম্রাট  হিসাবে আকবর ও আওরঙ্গজেবের তুলনা।দুজনেই ছিলেন প্রবল প্রতিপত্তি মুঘল সম্রাট এবং সাম্রাজ্যের পরিধিও  তাঁদের বিশাল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সম্রাট  হিসাবে আকবর ছিলেন উদার এবং অন্য ধর্মের গুণীজনেরাও তাঁর সভাসদ আলোকিত করেছেন যেখানে সম্রাট আওরঙ্গজেব একজন গোঁড়া মুসলমান এবং অন্য ধর্মের প্রতি অনীহা। বিভিন্ন লোকের  বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তাঁদের  সম্বন্ধে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন দেশের  রাষ্ট্র নায়কদের কথা, তাঁদের  উত্থান ও পতনের কথা এবং মনে মনে কারও কারও কথা রেখাপাত করেছে হৃদয়ে। কেউ কেউ আদর্শ নায়কের ও স্থান নিয়েছেন ।

কখনও কখনও নিজেদেরকেও  তাঁদের ই আদর্শে গড়ে তুলতে চেয়েছি কিন্তু সাম্রাজ্য স্থাপন সেটা কি করে সম্ভব। আকবরের বিরাট  সাম্রাজ্য না হয় নাই বা হলো কিন্তু ছোটখাট  ফ্ল্যাটের  মালিক তো আমরা হতেই  পারি এবং সেটাকে সাম্রাজ্য হিসেবে মনে করতে তো কোন বাধা নেই।  হোস্টেলের সিট থেকে মেসে অনেকের সঙ্গে একটা রুমে থাকা সেটাও একটা বিরাট  অভিজ্ঞতা। একটা ছোট্ট খাট এবং খাটের তলায় একটা ট্রাঙ্ক,  একটা স্যুটকেস এবং ব্যাগ এবং তারই পাশে জুতো, চটি সব গাদাগাদি করে রাখা,  মাথার কাছে বা পায়ের কাছে রাখা একটা টেবিলে রাখা কিছু বই খাতা এবং একটা টেবিল ল্যাম্প যাতে অসুবিধা না হয় গভীর রাতে পড়াশোনার জন্য । দেওয়াল ধরে দুটো পেরেকে বাঁধা দড়িতে ঝুলছে জামা কাপড়--- এই নিয়েই সাম্রাজ্য।  ঐ খাট বা খাটের তলা বা টেবিল এইখানে আমারই আধিপত্য,  এখানে অন্য  কেউ কিছু রাখতে গেলেই সম্রাটের অনুমতি নিতে হয়। এটাই বা  কম কিসে? নিজের গ্রামের কোন  চেনা পরিচিত  ছেলে শহরে কোন কাজে এসেছে, রাতটা কাটাতে হবে কিন্তু পকেটের  রেস্ত সেরকম  নেই, তখন অগত্যা মধুসূদন আমার  খাটের  অর্ধেক।  দুজনে ঐ ছোট্ট খাটে কত আরামে থেকেছি। তার কাজ একদিনে না হলে তিন চারদিন ও আমার  গেস্ট হিসেবেই থেকেছে। আমার  সাম্রাজ্য  ছোট হলেও  একজনকে তো আশ্রয় দিতে পেরেছি এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন  জন আমার  সাম্রাজ্যে অতিথি হিসেবে থেকেছে , এর থেকে বড় আনন্দ  আর কিসে আছে? 

প্রত্যেক ছেলে বা মেয়েরই  কিছুদিন হোস্টেলে বা মেসে থাকা উচিত।  এতে অন্যদের সঙ্গে সুখ দুঃখের  ভাগীদার হওয়া যায়। যেসব ছেলেমেয়েরা বাড়িতে থেকেই  পড়াশোনা করেছে বরাবর, যারা কোনদিন  হোস্টেল বা মেসে থাকেনি তাদের খুব কম জনেই নিঃস্বার্থপর হয়েছে। ব্যতিক্রম  অবশ্যই আছে কিন্তু সংখ্যায় নিতান্তই কম। মেসে থাকাকালীন বহু ভিন্ন চরিত্রের  লোকের  সংস্পর্শে আসা যায় এবং তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। রমেন দা ছিলেন এক আদর্শ লোক। যেমন সুন্দর হাতের  লেখা, আঁকা এবং ঝকঝকে চেহারা, দারুণ স্মার্ট , এককথায় বলা যায় ওঁকে অনুকরণ করলে লাভ বই ক্ষতি নেই। কিছু পড়তে পড়তে গান ধরতেন  নিজের  মনে আর মাঝেমধ্যেই একটা লেখা নিয়ে এসে পড়তে বলতেন আর পরে জিজ্ঞেস করতেন  কেমন লাগল। যাদবপুর  ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার বিভাগের  গোল্ড মেডালিস্ট হঠাৎই  বিদেশে একটা লোভনীয় চাকরি পেয়ে যাওয়ায় মেস এবং দেশ ত্যাগ। মফস্বলের ছেলেরা বড় শহরে এসে কেমন যেন হকচকিয়ে যায়। যাবার  আগে একটা দামী কথা বলে গেলেন, " ভীড়ের মধ্যে হাঁটবে  কিন্তু নিজেকে কখনোই ভীড়ে হারিয়ে ফেলো না।" কি দারুণ সুন্দর কথা, আজও  মনে পড়ে তাঁর কথা যদিও  দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। প্রফেসর সেন রুমমেট  ছিলেন, এক আশ্চর্য মানুষ।  আমরা সবাই যদিও  দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাকের মালিক কিন্তু সবার দৃষ্টিভঙ্গী এক হয়না বা সবাই একই  জিনিস  একই ভাবে শোনেন না। প্রফেসর সেন নিজেকে প্রফেসর  বলতেন কিন্তু তিনি ছিলেন  আদতে টিউটোরিয়াল হোমের  মাস্টার মশাই। প্রায়ই ঠিক সময়ে টাকা দিতে পারতেন না বলে মেসের মালিকের গঞ্জনা শুনতেন আর সবার জিনিস ই তিনি নিজের  মনে করে ব্যবহার করতেন,  সেটা টুথপেস্ট ই হোক বা  সাবান বা শার্ট ই হোক না কেন। জামাটা দেখতে না পেলেই জানতাম  যে ওটা প্রফেসর সেনই পড়ে গেছেন। কিছু বলাও যেতনা, একটা ম্লান  হাসিতে সবাই মাত  হয়ে যেত। শিবুদা ছিলেন  শিবপুর থেকে পাশ করা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।  অদ্ভূত  দর্শন তাঁর। একঝাঁক  তরুণীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ দেখতে যে মেয়েটি ,তাকেই উনি পছন্দ করতেন  বান্ধবী হিসেবে পেতে। একদিন  কৌতূহল চেপে থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম তাঁর এই অদ্ভূত  সিলেকশনের কথা। একটা দারুণ  বুদ্ধিমানের হাসি হেসে বললেন,
"ভাই , আমি কম্পিটিশনে যেতে চাইনা। সবাই সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটির  সঙ্গেই আলাপ করতে চাইবে আর আমি সেখানে পাত্তাই পাব না। দরকার কি এত ঝামেলাতে ? আমি তাকেই বন্ধু হিসেবে পেতে চাই যার সঙ্গে আমি নিশ্চিন্ত মনে নির্ভয়ে কথা বলত  পারব এবং যে আমার উপর ভরসা করে ফুরুৎ করে পালাবে না।" সত্যিই তো, শিবুদার যুক্তি তো  একদমই  ফেলনার  নয়। গজুদার মেসে আসা বাড়িতে রাগারাগি করে। কিছুদিনের জন্য  থাকলেও মেসের সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন।  রাগ পড়ে গেলে ফিরে গেলেন  বাড়িতে কিন্তু সেই ছোট্ট স্মৃতির কথা তিনি ভোলেন নি, বিয়ের সময় আমাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ  করেছিলেন। দীপক, শক্তি, সুভাষ  প্রায় সমবয়সী থাকায় চুটিয়ে আড্ডা চলত। দীপকের ঘুমের কথা না বললেই নয়। পরেরদিন সকালে ইন্টারভিউ আছে চাকরির। আমার উপর ভার  পড়ল ঘুম থেকে ওঠানোর।  ঠিক সময়ে ডেকে দেওয়ায় , ধন্যবাদ বলল আর তাতে ধারনা হলো যে উঠে পড়েছে কিন্তু আমার  চলে যাওয়ার পর আবার ঘুমিয়ে পড়ল এবং বেলা দুটোয় যখন  ঘুম  ভাঙল ততক্ষণে ইন্টারভিউ শেষ। কিন্তু ও ছিল  এক অসাধারণ  ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। ঐ কোম্পানির বড় সাহেবের  দীপকের উপর নজর ছিল।  উনি বললেন  যে ঠিক  আছে পরের শুক্রবার তোমার  ইন্টারভিউ  হবে। বৃহস্পতিবার  দীপক আমাকে বলল," আমি উঠে গেছি বললেও তুমি ছাড়বে না, আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে আচ্ছা করে ঝাঁকিয়ে  দেবে, দরকার  হলে চোখে জলের  ঝাপটাও  মারবে।" পরদিন  সকালে ওকে উঠিয়ে শুধু ঝাঁকানিই নয় , সোজা তৈরী করে ট্যাক্সি করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে অফিস  যাওয়া। শক্তি সবসময়ই  ফিটফাট,  ড্রেস সম্বন্ধে ভীষণই  পার্টিকুলার। সুভাষ ছিল সদাই হাসিখুশি।হুগলির  খন্নানের সুজিত  ছিল পাশের ঘরে। বেদম জ্বরে যখন  বেহুঁশ,  তখন  সারারাত জেগে জলপটি দিয়ে হাওয়া করে একই খাটে ঘুমিয়ে পড়েছিল পাশের ঘরে নিজের  খাটে না গিয়ে। অমলদা, ধীরেন দা আমাকে প্রায় একরকম  জোর করে বুঝিয়ে নতুন মেসে নিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে মেস জীবনের সমাপ্তি।  গানবাজনা  করতে চাইলে  মেসে থেকে সম্ভব নয় বলে আলাদা ঘর নিতে হলো। তখন  ব্যাচেলর  ছেলের বাড়ি ভাড়া পাওয়া সোজা ছিলনা কিন্তু কেন জানিনা ভদ্রমহিলার  পছন্দ  হলো আমার কথা বার্তা শুনে। তখন  আমার  সাম্রাজ্য হলো মেজানাইন  ফ্লোরের  একটা ঘর। মাথায় বিশেষ  উঁচু  নয় কিন্তু এই সাম্রাজ্যেই আমি মহীয়ান।  বাড়ি থেকে বিয়ের কথাবার্তা ওঠায় সাম্রাজ্য বিস্তার করার  প্রয়োজন  হলো এবং হাউসিং বোর্ডের ছোট্ট  একটা দুই কামরার ফ্ল্যাট নেওয়া হলো। কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে  হয়েছে এবং অফিসের  দাক্ষিণ্যে অনেক বৃহৎ  পরিসরে আশ্রয় হলেও নিজের  সাম্রাজ্য বলতে সেই দুই কামরার  ফ্ল্যাট যা সরকারের অনুমতির পর তিন কামরার হয়েছে। যখন  ভাবি যে একটা খাট থেকে তিন কামরার  ফ্ল্যাটে উত্তরণ, তখন নিজেকেও  একটু কেমন রাজা রাজা ভাবতে ইচ্ছে করে। ছোট হলেও  এখানে তো আমিই রাজা এবং এটাই আমার  সাম্রাজ্য। 

Wednesday, 12 June 2024

জামাইষষ্ঠী

কথায় আছে জন,  জামাই, ভাগনা তিন নয় আপনার। কথাটার দম কতটা আছে একটু যাচাই করা যাক। আজ জামাইষষ্ঠীর দিনে প্রথমে মধ্যম জন অর্থাৎ জামাইকে নিয়েই আলোচনা হোক, পরে সময় পাওয়া গেলে জন এবং ভাগনাকেও আলোচনায় আনা যাবে।
আগে বেশিরভাগ সময়েই জামাইষষ্ঠীর দিন ছুটি পড়ত না। ক্কচিৎ কদাচিৎ রবিবার পড়ত এই বিশেষ  জামাইবরণের দিনটি। এসব সত্ত্বেও সরকারি অফিসগুলো খাঁ খাঁ করত কর্মীদের  অনুপস্থিতিতে। কেউ বা অনেক আগে থেকেই  ছুটির দরখাস্ত  দিয়ে নিশ্চিন্তে ছেলেমেয়ে বৌকে নিয়ে ট্রেনে বা বাসে পাড়ি দিত ( দূরবর্তী জায়গা হলে) আর শহরের  মধ্যে হলে সাতসকালে স্নান টান করে সেজেগুজে বেড়িয়ে পড়ত শ্বশুর বাড়ির দিকে যাতে ভিড়ে জামাকাপড়ের ভাঁজ নষ্ট না হয়ে যায়। সবার তো একই রকম চিন্তা, সুতরাং বাস বা লোকাল ট্রেনে সাতসকালেই গাদাগাদি ভিড়। কেউ বা আবার  ভিড় এড়াতে আগের রাত থেকেই শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান।  এই মাগ্গিগণ্ডার বাজারে শ্বশুর মশাইদের তো  নাভিশ্বাস  ওঠার  যোগাড়। কিন্তু শ্বশুর মশাই রা অতি কষ্টে মনের  দুঃখ মনেই চেপে রেখে যতটা স্বাভাবিক হওয়া যায় ততটাই করতেন কিন্তু যাঁরা অত্যন্ত  শাঁসালো শ্বশুর এবং পয়সার  কোন অধিবধি নেই তাঁরা একদম হৈচৈ বাধিয়ে মেয়ে,জামাই,  নাতিনাতনিদের নিয়ে উৎসবে মেতে উঠতেন। একান্নবর্তী পরিবারে ভাইদের মেয়ে জামাই ও তাদের  পরিবারের   সবাই মিলে এক বিরাট  উৎসবের  আয়োজন  হতো। 
এইরকম ই  এক পরিবার সিংজীমশাই। পদবী ছিল  সিংহ কিন্তু পাড়ায় বুড়ো, বুড়ি, ছোঁড়া,  ছুঁড়ি সবার  কাছেই  এই পরিবার ছিল সিংজীমশায়ের বাড়ি এবং ঐ বাড়ির  ছেলেমেয়েরাও  সিংজীমশায়ের ছেলে বা ভাইপো বা নাতি বা নাতনি নামেই পরিচিত  ছিল। হয়তো  বা একটু বাড়াবাড়িই  ছিল কিন্তু কাকে দোষ  দেওয়া যায়, লোকজন তাদের  ঐভাবে ডাকলে সিংজীমশায়ের কি দোষ?  যাই হোক, জামাইষষ্ঠীর কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়িতে কেমন যেন  এক উৎসবের আবহ তৈরী হতো। আগের দিন  সন্ধের ট্রেনে গ্রাম থেকে বিশু বাইন পুকুরের সদ্য ধরা মাছ এনেছে। শুধু মাছই নয়, এনেছে জমির কামিনীভোগ ও গোবিন্দভোগ চাল, তেল, ঘি ও গুড়। গুড়ের  রঙ দেখলে মনে হবেনা ছুঁয়ে দেখার কিন্তু একটু আঙুলে লাগিয়ে মুখে দিলেই বোঝা যায় কি স্বাদ। কামিনীভোগ চালের পোলাও এবং গোবিন্দভোগ চালের  পায়েসের গন্ধে ম ম করে ভরে উঠত সারা বাড়ি এবং ছড়িয়ে পড়ত সারা মহল্লায়। আম এসেছে সাদুল্লা ( আজকের  দিনের  হিমসাগর), মোলায়েমজাম, রানী,  বিমলী এবং কালাপাহাড় কিন্তু সেরার সেরা কোহিতুর পাওয়া না যাওয়ায় সিংজীমশায়ের আক্ষেপ জামাইবরণ ঠিকঠাক  হলো না।
গিলে করা পাঞ্জাবি আর সুপারফাইন ধুতিতে সজ্জিত  জামাই বসে আছেন সোফায়। ভাইয়ের জামাই তখনও  এসে পৌঁছায়নি। সিংজীমশায় ঘরবার করছেন  আর ভাইকে বলছেন একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করতে কোথায় আছে। তা করতে করতেই এসে পড়েছে ভাইয়ের জামাই। সাজের ঘনঘটায়  তিনিও কম যাননা। আজ জামাইদের আবাহন প্রথম তারপর সব কিছু। মার্বেল পাথরের  মেঝেতে গালিচা আসন পাতা হয়েছে। বিরাট প্লেটে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে নানান ফল ও বিভিন্ন ধরণের  মিষ্টি এবং কাঁসার বাটিতে দেওয়া হয়েছে গোবিন্দভোগ চালের  পায়েস। পিলসুচের উপর জ্বলছে প্রদীপ,  মূহূর্মূহু শঙ্খনাদে বরণ  হচ্ছে জামাইদের।  শ্বাশুড়ি , খুড়শ্বাশুড়ি ও পিসশ্বাশুড়িদের একে একে ফোঁটা দেওয়া শুরু হলো এবং প্রণাম ও আশীর্বাদের ঘনঘটায় সারা বাড়িতে ঘোষিত হতে থাকল  সিংজীমশায়ের বাড়ির জামাইষষ্ঠী। আশীর্বাদ করার পর কানে হলুদ মাখানো সলতে  দেওয়া হতো প্রত্যেকের  তরফে। ঐ একটাই  যা অত্যন্ত  বিরক্তিকর। জামাই ফলমূল খেয়ে লুচি দিকে হাত বাড়াতেই কান থেকে ঝুলে পড়ল একটা সলতে যাতে ধুতি এবং পাঞ্জাবি দুটোই  গেল একটু পাঁশুটে হয়ে। অবশ্য  প্রাপ্তির  পরিমাণ  এতটাই যে এতে জামাইরা সামান্যতম বিচলিত  হলোনা। ফোঁটা পর্ব সমাধার পর বিরাট  ঢেকুর তুলে সোফায় গা এলিয়ে  দেওয়া। এরপর এসে গেল দার্জিলিঙের সুন্দর চা। আর পায় কে জামাইদের, আজ তাদেরই  দিন। এরপর বাকিদের  জলখাবারের আয়োজন।  একটু আধটু ধূমপানের  ইচ্ছে থাকলেও  সিংজীমশায়ের চোখের  আড়াল  হওয়া এক দুঃসাধ্য ব্যাপার।  বড় আরাম কেদারায়  বসে থাকা সিংজীমশায়ের  হাতলে রাখা হাভানার জ্বলন্ত চুরুট  ও অ্যাশট্রে এবং তাতে মাঝেমধ্যেই সুখটান ও ধোঁয়া ছাড়া এবং সেই ধোঁয়ায় অন্যদের  কাশির উদ্রেক করা। মাঝেমধ্যেই  জামাইদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তাদের  পরবর্তী কর্মসূচী।
একে একে জলখাবার পর্ব সমাপ্ত হতে হতেই মধ্যাহ্নভোজনের পর্ব। এখন না একটু পরে বলে খানিকটা সময় না কাটাতে পারলে খাবে কি করে? পেটে তো একটু জায়গা থাকা দরকার।  একটু ঘুরে বেরিয়ে আসতে না পারলে টাঁসানো তো আর যাবেনা। অথচ এক একটা পদ যেন  এক এক ধরণের  অমৃত। শ্বাশুড়ি ছোট  মেয়েকে দিয়ে সিংজীমশাই কে ডেকে পাঠিয়ে একপ্রস্থ  ক্লাস নিলেন,  ঐরকম  হাঁ করে জামাইদের  সামনে বসে থাকলে ওরা নিজেদের  মধ্যে কি করে কথাবার্তা বলবে? একদম বেআক্কেলে লোক বলায় সিংজীমশায়ের  একটু অভিমান  হলো এবং মেয়েকে দিয়ে চুরুটও অ্যাশট্রে আনিয়ে নিয়ে নিজের  ঘরের দিকে চলে গেলেন  এবং জামাইরাও  একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে চুরুটের ধোঁয়াকে বাইরে বের করতে লাগল। 
মধ্যাহ্নভোজনের বিরাট পর্ব। কামিনীভোগ আতপ চালের  পোলাও,  বাদাম দিয়ে লাল শাক, নারকেল কোঁড়া দিয়ে মুগের ডাল,পাঁচ রকম ভাজা, পটলের  দোরমা,  মাছ,মাংস, চাটনি, পাঁপড়ভাজা,অমৃতর দই ও মিষ্টি। মিষ্টির  বর্ণনা না দিলে সিংজীমশায়ের অপমান  হয়। কৃষ্ণনগরের সরভাজা ও সরপুরিয়া,  বহরমপুরের ছানাবড়া, গিরীশের সন্দেশ,  কান্দীর কৃষ্ণপ্রসন্ন ও জনাইয়ের  মনোহরা, চন্দননগরের মালাই চমচম আর হাবড়ার কাঁচাগোল্লা। এত রকমের আয়োজন অথচ এই পরিমাণ  খাওয়া একমাত্র  দারা সিংরাই পারেন।  এতসব বিভিন্ন  ধরণের  খাবারের  স্বাদ  নিতে গেলে অন্তত এক সপ্তাহ  ছুটি না নিলেই নয়। বিয়ের পর প্রথম জামাইষষ্ঠীর  সময় সিংজীমশায়ের জামাই  দুদিনের  বেশী ছুটি পাননি। তাঁর উপরওয়ালা  সাহেব যাতে জামাইএর উপর অসন্তুষ্ট  না হন সেইকারণে সাতদিন  ছুটি কাটিয়ে বড় সাহেবের জন্য একবাক্স বিভিন্ন  ধরণের  মিষ্টি ও একঝুড়ি মুর্শিদাবাদের আম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হাজার  হলেও  প্রথম জামাই ষষ্ঠী  তো।
এই জমজমাট  জামাই ষষ্ঠীর পর নিশ্চয়ই জন বা ভাগনার  গল্প বললে আসরটাই নষ্ট  হয়ে যাবে বলে ওটা মুলতুবি থাকল।

Friday, 7 June 2024

মর্যাদার প্রতীক -- সেকাল ও একাল

মর্যাদার প্রতীক বলতে কি বোঝায়? কত সুন্দর প্রশস্ত জায়গা জুড়ে ঝাঁ চকচকে বাড়ি, দেশীর তুলনায় বহু বিদেশী মহা মূল্যবান গাড়ি, বাড়ির  বাইরে কড়া প্রহরা,  ঢুকতে বা বেরোতে গেলে যেখানে আদ্যোপান্ত বিবরণ জানিয়ে যেতে হয় এবং বোর্ডে লেখা দেখা যায় ," আপনি সি সি টিভির নজরবন্দী।" এইরকম বাড়ির  কোন ছেলে বা মেয়ে যদি বন্ধু হয় এবং নিজেরাও যদি সমগোত্রীয়  না হয় তাহলে বন্ধুত্ব তো কোন দূরস্থান,  স্বপ্নেও ভুলে ভাবতে পারা যায়না যে সেখানে কোন বন্ধু থাকে। যদিও  বা ছোটবেলায় কোন এক স্কুলে একই বিভাগে পড়ে থাকে এবং ঐ মর্যাদাশালী পরিবারের ছেলেটি যতই পিছনের  সারির হোক না কেন, অর্থের জোরে সে বিদেশে কোন এক কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাসিল করে তুরীয়ানন্দে কোন  নামী কোম্পানির প্রায় সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত  হবে যেখানে তারই সঙ্গে পড়া প্রথম হওয়া ছাত্র অনেক নীচে কাজ করে। এ নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে এবং ব্যাপারটা ক্লিশে হয়ে গেছে। সুতরাং ঐ বিষয়ে আলোচনা করে লোকের  বিরক্তি উৎপাদন না করাই ভাল। 
এইরকম  তথাকথিত একটা সমাজ গড়ে উঠেছে যারা মেঘনাদের মতো আকাশেই ওড়েন এবং মাঝে মাঝে যখন প্রয়োজন  পড়ে তখন মেঘের  ফাঁক থেকে এক চিলতে ঝলক দেখিয়ে সাধারণদের বলেন, " আমি আছি, আমি তোমাদের ই একজন।" কোন কাজে  আসেনা এরা সমাজের  কিন্তু সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধা এঁরাই ভোগ করেন আর আপামর জনতা বিস্ফারিত  নেত্রে অবলোকন করেন  আর মনে মনে অস্ফূট স্বরে বলেন  আহারে কি কষ্টটাই না হচ্ছে বাছাদের আমাদের  কথা ভেবে। নিজেদের  হাজারো কষ্ট থাকলেও  দেঁতো হাসি হেসে বলেন আপনারা এত কষ্ট করে আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে আমাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য  এসেছেন,  এতেই আমরা ধন্য। সবসময়ই  এক  প্রজাসুলভ মনোভাব  নিয়ে জোড় হাত করে আপামর জনতা তাদের আশীর্বাদ জানায় সেই রাজপুত্রকে,  তা তিনি যতই ভণ্ড  হোন বা অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত হোন না কেন। এটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিন দাসত্ব করার  ফল এটা। বহুদিন নবাবী আমলে এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করার  সুবাদে আমাদের শিরায় ও ধমনীতে প্রবাহিত রক্তে চালিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত  দাসত্বের বীজ। এর একমাত্র  সমাধান  এই দূষিত রক্ত শরীর থেকে নিষ্কাশিত করে স্বাধীনতার  বীজ বপন করা। এটা কি করে সম্ভব? হ্যাঁ রাস্তা আছে, সেই রাস্তার নাম শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষাকে যদি সার্বজনীন করা যায় তাহলে ঠিক  ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য  খুঁজে বের করতে পারবে এবং এই ব্যক্তিপূজার অবসান  হবে।
মনে হচ্ছে আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে একটু  লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ তো গেল এখনকার মর্যাদার  প্রতীক।  কিন্তু পঞ্চাশ ষাট বছর বা তার ও আগে মর্যাদার  প্রতীক  ছিল  অন্য রকম। একটু খোলসা করা যাক। অনেকদিন আগে তুলসীমঞ্চে প্রদীপ ( দিদিমা, ঠাকুমারা বলতেন পিদিম) জ্বালিয়ে  সন্ধ্যারতি শাঁখের আওয়াজের সঙ্গে এবং ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠা লন্ঠনে বোঝা যেত  তাঁরা কত বড় বাবু। লণ্ঠনের আলোয় পড়তে বসা সব ছেলেমেয়েদের আওয়াজের মাধ্যমে বোঝা যেত কি ধরণের  বাড়ি। যদি সেই বাড়িতে লণ্ঠনের জায়গায় ইলেকট্রিক  লাইট জ্বলত,  তাহলে শুরু হতো ফিসফিসানি। নিশ্চয়ই বাড়িতে কিছু বাড়তি অর্থাগম  হয়েছে সেটা ভাল ফসল হওয়ার জন্য ই হোক বা জমিজমা  বিক্রিপাট্টা করার জন্যই হোক। সিধুদের বাড়িতে সেদিন  একটা বেশ দরজাওয়ালা  ছোটখাট ঘর এল।  পরে জানা গেল যে ঐ ঘরথেকে জিনিসপত্র বের করলে খুব  ঠাণ্ডা লাগে হাত দিলে , যার নাম রেফ্রিজারেটর। বেশিরভাগ  লোকই  তো রোজ বাজার  যান, রোজ মাছ আনেন এবং রাতে শেষ হয়ে গেলে আবার  পরের দিন বাজার  যাওয়া। কোন কোন  সময় একটু বেশি আনা হয়ে গেলে ভেজে রাখা পরেরদিনের জন্য। মাছকে যে ফ্রিজে রেখে অনেকদিন ধরে খাওয়া যায় এই ধারণাই কারও ছিল না। আমরা খেলাধূলো করে সিধুদের বাড়ি যেতাম ঐ ঘর প্রমাণ ফ্রিজ  থেকে ঠাণ্ডা জল খাওয়ার জন্য আর সেই কারণেই সিধুর একটু রোয়াব সহ্য করতেই হতো। এর পরেই আবার  একটা আশ্চর্য হবার মতো ঘটনা। সিধুদের  বাড়িতে ফোন এল। পাড়ার মধ্যে এই একটাই ফোন।  বোঝাই যায় যে সিধু কোথা দিয়ে হাঁটছে। আর পাড়ার  লোকের ও হ্যাংলামি যেন দিন দিন বাড়তে লাগল। যে লোক জীবনেও  ভুল করে কারও  প্রয়োজনে  এগিয়ে আসেননি তিনিও সিধুদের  বাড়ির  ফোন নম্বর অন্যদের  দিয়ে দিলেন।  কিন্তু প্রত্যেক জিনিসের  একটা মাত্রা থাকা উচিত। তাঁরা বিপদে আপদে সবাইকে সাহায্য করেন বলেই  সবাই তার মজাটা লুটবে এটা হওয়া ঠিক নয়। একদিন  ফোনটা বেজে উঠল। বাড়িতে কেউ নেই, সুতরাং একরকম  বাধ্য হয়েই  সিধুর মা ধরলেন  ফোন। অপরপ্রান্তে একটি অল্পবয়সী মেয়ের গলা।" মাসিমা, একটু প্রণবকে ফোন টা দেবেন?"
" প্রণব, সে কে? আমিতো তাকে চিনিনা মা।"
সিধুর মা সাধারণত বাড়ির বাইরেই বেরোন না। পাড়ার কিছু ছেলেদের নাম তাঁর ছেলেদের  কাছে শোনেন বলে তবু কয়েক জন কে চেনেন । কিন্তু সে তো ডাক নাম। কিন্তু মেয়েটি সেই সময়ের তুলনায় বহু যোজন  এগিয়ে। বলল," মাসিমা প্রণব মানে পিনু।  ওর ডাকনাম পিনু। "
" ও পিনু! কিন্তু মা, ও তো থাকে আমাদের  বাড়ি থেকে পাঁচটা বাড়ি পরে। বাড়িতে এই মূহুর্তে কেউ তো নেই যে খবর দেব। তোমার  কিছু বলার  থাকলে বলো, আমি পরে খবর পাঠিয়ে দেব।"
" ঠিক আছে মাসিমা, ওকে বলে দেবেন  আমি সন্ধে বেলায় ওকে ফোন করব, ও যেন  থাকে।"
কি স্পর্ধা ! এতো সাঙ্ঘাতিক বেহায়া  মেয়ে। ফোনটাতো রেখে দিলেন।  কিন্তু পাড়ায় প্রণবের  নামে পড়ে গেল ঢিঢি। মুখচোরা প্রণব যেন আরও  গুটিয়ে গেল এই ফোনের  পরে। সিধুর বাবা নিতান্তই ভদ্রলোক।  কিন্তু সেই ভদ্রতার ও তো একটা সীমা আছে। পরিবারের সবাইকে বলে দিলেন মেসেজ টা নিয়ে রাখতে এবং সময় সুযোগ মতো খবরটা দিয়ে দেবার জন্য। সিধুদের  আমাদের  পাড়ার  সবচেয়ে সচ্ছল পরিবার। কোন কিছু নতুন  জিনিস ওদের বাড়িতেই প্রথম আসে। মহালয়ার আগে বাড়িতে এসে গেল এক পেল্লাই ফিলিপসের রেডিও।  সিধুর মা আমার  মাকে এসে বলে গেলেন,  " দিদি, বাড়িতে নতুন রেডিও  এসেছে। কাল ভোরবেলায় চলে আসবেন,  একসঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুর মর্দিনী শুনব। আমার  মনে একটু লাগল।  আমাদের  বাড়িতে রেডিও নেই বলে আমাদের  পাশের  বাড়িতে গিয়ে শুনতে হবে?  না কখনোই নয়। কিন্তু যারা বড়লোক,  তারা নিজেদের অন্যদের কাছে একটু জাহির  করতে না পারলে ঠিক  যেন  সন্তুষ্ট হতে পারেনা। ভোরবেলায় রেডিও তে কুঁ উ, কুঁকুঁকুঁ উ, কুঁকুঁকুঁউ, কুঁকুঁকুঁউ শুরু হতেই পাড়ার সমস্ত লোক হামলে পড়ল। প্রথমে ওদের  বাড়ির  বারান্দা , তারপর আমাদের  বাড়ির  বারান্দা ভরে উঠল। ওদের  বাড়িতে না গিয়ে ও ঘুমের  বারোটা গেল বেজে। মহিষাসুর মর্দিনী তো তখনকার  মতো শেষ  হলো কিন্তু এরপরেও বহুদিন  মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকারের ধারাবিবরণীতে পাড়ার  সমস্ত  লোকজনদের অনেক আনন্দ  দিয়েছে। কিন্তু আমার  নজর ছিল সিধুর দাদা বিনোদ দার সাইকেলের উপর।ঝকঝকে বটল গ্রীন রঙের সাইকেল,  পুরো চেনকভার,  পিছনের  টায়ারে লেগে থাকা এক ব্যাটারি,  সাইকেল চললেই  টায়ারের ঘর্ষণে সাইকেলের হেডলাইট, পিছনের  লাইট জ্বলত  এবং গাড়ির  হর্ণের  মতো পিঁপ পিঁপ করে আওয়াজ করত। স্ট্যাণ্ডের উপর দাঁড়ানো সাইকেলের  উপর সূর্যর আলো যখন  তেরচা ভাবে পড়ত তখন  আমার  মনে হতো যেন  পক্ষীরাজের ঘোড়া -- মর্যাদার  এক মূর্ত প্রতীক।  শুধু আমাদের  পাড়া কেন সমস্ত শহরে ঐরকম  সাইকেল  আর দুটি দেখিনি।
এখন তো অনেক বড়লোকের ছেলেমেয়েরা বাবার পয়সায় মার্সিডিজ বেঞ্জ বা অডি বা পর্শ চালিয়ে তাদের মর্যাদা জাহির করছে কিন্তু আগের দিনে একটা ঝকঝকে সাইকেল ই ছিল মর্যাদা রক্ষার পক্ষে যথেষ্ট। এখন তো সমস্ত লোকের পায়ে নানাধরণের জুতো বা চটি কিন্তু এ বেশিরভাগ লোকই খালি পায়ে যাতায়াত করত।  হাওয়াই চটির চল অনেক পরে।
ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে পথ চলা ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। অনেক সময় রোদে তেতে ওঠা বালির  চরে হাঁটতে বাচ্চাদের পায়ে গাছের পাতা বেঁধে দিত তার বাবামায়েরা।   রিস্ট ওয়াচ হাতে গোনা লোকের হাতে দেখা যেত। এখন লোকের  হাতে পয়সা এসেছে, না খেয়ে লোকের মৃত্যু এখন প্রায় শোনাই যায়না। আটানব্বই নিরানব্বই সালে বিশাল সাইজের মোবাইল খুব কম সংখ্যক লোকের কাছে ছিল  যেটা এখন এক বিপ্লবের  আকার  ধারণ করেছে।  এখন জনমজুর,  কাজের দিদিদের  হাতেও দামী  মোবাইল বলতে থাকে এ দেশের  জিডিপি বেড়েছে। আকাশ  কি উপর থেকে নীচে নেমে এল না আমাদের গতি ঊর্ধগামী?

Thursday, 30 May 2024

বন্ধু যখন অশরীরি

শ্রদ্ধেয়া বৌদি,
আগামী চৌঠা জুন সুজিতের চলে যাওয়া তিন বছর পূর্ণ হবে।গতকাল অর্থাত তিরিশ তারিখ রাতে ওকে দেখলাম এবং অনেকক্ষণ কথা হলো ওর সঙ্গে। শুধু ও একা আসেনি, এসেছিল শুভ, চৌধুরী ও শঙ্খকে নিয়ে। অনেক কথার পর চৌধুরী বলল," ঠিক জমছে না আসর, কবে আসছেন  বলেন?" শুভ বলল, অনেকদিন  তো কাটালি এখানে, এবার অন্যদিকটা দেখার ব্যবস্থা কর।" শঙ্খ ওর সদাহাস্য মুখে জিজ্ঞেস করল," ভাল  আছেন?"
সুজিতের আমার  বাড়িতে আসার কথা ছিল কুড়ি সালের  উনত্রিশে সেপ্টেম্বর।  ও তখন ছিল  হায়দরাবাদে ছেলে মাণিকের কাছে। আমি হাঁটুর  ব্যথার জন্য  কোথাও  যেতে না পারার জন্য ও ই আসবে বলেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ও তার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি কারণ পায়ে ওঠা সামান্য এক ফোড়া চুলকে ফেলে যে  এই বিপত্তি ঘটতে  পারে তা সম্ভবত সুজিত নিজেও আঁচ করতে পারেনি। সেপটিক  হয়ে এমন বাড়াবাড়ি হলো যে ওকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। সুদীপ্তর কাছে খবর পেয়ে ফোন করলাম,  ও তার স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে বলল,"আছি ফার্স্ট ক্লাস। হাসপাতালে ডাক্তার জমে ওঠা পূঁজটা কেটে বের করে দিয়েছে এবং ব্যাণ্ডেজ করে দিয়েছে এবং দিন দুয়েকের  মধ্যেই ছেড়ে দেবে বলেছে।" কিন্তু ডাক্তার তাঁর কথা রাখতে পারেন নি এবং জহর ও সুদীপ্তর কাছে জানলাম  যে ওর হাঁটু থেকে নীচের অংশটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল  কিন্তু মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে অনেক সময়ই  ক্ষুদ্র স্বার্থ  বিসর্জন দিতে হয় ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলাম। ও কিন্তু এসবের পরেও বলত ফার্স্ট ক্লাস আছি। বেশ কিছুদিন পর ওকে প্রস্থেটিক লেগ দেওয়া হলো এবং তাতেও  সে নিজেকে রপ্ত করে নিল। কলকাতায় ফিরে এসে সব সময় জমিয়ে রাখা সুজিত দিব্যি আড্ডা মেরে, আসর জমিয়ে, রিক্সায় চড়ে  বাজার করে আপনাকে বুঝতেই দেয়নি ওর অসুবিধার কথা বা দুঃখের কথা। মাঝেমধ্যেই সকাল বেলায় ফোন করে বলত," একটা গান করছি শোন। কেমন  লাগল বলবে।" বলেই সেই দরাজ গলায় গান শোনাতো ও। যেমন সুন্দর মিষ্টি গলা, তেমনই ভরাট।  ভারী সুন্দর।  ব্যাঙ্কের  ফাংশনে বা যে কোন  ফাংশনে ও গাইত এবং সকলের  প্রশংসা কুড়াতো। তখন  আমি হাঁটুতে একটা ইঞ্জেকশন নিয়ে বেশ ভাল আছি। ও আমাক  বলল কালীঘাটের মন্দিরে আসতে,  ও গান গাইবে। আমি যথারীতি ওখানে গেলাম  এবং  মায়ের সামনে চাতালে বসে অসাধারণ গান গাইল। মাটিতে বসার জন্য  খানিকক্ষণ পর আর উঠতে না পারায় ও আমাকে উঠতে সাহায্য করল এবং ট্যাক্সিতে বসিয়ে ও ফিরে গেল। তখন  ওর পা ভালই ছিল। 
রসবোধ ছিল অসাধারণ। হাসতে এবং হাসাতে একেবারে মাস্টার ক্লাস। মাঝেমধ্যেই গুরুগম্ভীর পরিস্থিতির মধ্যে এমন একটা ফুট কেটে দিত যে সবার গোমড়ামুখে ঠোঁট দুটো চওড়া হয়ে  হাসির ঝিলিক দেখা যেত। এটা মানুষের একটা বিরাট গুণ। শুভ আর সুজিতের মধ্যে কে বেশি সিগারেট খেত তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু মনে হয় শুভ ই বোধ হয় বেশি খেত। চৌধুরীর আঙুলের টোকা তবলাকে দিত প্রাণ। এত মিষ্টি করে বাজাতো যে কেউ  বলতেই পারবে না যে ওর প্রথাগত  কোন শিক্ষা নেই। এটা সম্পূর্ণ ভগবানদত্ত। শঙ্খর নীরব উপস্থিতি জানাচ্ছিল আর কতদিন? শঙ্খ তো সুজিতের  পরদিনই তার সাথী হয় যদিও  শুভ তার কিছুদিন আগেই গিয়ে সবার জন্য বন্দোবস্ত করে রেখেছে। বেশ গল্পগুজব চলছিল আর একদম ভেবেই উঠতে পারছিলাম না যে ঐ চারজনের  কেউই  আর ইহজগতে  নেই। হঠাৎই  মেঘেরগর্জন এবং আকাশে বিদ্যুতের ঝিলিকে সমস্ত ঘরটা যেন আলোয় আলোকময়  হয়ে উঠল আর সবাই যেন কোথায় উধাও  হয়ে গেল। ঘড়িতে দেখি দুটো বেজে তের মিনিট। বৃষ্টির তোড় বেশ জোরালো, উঠে জানলাগুলো ঠিকঠাক লাগানো আছে কিনা দেখতে গেলাম কিন্তু ওদের উপস্থিতির রিমঝিম শব্দটা মনের  মধ্যে ঘুরে ফিরে বেড়াতে লাগল। 
ভাল থাকবেন সবাই ।

Wednesday, 29 May 2024

মশলা মুড়ি ক্রিকেট

সম্প্রতি শেষ হলো পৃথিবীর  সবচেয়ে দামী ক্রিকেট লিগ । দুহাজার আট সালে শুরু হয়েছিল এই ক্রিকেট লিগ। দেখতে দেখতে সতের বছর কেটে গেল এই লিগের, একসময়ের চ্যাম্পিয়ন সব শেষে একদম নীচের সারিতে স্থান পাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দাদের ও সমর্থকদের মনে বিষাদের ছায়া। কিন্তু এতে কারও কোন হাত নেই। সবাই তো আর প্রথম স্থানে আসবে না, সুতরাং সবসময়ই কারও না কারও  মনঃকষ্টের ঘটনা ঘটবেই। স্ট্যাটিসটিক্সের কচকচির জন্য অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি আছেন  এবং তাঁরা যথাসাধ্য তথ্য ভিত্তিক আলোচনা করছেন  এবং ভবিষ্যতেও করবেন।  আমার বক্তব্য  সেখানে নয়। এই বিশাল কর্মকাণ্ডে প্রচুর অর্থের  সমাগম  হয়েছে এবং আমাদের  ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড এবং বহু সংস্থা এবং লোকজন বেশ ভাল রকম অর্থোপার্জন করেছেন। খুবই আনন্দের ব্যাপার যে  এই অল্প সময়েই বহুলোকের অবস্থার প্রভূত  উন্নতি হয়েছে কিন্তু মনে একটা ছোট্ট প্রশ্ন  উঁকিঝুঁকি মারছে সেটা যতক্ষণ না প্রকাশ করতে পারছি ততক্ষণ একটা অস্বস্তি থেকেই  যাচ্ছে।
প্রথমত  এই বিশাল যজ্ঞে দশটা দল তাদের  বিরাট  লটবহর নিয়ে প্রস্তুতি চালাচ্ছে, বহুটাকা খরচ করছে। কিন্তু এই খেলায় কেমন যেন  একপেশে ব্যবস্থা। সেরার সেরা বোলাররা বল করছে আর ভাল, মোটামুটি ভাল  ও আনাড়ি ব্যাটসম্যান সবাই  মিলে যেভাবেই হোক না কেন সেই বলকে মেরে পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে। লেগ স্টাম্পের  দিকে বল গেলেই ওয়াইড বল এবং ব্যাটিং দলের  একটা রান যোগ হলো আর বোলারকেও একটা বাড়তি বল করতে হলো। নো বল বা বাম্পার দিলে ব্যাটসম্যানদের শরীরে বা মাথায় লেগে ক্ষতি হতে পারে, সেটা না দেওয়া বাঞ্ছনীয়। ছয় ওভার  অবধি ফিল্ডিং সাজানোয় যথেষ্ট  বাধানিষেধ আছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়,বেচারা বোলাররা  বল করো আর ব্যাটসম্যানরা  হাঁকরে দিয়ে তাকে বাউণ্ডারি বা ওভারবাউণ্ডারি মারবে আর লোকে আহা আহা বলে হাততালি দেবে। খেলাটা এতটাই বিনোদনের  উপযোগী করা হয়েছে যে কোন উঠতি ক্রিকেটার আর বোলার হতে চাইছে না, সবাই ব্যাটসম্যান হতে চায়। কিন্তু এই ব্যাটসম্যানদের  বেশিরভাগ ই টেকনিকের অভাবে টেস্ট খেলায় চান্স পাওয়ার কথা ভাবতেই  পারেনা। এমন একটা লেভেল প্লেয়িং  ফিল্ড তৈরী করা হোক যাতে প্রকৃত ভাল  বোলার  বা ব্যাটসম্যানরা তাদের  উৎকর্ষতা দেখাতে পারে। অবশ্য  একটা কথা ঠিক  যে লোকের  হাতে সময় এখন খুব কম, পাঁচ দিনের টেস্ট খেলা দেখা  আর সম্ভব হচ্ছেনা। আর দর্শকদের  কথা ভেবেই ক্রিকেটের  এই বিনোদন। 
এবার দেখা যাক, এর কি সুদূর প্রসারী ফল। আমাদের  দেশে ক্রিকেট  এখন হেঁসেলেও ঢুকে পড়েছে।  সবার মধ্যেই  এক চাপা উত্তেজনা। কলকাতা নাইট রাইডার্সে একজন বাঙালি ক্রিকেটার  না থাকলেও  আমরা সবাই কেমন  নীরবে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সমর্থক হয়ে গেছি এবং সেইরকম ভাবে মুম্বই বা চেন্নাই এর লোকজন তাদের  প্রদেশের  নামে ক্রিকেট দলের  সমর্থক হয়ে গেছে। হাজার হলেও  রক্ত জলের  চেয়ে বেশী ঘন তাই নয় কি? আমার  মনে একটা প্রশ্ন জাগছে এবার। এই বিশাল অর্থের  কিছু অংশ এই খেলা বা অন্য কোন  খেলা  ঊৎকর্ষতা বাড়ানোর কাজে ব্যয় করা যায় কি না বা সরকারের  তরফে এই খেলাধূলার পিছনে আরও অনেক কিছু করা যায় কি না?  সমস্ত  ছেলেমেয়েরা ই যে পড়াশোনা করে পণ্ডিত  হবে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের  অবদান  রাখবে তা নয়। যারা নিম্ন মেধা বা মধ্য মেধার কিন্তু খেলাধূলায় পারদর্শী তাদের  শৈশবাবস্থা থেকেই বিভিন্ন  অ্যাকাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং বিদেশের  মতন সেই অ্যাকাডেমি ই তাদের ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরী করুক এবং খেলোয়াড়রাই যখন বয়স হয়ে যাবে তখন  তারাই কোচিং করুক  এবং  সমস্ত  খেলোয়াড়দের একটা পেনশনের ব্যবস্থা হোক যাতে খেলোয়াড় জীবনের  শেষে তাদের  ভবিষ্যতে অর্থাভাবে  পড়তে না হয়। এখন যেমন  ক্লাবগুলোকে বছরে দুলাখ টাকা করে দেওয়া  হয় সেটা নিশ্চয়ই  একটা ভাল  ব্যবস্থা কিন্তু তাতে সত্যিকারের  কতজন  খেলোয়াড় উঠে এসেছেন  তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  আছে। বরঞ্চ এটাই  দেখা  গেছে যে ঐ টাকায় ক্লাবের  বিল্ডিং তৈরী  হয়েছে এবং বিয়ে অন্নপ্রাশন ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে ভাড়া দিয়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের  মধ্যদেশ  স্ফীত করেছে  এবং ভোটের  সময় এরাই বিভিন্ন  উপায়ে ভোট নিয়ে আসার কাজ করছে। এছাড়া কিছু রিটায়ার করে যাওয়া লোকদের  তাস খেলার বন্দোবস্ত হয়েছে। 
সবচেয়ে বড় জিনিস  হলো দূরদৃষ্টি  থাকা  এবং সেটাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে যথাযোগ্য প্রয়াস নেওয়া। অন্যথা এই টাকা কিছু বাজে লোকের হাতে পড়বে এবং যুব সমাজের কোন  উন্নতি হবেনা।

Sunday, 26 May 2024

"সম্পর্ক"

ছোট্ট একটি শব্দ কিন্তু এর গভীরতা মাপা এক বিরাট দুঃসাধ্য ব্যাপার। সম্পর্ক বলতে কি বোঝায়? বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানী, পণ্ডিত মানুষ একে বর্ণনা করেছেন কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এই পণ্ডিত মানুষরাই তাঁদের  জীবনে খেই হারিয়ে ফেলেছেন এই ছোট্ট  কথার অর্থ  অনুধাবন করতে অথচ বিদ্যা বুদ্ধি হীন কত মানুষ এর সংজ্ঞা না জেনেও  এক অত্যন্ত সুন্দর জীবন গড়ে তুলেছেন। তাঁরা গুছিয়ে ঠিক করে বলতে পারবেন না এই কথার অর্থ  অথচ নিজের জীবনে অ-সুখের কথাও ঠিকঠাক বলতে পারবেন  না। কার কথা শোনা প্রয়োজন? 

বিরাট বিরাট ডিগ্রির মালিক,  সমাজের এক একজন  মাথা, এখানে সেখানে বহু জ্ঞানগর্ভ  বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান কিন্তু নিজের  জীবনে সম্পর্ক শূন্য। স্ত্রী হয়তো জীবিত কিন্তু একসঙ্গে থাকেন না, ছেলে মেয়েরা রয়েছে কিন্তু  সবাই যেন  চলছে নিজের তালে, ঐকতান খোঁজার চেষ্টা বৃথা। প্রত্যেকেই স্বমহিমায় মহীয়ান ঠিক যেন এক একটা দারুণ ফুল কিন্তু এইসব ফুলগুলো দিয়ে মালা গাঁথা যায়না।একে তাহলে কি বলা যায়? পাঁচমিশেলি তরকারি বা চচ্চড়িতে প্রত্যেকটি সব্জি যদি নিজেদের অস্তিত্ব  প্রকাশ  করে তাহলে সেই পাঁচমিশেলি তরকারি বা চচ্চড়ি উপাদেয়  হয়ে ওঠেনা কিন্তু প্রত্যেক অনুপান যদি নিজেদের অস্তিত্ব  বিসর্জন দিয়ে একটা নতুন  কিছুর সৃষ্টি করে তখন  তার স্বাদ  হয় অনন্যসাধারণ। একটা ছাতার  যদি একটা বা দুটো শিক ভেঙে যায় তখন  ছাতার  সেই নিটোল রূপ আর থাকেনা, তার কঙ্কাল সার চেহারা তখন প্রকট হয়ে পড়ে। এখন আমরা স্বকীয়তা  বিসর্জন দিয়ে একসুরে বাঁধা পড়ব নাকি নিজেদের  অস্তিত্ব জাহির করব, সেটা সম্পূর্ণ  নির্ভর করছে  নিজেদের মানসিকতার উপর। বিশেষ  বিদ্যার জাহাজ না হয়েও নিজেদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে যারা সীমিত থাকে তাদের  সম্পর্ক  হয় অনেক নিটোল এবং নানাবিধ  অসুবিধা, কষ্ট  থাকার পরেও  তারা অত্যন্ত সুখী।
"আমি" শব্দটা দুই অক্ষরের  হলেও খুবই মারাত্মক।  এই আমিত্ব যে কত সংসার  ছারখার করে দিয়েছে তার ইয়ত্ত্বা নেই। এই আমি সর্বস্ব  হবার কারণে নানা অশান্তি গজিয়ে ওঠে। দুই অক্ষরের  আমি থেকে তিন অক্ষরের আমরা হলেই কিন্তু বহুসমস্যার সমাধান  চটজলদি হয়ে যায় কিন্তু সব পণ্ডিত ব্যক্তি ই যদি নিজেদের আমিত্ব বিসর্জন দিতে না রাজি হন তাহলেই বাধে ধুন্ধুমার কাণ্ড। সংসার  বড় হলেই নতুন  সদস্য বা সদস্যার  উদ্ভব হবে যারা আসে অন্য সংসার থেকে। তাদের  বড় হয়ে ওঠা ভিন্ন  ধরণের, সুতরাং  নতুন  সংসারে তাদের  মানিয়ে নিতে গেলে একটুসময়ের প্রয়োজন কিন্তু আজকাল  দেখা যাচ্ছে নতুন সংসারে এসেই তার নিজের বড় হয়ে ওঠাকেই  বেশি প্রাধান্য দেয় যার পরিণতি বিষাদময় হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। একটা চারাগাছ অন্য একটা জমি থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসে ভিন্ন জায়গায় রোপণ করলে চারাগাছের  দায়িত্ব  যেমন নতুন মাটির  সঙ্গে মানিয়ে নেয়া তার থেকে ঢের বেশিগুণ দায়িত্ব  নতুন মাটির  চারা গাছটিকে  আপন করে নেয়া। দুজনের ই দায়িত্ব  রয়েছে চারাগাছটির বড় হয়ে ওঠা এবং ফুলে ফলে  ভরে ওঠার মধ্যে। এই মানিয়ে নেওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।  জোর জবরদস্তি করে মানানোর ফল কিন্তু মোটেও  শুভ হয়না বরং ধীরে ধীরে পূঞ্জীভূত অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ একদিন গোটা সংসারকে  চুরমার করে দেয়। বিয়ের পর ছেলেমেয়েদের সংসারে  নাক না গলানোই ভাল।  প্রত্যেক মানুষের নিজস্বতা বজায় রাখার অধিকারকে স্বীকৃতি দিলে সংসারে শান্তি বজায় থাকে। একটা সময় ছিল যে শ্বশুর বা শাশুড়ি যা বলবেন বাড়ির  বৌমাকে ঘোমটা মাথায় দিয়ে স্বীকৃতি জানাতে হবে।এর  দিন শেষ বরং উল্টোটাই  এখন বেশি সত্যি। যৌথ পরিবার  ভেঙে যাওয়ার  এটা একটা বড় কারণ। পরিবার  বড় হলেই তারা আলাদা থাকুক, সময়ে অসময়ে আসা যাওয়া থাকুক, তাহলে সংসারে শান্তি বজায় থাকবে। কিন্তু যেখানেই বর্ধিত পরিবার খুব কাছাকাছি থাকে সেখানেই কোন  এক ঠুনকো কারণে মনঃকষ্টের উদ্রেক  হয়। এটা যাঁরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবেন  ততই  মঙ্গল। কোনরকম  আশা না করাই  বাঞ্ছনীয়।  আশা না করে কিছু বাড়তি প্রাপ্তি যেমন  আনন্দ  দেবে তেমনই  আশা করে কিছু না পেলে বা আশানুরূপ  না পেলে মনঃকষ্টের ই কারণ হবে। এ তো গেল  পারিবারিক  সম্পর্কের  কথা।
বন্ধুদের মধ্যেও  যদি মানসিক ভাবে তৈরী থাকা যায় যে প্রত্যেক মানুষের ই নিজস্বতা রয়েছে এবং দুটো যখন  ভিন্ন সত্ত্বা তখন  সব বিষয়েই যে একমত হতে হবে তার কোন মানে নেই। বরং মতপার্থক্যতাই ঠিক সিদ্ধান্ত  নিতে সাহায্য  করে। কিন্তু কারও  যদি এটাই মনে হয় যে বন্ধু মানেই সে আমার হ্যাঁ র সঙ্গে হ্যাঁ মেলাবে তাহলে সে ভুল করবে। অনেক সময় এটাও দেখা যায় শৈশবের বন্ধু যে কোন স্বার্থের  সংঘাতের  জন্য এই পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিচ্ছে। আবার  এমনও দেখা যায় বন্ধুর জন্য  অপর বন্ধু প্রাণ  দিতেও প্রস্তুত।  এই পৃথিবীতেই ভাল  ও খারাপ  দুইই  আছে, খারাপের  দিকে না তাকিয়ে  ভাল জিনিসের দিকে তাকালে মনটা শুদ্ধ  থাকবে।
কোন  মানুষকে বিচার করতে হলে স্বার্থের  সংঘাত  হওয়া সত্ত্বেও যদি নিজেদের শালীনতা বজায় রেখে ব্যবহার করতে পারে তখনই  তাকে ভাল মানুষ  হিসেবে গণ্য  করা যেতে পারে। ঠিক  সেরকমই প্রভু ভৃত্যের সম্পর্কেও মনিব যদি চাকরের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় তখন  সেই সম্পর্ক  একটা আলাদা মাত্রা পায়। ভৃত্যের মনিবের প্রতি আনুগত্য  ছাড়া আর বেশী কিছু দেবার  থাকেনা কিন্তু মনিব  যদি সবসময়ই  এই চিন্তা করতে থাকেন যে আমি ওকে মাইনে দিচ্ছি, ওকে এটা করতেই  হবে সে যতটা অসাধ্য ই হোক না কেন।  সম্পর্কের মধ্যে একটা স্নেহ  বা সহানুভূতি না থাকলে সেই সম্পর্কের  বনিয়াদ তত মজবুত হয় না। সম্পর্ক  হচ্ছে দুটো পায়ের মতো। কোন একটা পায়ে চোট লাগলে মানুষের স্বাভাবিক চলার  ছন্দ যেমন ব্যাহত হয় তেমনই  তাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে দুই পক্ষকেই পরস্পরের  প্রতি শ্রদ্ধাশীল,  সহানুভূতিশীল হতে হবে। মেঘ আকাশে ভাসতে ভাসতে কখনও কোন  জায়গার প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল হয়ে এক পশলা বৃষ্টি দিয়ে লোকের  মুখে হাসি ফোটাবে আবার  কখনও তার বজ্র নির্ঘোষে অবিশ্রান্ত ভালবাসায় প্লাবন আনবে এবং মানুষের  দুর্ভোগের কারণ হবে ।মানুষ  আকাশকেও  ভালবাসে আবার  মেঘকেও এবং এই দুইজনের সম্পর্ক অটুট। 

Saturday, 25 May 2024

ফিরে যাওয়ার আগে

জীবনের  শেষ সীমানায় পৌঁছে হিসেব নিকেশ করতে বসে রাধুবাবু দেখেন সবসময়ই  তিনি জিতেই এসেছেন এবং লাভে লাভে মালামাল  তিনি এবং দেওয়ার ঘর প্রায় শূন্য।  জিততেই হবে সে যে ভাবেই হোক না কেন, ছলে, বলে বা কৌশলে। ভাদুড়িদার কাছে জানলাম যে এই গোত্রের মানুষ রাজসিক চালেই থাকেন এবং ভগবান  তাঁদের  মনোবাঞ্ছাও পূর্ণ করেন এবং দেখেন এই প্রাচুর্যের মধ্যেও বান্দা তাঁকে স্মরণ করছে কি না। বেশিরভাগ লোকই  ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে তাঁকে স্মরণ করতেই ভুলে যান। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের হৃদয়ে তিনি অধিষ্ঠিত এবং তাঁরা সবসময়ই ভাল কাজ করতে থাকেন।  ভাল কাজ মানেই মন্দিরে গিয়ে এক অত্যন্ত মূল্যবান অলঙ্কারে ভূষিত  করলাম , এটা নয়। নিজের  সাধ্যানুযায়ী কিছু গরীব অভুক্ত মানুষকে খাওয়ানো এর থেকে অনেক  ভাল  কাজ। এই সহজ সরল কথাটি স্বামী বিবেকানন্দ অনেক দিন আগেই  বলে গেছেন। আমরা সেটা জেনেও প্রয়োজন মতো ভুলে যাই। 
ইসরাইলে দুটো হ্রদ আছে যাদের একটার নাম মৃত সাগর এবং অপরটি গ্যালিলি সাগর। মৃত সাগরে জীবনের কোন  চিহ্ন  নেই কারণ এর জলে লবণের পরিমাণ। অপরদিকে গ্যালিলি সাগরে জীবনের  প্রাচুর্য। কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে জর্ডন নদীর জল এর মধ্যে প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মেশে কিন্তু মৃত সাগর  সমুদ্রতলের অনেক নীচে হওয়ায় জর্ডন নদীর  জল ঐখানেই  আবদ্ধ হয়ে যায় এবং প্রতিনিয়ত জল বাষ্পীভূত হওয়ার কারণে  জলে দ্রবীভূত লবণ ঐখানেই পড়ে থাকে এবং লবণ মাত্রাতিরিক্ত হবার জন্য জীবনের কোন  চিহ্ন সেখানে দেখা যায়না। মানুষের জীবনেও এই একই ঘটনা। আমরা যা কিছু শিখছি বা পাচ্ছি তা যদি অন্যের মধ্যে বিতরণ  করা না যায় তাহলে সেই মৃত সাগরের অবস্থা হবে। জীবন সায়াহ্নে এসে এই কঠিন  সত্যের উপলব্ধি মানুষকে কিছু করার  অনুপ্রেরণা যোগায়। 
প্রত্যেক মানুষের ই কিছু না কিছু দেবার  আছে এই সমাজকে এবং এই নশ্বর দেহ বিলীন  হবার আগে সেটা করলে সমাজ পরিপুষ্ট  হবে অন্যথা অধীত জ্ঞান জীবনের  সমাপ্তির সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। রাধু বাবু এখনভেবে  পাচ্ছেন  না যে তাঁর এই বিশাল  সম্পদ নিয়ে কি করবেন। স্ত্রী অনেকদিন আগেই ছেড়ে চলে গেছেন,  কোন সন্তানাদিও  নেই, নিজের  জন্য  সামান্য  কিছু রেখে  সমস্ত সম্পত্তি রামকৃষ্ণ মিশনকে দান করে ভার মুক্ত হলেন।